মজুদদারির মাধ্যমে খাদ্যদ্রব্যে কৃত্রিম সংকট হয়

শাহ মাহমুদ হাসান।। মজুদদারির মাধ্যমে খাদ্যদ্রব্যে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হারাম। ধোঁকাবাজি, প্রতারণা, মুনাফাখোরী, কালোবাজারি, মজুদদারি ইত্যাদির আশ্রয় নিয়ে অবৈধ উপায়ে সম্পদ উপার্জন করার ব্যাপারে সতর্ক করেছে। রসুল (সা.) বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন ব্যবসায়ীরা মহা-অপরাধী হিসেবে উত্থিত হবে। তবে যারা আল্লাহকে ভয় করবে এবং সততা ও নিষ্ঠার সাথে ব্যবসা করবে তারা ছাড়া। ইবনে মাজাহ।

আল্লাহ তাআলা মানব জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেছেন, ‘আমি মানুষ ও জিনকে আমার ইবাদতের উদ্দেশ্যেই সৃষ্টি করেছি।’ (সূরা জারিয়াত : ৫৬)। এই ইবাদাত পালন জীবনের অন্যান্য প্রয়োজন পূরণে বাধা হবে না। বরং চাকরি বাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য সব কিছুই থাকবে গতিশীল। সুতরাং দুনিয়ার চাকরি-বাকরি এবং ব্যবসা-বাণিজ্য বান্দাকে যখন আল্লাহর ইবাদাত থেকে গাফেল করবে না এবং ব্যবসা যখন আমানতদারি, বিশ্বস্ততা ও সততার সঙ্গে করা হবে তখন তার চাকরি-বাকরি এবং ব্যবসা-বাণিজ্যও ইবাদাতে পরিণত হবে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ হয়েছে, ‘এরা এমন লোক যাদেরকে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং ক্রয়-বিক্রয় আল্লাহর স্মরণ থেকে বিরত রাখে না, নামাজ কায়েম করা থেকে এবং যাকাত প্রদান করা থেকে বিরত রাখে না। তারা ভয় করেন সেই দিনকে, যেদিন অন্তর ও দৃষ্টিসমূহ উল্টে যাবে।’ (সূরা নূর : ৩৭)। তাই মুসলমানের কর্তব্য হচ্ছে, আল্লাহকে বিধি নিষেধ স্মরণ রেখে হালাল পদ্ধতিতে আয়-উপার্জনের চেষ্টা করা। কেননা যারা সৎ ব্যবসায়ী পরকালীন জীবনে তাদের জন্য মহা পুরস্কারের ঘোষণা করা হয়েছে। হাদিস শরিফে এসেছে, ‘সৎ ও আমানতদার ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন নবী, সত্যবাদী ও শহীদদের সঙ্গে থাকবে। তিরমিজি।

ব্যবসায় ধোঁকা ও প্রতারণা থেকে বিরত থেকে দ্রব্যের ভাল-মন্দ, দোষ-ত্রুটি ক্রেতার সম্মুখে প্রকাশ করলে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ই লাভবান হবে। এতে তাদের ক্রয়-বিক্রয়ে আল্লাহ তায়ালা বরকত দান করবেন। একবার রসুল (সা.) কোনো এক খাদ্যস্তুপের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি খাদ্যস্তুপে হাত ঢুকিয়ে দিয়ে দেখলেন তাঁর হাত ভিজে গেছে। রসুল (সা.) বললেন, ব্যাপার কি? উত্তরে খাদ্য দ্রব্যের মালিক বললেন, হে আল্লাহর রসুল (সা.)! বৃষ্টিতে তা ভিজে গেছে। রসুল (সা.) তাকে বললেন, তাহলে ভেজা অংশটা শস্যের ওপরে রাখলে না কেন (?) যাতে ক্রেতারা তা দেখে ক্রয় করতে পারে। নিশ্চয়ই যে প্রতারণা করে সে আমার উম্মত নয়।’ মুসলিম।
এমন ব্যবসা করাও ইসলামে বৈধ নয় যাতে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ব্যবসা বৈধ হবার জন্য ক্রেতার সম্মতি ও সন্তুষ্টির শর্ত আরোপ করে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা একে অপরের স¤পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না। কেবল তোমাদের পর¯পরের সম্মতিক্রমে যে ব্যবসা করা হয় তা বৈধ। আর তোমরা নিজেদের কাউকে হত্যা করো না। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তায়ালা তোমাদের প্রতি দয়ালু।’ (সূরা নিসা : ২৯)।
অধিক মুনাফার লোভে খাদ্য বস্তুুর কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে যারা মানুষকে কষ্ট দিবে তাদের জন্য দুনিয়তেই ভয়াবহ পরিণতি অপেক্ষা করছে। রসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি মুসলমানদের মধ্যে সঙ্কট সৃষ্টির লক্ষ্যে খাদ্য বস্তু গুদামজাত করবে, মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে তার দরিদ্র এবং কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। ইবনে মাজাহ।
যেসব অসাধু ব্যবসায়ীরা খাদ্যদ্রব্য গুদামজাত করে বাজারে কৃত্রিম সংকট করে তারা আল্লাহর রহমত থেকে মাহরুম হয়ে যায়। রসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি টানা চল্লিশ দিন খাদ্যশস্য মজুদ করে (সংকট সৃষ্টি করবে), সে আল্লাহ রহমত থেকে বঞ্ছিত হয়ে যাবে এবং আল্লাহ তায়ালা তার প্রতি কোন ভ্রুক্ষেপ করবেন না।’ মুসনাদে আহমাদ। অপর হাদিসে এসেছে, বাজারে পণ্য আমদানিকারক রিজিকপ্রাপ্ত হয়। আর পণ্য মজুদকারী অভিশপ্ত হয়। ইবনে মাজাহ।
ব্যবসায়ীরা খাদ্যদ্রব্য সংগ্রহ করে বা আমদানি করে যদি মনে করেন যে, তার সংগৃহীত খাবার খেয়ে মানুষ সুস্থ থাকবে এবং আল্লাহর ইবাদাত-বন্দেগী করবে তখন ব্যবসায়ীর পুরো ব্যবসা ইবাদত হিসেবে গণ্য হয়ে যাবে। তাই একজন মুসলিম ব্যবসায়ী খাদ্য বস্তু গুদামজাত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করবে না বরং সে খাদ্য ঘাটতি দূরীকরণে প্রয়োজনীয় দ্রব্য আমদানি করে তা ন্যায্যমূল্যে তা বিক্রয় করবে। যারা এই কাজ করবে তাদের ব্যাপারে ইসলামে রয়েছে বড় সুসংবাদ। তাফসিরে কুরতুবির মধ্যে এসেছে, ‘কোনো ব্যক্তি যখন ত্যাগ স্বীকার করে সওয়াবের আশায় মুসলিম জনপদে কোনো প্রয়োজনীয় দ্রব্য আমদানি করে এবং ন্যায্যমূল্যে তা বিক্রয় করে, আল্লাহর কাছে তিনি শহীদের মর্যাদা লাভ করবেন।’ এক্ষেত্রে ভোক্তাদেরও কিছু দায়-দায়িত্ব রয়েছে। পণ্যদ্রব্য সংকটের সময় ভোক্তাদের সংযমী হতে হবে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত তারা পণ্যদ্রব্য সংগ্রহ করবে না। এতে বাজার মূল্য স্থিতিশীল থাকবে। কিন্তু সংকটের সময় ভোক্তারা পণ্যদ্রব্য সংগ্রহের জন্য একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত মজুদ করা শুরু করে দেয়। তখন সঙ্কট আরো ঘনীভূত হয়। আর এই সুযোগে ব্যবসায়ীরা ভোক্তাদের উপর অতিরিক্ত মুনাফা আদায়ে চড়াও হয়। সুতরাং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য গুদামজাত করে যারা বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করছে, প্রশাসনের দায়িত্ব হচ্ছে এ জাতীয় মুনাফাখোর ও কালোবাজারিদের কঠোর হস্তে দমন করে সাধারণ ভোক্তাদের জনজীবন স্বাভাবিক রাখা।

শেয়ার করুন

Leave a Comment