জান্নাত লাভের সহজ আমল

শাহ মাহমুদ হাসান।।
আল্লাহ তায়ালা মানুষকে জান্নাত লাভের জন্য প্রতিযোগিতায় এগিয়ে আসার জন্য বলেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা তোমাদের পালনকর্তার ক্ষমা এবং জান্নাতের দিকে ছুটে যাও যার সীমানা হচ্ছে আসমান ও যমীন, যা তৈরী করা হয়েছে পরহেযগারদের জন্য।’ (সূরা আলে ইমরান: ১৩৩)। জান্নাতে যাবার পূর্ব শর্ত হচ্ছে শিরকমুক্ত ঈমান। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শরীক না করে মারা যাবে, সে জান্নাতে যাবে এবং যে ব্যক্তি তার সাথে কোন কিছুকে শরীক করে মারা যাবে সে জাহান্নামে যাবে। (মুসলিম : ২৭৯)। অন্য হাদিসে এসসেছে, যে ব্যক্তির শেষ কথা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ হবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (আবু দাউদ : ৩১১৬)। ইসলাম মানুষকে সর্বদা জান্নাতের পথ দেখায়। ইসলামে রয়েছে এমন কিছু আমল যা মানুষকে খুব সহজে জান্নাতে পৌঁছে দেয়। যেমন-
মা-বাবার সেবা করা
ইসলামে মা-বাবাকেই জান্নাত ও মা-বাবাই জাহান্নাম বলে সাব্যস্ত করেছে। অর্থাৎ যারা পিতা-মাতাকে সন্তুষ্ট করবে তারা জান্নাত লাভ করবে। আর যারা পিতা-মাতার অবাধ্য হবে তারা হবে জাহান্নামি। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘ওই ব্যক্তি ধ্বংস হোক, ওই ব্যক্তি ধ্বংস হোক, ওই ব্যক্তি ধ্বংস হোক।’ একজন জিজ্ঞেস করলেন, ‘ইয়া রসুলুল্লাহ! সে ব্যক্তি কে?’ রসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি তার পিতা-মাতা উভয়কে অথবা যেকোনো একজনকে বার্ধক্য অবস্থায় পেল, তবুও জান্নাত অর্জন করতে পারল না, সে ধ্বংস হোক।’ (মুসলিম : ২৫৫১)।
যথাসময়ে নামাজ আদায়
সময়মত ও নিয়মিত নামাজ আদায়কারীর প্রতি আল্লাহ তায়ালা সন্তুষ্ট হয়ে তাকে জান্নাত দান করবেন। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি সময়মতো নামাজ আদায়ে যতœবান হবে, তার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে জান্নাতে প্রবেশ করানোর ওয়াদা রয়েছে।’ (আবু দাউদ : ১৪২০)।
আয়াতুল কুরসি পাঠ
পবিত্র কোরআনের সূরা বাকারার ২৫৫ নম্বর আয়াতকে বলা হয় আয়াতুল কুরসি। এই আয়াতের মধ্যে আল্লাহর একাত্ববাদ ও তাঁর ক্ষমতার বর্ণনা রয়েছে। এই আয়াতের ফজিলতের ব্যাপারে রসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি প্রত্যেক ফরজ নামাজান্তে আয়াতুল কুরসি তিলাওয়াত করবে, তার জান্নাতে প্রবেশের জন্য মৃত্যু ছাড়া আর কোনো বাধা থাকবে না।’ (নাসায়ি : ৯৮৪৮)।
তাকওয়া অবলম্বন
ইসলামে মর্যাদাবান মানুষের তালিকার শীর্ষে রয়েছে মুত্তাকিরা। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহর কাছে সে-ই সর্বাধিক মর্যাদাবান যে সর্বাধিক আল্লাহভীরু।’ (সূরা হুজুরাত : ১৩)। আর তাকওয়া হচ্ছে জান্নাত লাভের উৎকৃষ্ট উপায়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি তার প্রভুর সামনে উপস্থিত হওয়াকে ভয় করে এবং নিজের অন্তরকে কুপ্রবৃত্তি থেকে দূরে রাখে, জান্নাতই হবে তার জন্য চূড়ান্ত আবাসস্থল।’ (সূরা নাজিয়াত : ৪০-৪১)। মহান আল্লাহ আরো বলেন, ‘মুত্তাকিদেরকে যে জান্নাতের ওয়াদা দেয়া হয়েছে, তাতে আছে পানির নহর, নির্মল দুধের নহর যারা স্বাদ অপরিবর্তনীয়, পানকারীদের জন্যে সুস্বাদু শরাবের নহর এবং পরিশোধিত মধুর নহর। তথায় তাদের জন্যে আছে রকমারি ফল-মূল ও তাদের পালনকর্তার ক্ষমা।’ (সূরা মুহাম্মাদ : ১৫)।
হালাল আহার গ্রহণ
হালাল আহার গ্রহণ ব্যতীত আল্লাহ তায়ালার কাছে বান্দার কোন ভালো কাজ বা নেক আমোল গ্রহণযোগ্য নয়। হালাল খাদ্য গ্রহণকারীরাই নাজাত পবে এবং তাদের ঠিকানা হবে জান্নাত। রসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে লোক হালাল খেয়েছে, সুন্নাহ মোতাবেক আমল করেছে এবং মানুষকে কষ্ট দান থেকে বিরত রয়েছে, সে জান্নাতে যাবে।’ (তিরমিজি : ২৫২০)।
রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ
রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করা ঈমাদারদের অন্যতম দায়িত্ব। যারা এই দায়িত্ব পালন করবে তারা জান্নাতের অধিবাসী হবার সৌভাগ্য লাভ করবে। একবার রাস্তার ওপর একটি গাছের ডাল পড়ে ছিল, যা মানুষের চলাচলে অসুবিধা সৃষ্টি করছিল, অতঃপর এক ব্যাক্তি তা সরিয়ে দিল, রসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘বিনিময়ে আল্লাহ তাকে জান্নাত দান করেছেন।’ (ইবনে মাজাহ : ৩৬৮২)।
মুখ ও যৌনাঙ্গের হেফাজত
মুখ ও গোপনাঙ্গের হেফাজতের মধ্যে রয়েছে জান্নাতের নিশ্চয়তা। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি দুই চোয়ালের মধ্যভাগ (জিহ্বা) ও দুই রানের মধ্যভাগ (যৌনাঙ্গের) হেফাজতের দায়িত্ব গ্রহণ করবে আমি তার জন্য জান্নাতের জিম্মাদার হব।’ (বুখারি : ৬৪৭৪)।
এতিম প্রতিপালন
এতিম প্রতিপালনের পুরুস্কার হলো জান্নাত। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আমি ও এতিমের প্রতিপালনকারী জান্নাতে একসঙ্গে এমনভাবে থাকব- এ কথা বলে তিনি মধ্যমা ও তর্জনী আঙুলদ্বয়কে একত্রিত ও পৃথক করে দেখিয়েছেন।’ (বুখারি : ৫৩০৪)।
আসমাউল হুসনা আয়ত্ত করা
আল্লাহ তায়ালার রয়েছে অসংখ গুনবাচক নাম। এই নামগুলো যে আয়ত্ত করবে তার পুরুস্কার কি হবে সে ব্যাপারে রসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালার ৯৯ টি নাম আছে, যে ব্যক্তি তা আয়ত্ত করবে, আল্লাহ তাকে জান্নাত দান করবেন।’ (বুখারি : ২৭৩৬)।
অজুর পর কালেমা শাহাদাত পাঠ
ওজুর পরে কালেমা শাহাদাত পাঠ করার ফজিলত বর্ণনা করে রসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি উত্তমরূপে অজু করার পর কালেমা শাহাদাত পাঠ করবে, ওই ব্যক্তির জন্য জান্নাতের আটটি দরজাই খুলে দেয়া হবে। সে যে দরজা দিয়ে ইচ্ছা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে। (মুসলিম : ৫৭৬)।
তাহিয়্যাতুল অজু
উত্তমরূপে অজু করে কোন ব্যক্তি যদি যথাযথভাবে দুই রাকাত নামাজ আদায় করে তাহলে সে ব্যক্তি জান্নাত লাভ করবে। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি উত্তমরূপে অজুর পরে একাগ্রচিত্তে দুই রাকাত নামাজ আদায় করে, তার জন্য জান্নাত অবধারিত।’ (আবু দাউদ : ১৬৯)।
ঈমানদার অবস্থায় যারা এই নেক আমলগুলো সম্পন্ন করবে তাদের জন্য পুরুস্কার ঘোষণা করে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে, সৎকাজ করেছে, নামাজ প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং যাকাত দান করেছে, তাদের জন্যে তাদের পুরষ্কার তাদের পালনকর্তার কছে রয়েছে। তাদের কোন শঙ্কা নেই এবং তারা দুঃখিত হবে না।’ (সূরা বাকারা : ২৭৭)। তিনি আরো ইরশাদ করেন, ‘যারা ঈমান আনে আর সৎকাজ করে তাদের জন্য রয়েছে নেয়ামতে ভরা জান্নাত।’ (সূরা লোকমান : ৮)।

শেয়ার করুন

Leave a Comment