গৃহকর্মী নির্যাতন প্রতিকারে ইসলামের ভূমিকা

শাহ মাহমুদ হাসান।।
হতদরিদ্র পরিবারের শিশুরা জীবন ও জীবীকার প্রয়োজনে গ্রাম থেকে শহরে আসে দুমুঠো ভাতের জন্য। গ্রামে কাজ না থাকায় অভাবের তাড়নায় ওইসব পরিবার প্রধানরা শিশুদেরকে শহরে এনে গৃহকর্মীর কাজে লাগিয়ে দেয়। এরপর এসব শিশু গৃহকর্মীরা গৃহকর্তা অথবা গৃহকর্ত্রীর নির্যাতনের শিকার হতে থাকে দিনের পর দিন। গৃহকর্মীরাও যে মানুষ এ উপলব্ধিও হারিয়ে ফেলেছেন কোন কোন গৃহকর্ত্রী বা গৃহস্বামী। সামান্য ত্রুটি বিচ্যুতির কারণে গৃহকর্মীরা নানা ধরনের নিষ্ঠুরতা ও নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকে। যেমন অকথ্য ভাষায় গালাগালি করে প্রতিনিয়ত মানসিক নির্যাতন করা হয়। আবার পর্যাপ্ত খাবার খেতে না দেওয়া এবং ঘুমোতে না দেওয়ার মতো নির্যাতন চালানো হয়। এছাড়াও ধর্ষণ এমনকি শারিরিক নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করা হয়।
বাংলাদেশে গৃহকর্মী নির্যাতনের ভয়াবহতা বেড়েই চলেছে। পত্রিকার পাতা খুললেই অহরহ গৃহকর্মীদের নির্যাতনের নিষ্ঠুর ঘটনা চোখে পড়ে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত ১০ বছরে সংবাদপত্রে প্রকাশিত শিশু গৃহকর্মী নিগ্রহের প্রায় ১ হাজার ৭০টি ঘটনা প্রকাশিত হয়। এদের মধ্যে ৫৬৫টি শিশু মারা গেছে। প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৫০টি শিশু গৃহকর্মীর মৃত্যুর খবর সংবাদপত্রে ছাপা হয়। ২০১৬ সালে ঢাকার রিকশাচালক আবদুস সোবহানের কন্যাশিশু হাসিনাকে বাসাবাড়িতে গৃহকর্মী হিসেবে কাজে দেওয়ার চার মাসের মাথায় নির্মম নির্যাতনে মৃত্যু হয়। হাসিনার সারা শরীরে ছিল নির্যাতনের চিহ্ন। ময়নাতদন্তে তাকে ধর্ষণ করা হয়েছিল বলেও আলামত পাওয়া যায়। ৩০ মার্চ ২০১৭, মোহাম্মদপুরের শাহজাহান রোডের একটি বাড়িতে ঐশী (১১) নামের এক শিশু গৃহকর্মীর অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা ধামাচাপা দেওয়া হয়। ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, রাজধানীর উত্তরায় শিশু গৃহকর্মী হনুফা আক্তারের (১১) মৃত্যুকেও শেষ পর্যন্ত চালিয়ে দেওয়া হয় আত্মহত্যা বলে। সর্বশেষ ২৪ অক্টোবর জান্নাতী নামে একটি মেয়ে শিশু মারা গেছে ঢাকার মোহাম্মদপুরে। অল্প কিছু টাকার বিনিময়ে দরিদ্র শিশুটির শৈশব কেড়ে নেওয়া হবে তা তার অবিভাবকরা জানলেও বুঝতে পারে নি যে, জীবনটাও তার কেড়ে নেওয়া হবে। জান্নাতীর হত্যাকরী প্রকৌশলী সাঈদের স্ত্রী রোকসানা পারভীনকে পুলিশ কাছে জান্নাতীকে হত্যার কথা স্বীকার করেছে। সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ মর্গ সূত্র জানিয়েছে, জান্নাতীর শরীরে নতুন-পুরোনো অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন আছে। তাঁরা ধারণা করছেন, মৃত্যুর আগে জান্নাতী ধর্ষণের শিকার হয়েছিল। (প্রথম আলো, ২৫ অক্টোবর ২০১৯)।
নির্যাতনকারীরা সবসময়েই হয় প্রভাবশালী আর নির্যাতিতরা হয় গরিব ও অসহায়। টাকা আর ক্ষমতার বিনিময়ে নির্যাতনকারীরা পার পেয়ে যাওয়ায় থামছে না গৃহকর্মী নির্যাতন। স্বাধীনতার ৫০ বছর পরেও নির্যাতিতদের নির্যাতনের কথা প্রকাশ পেতে অপেক্ষা করতে হয় মৃত্যু পর্যন্ত। যেমন জান্নাতীর মৃত্যুই তার ওপর নির্মম নির্যাতনের চিত্র সবার সামনে ফাঁস করতে সক্ষম হয়েছে। আবার হত্যাকান্ডের বিচার পেতে অপেক্ষা করতে হয় ব্যাপক প্রতিবাদ ও আন্দোলন হওয়া পর্যন্ত। তবে জান্নাতীকে নিয়ে সেরকম প্রতিবাদ ও আন্দোলন হবার সম্ভবনা ক্ষীণ। কোন প্রতিবাদ ছাড়াই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নির্যাতনকারী ও হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মধ্যদিয়ে গৃহকর্মী নির্যাতনের অবসান কবে হবে তা কেউ বলতে পারে না।

 

গৃহকর্মীদের উপর নিষ্ঠুর নির্মম নির্যাতনকারীদের তালিকায় রয়েছে প্রায় সব শ্রেণী পেশার মানুষ। রয়েছে আমলা, বিচারপতি, ও বড় বড় প্রভাবশালীরা। মুখে যারা মানবাধিকারের বুলি আওড়ান তাদের অনেকের ঘরেও এখন গৃহকর্মীরা নির্যাতিত হচ্ছে। অথচ রসুলুল্লাহ (সা.) গৃহকর্মীদের সঙ্গে সম্মান জনক ব্যবহার করতেন। তাদের সঙ্গে আহার গ্রহণ করতেন। তিনি গৃহকর্মীদের সঙ্গে কখনোই কঠোর ব্যবহার করেননি। গৃহকর্মীদের সঙ্গে তাঁর ব্যবহার কেমন ছিল তা হযরত আনাস (রা.) এর মন্তব্য থেকেই বোঝা যায়। আনাস (রা.) বলেন,

خدمتُ رسول اللهِ صلى الله عليه وسلم عَشْرَ سنين ، فما قَالَ لي قَطُّ : أُفٍّ، وَلاَ قَالَ لِشَيءٍ فَعَلْتُهُ : لِمَ فَعَلْتَه ؟ وَلاَ لشَيءٍ لَمْ أفعله : ألاَ فَعَلْتَ كَذا ؟

আমি (শিশু অবস্থায়) সুদীর্ঘ দশ বছর রসুলে আকরাম (সা.) এর খেদমতে নিয়োজিত ছিলাম। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ে তিনি কখনো আমার প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করে উহ শব্দও উচ্চারণ করেননি; কিংবা আমার কোন কাজের জন্যে বলেননি যে, ‘কেন তুমি এটা করলে?’ অথবা কোনো কর্তব্য পালন না করে থাকলেও বলেননি, ‘কেন তুমি এটা করনি?’ (বুখারি : ৫৬৯১)।
এধরণের ক্ষমার মানসিকতা সৃষ্টি হলেই গৃহকর্মী নির্যাতন বন্ধ হবে। এক হাদিসে এসেছে,

جاء رجل إِلى رسولِ الله صلى الله عليه وسلم ، فقال : يا رسولَ الله ، كم أعْفو عن الخادم؟ فَصَمَت عنه رسولُ الله صلى الله عليه وسلم ، ثم قال : يا رسولَ الله ، كم أعْفو عن الخادم ؟ فقال : اعْف عنه كلَّ يوم سبعين مرة

এক সাহাবি এসে রসুলুল্লাহ (সা.) কে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রসুলুল্লাহ (সা.) আমরা গৃহকর্মীকে কতবার ক্ষমা করব? রসুলুল্লাহ (সা.) চুপ থাকলেন। প্রশ্নকারী আবার জিজ্ঞেস করলেন, এবারও আল্লাহর রসুল (সা.) চুপ থাকলেন। তৃতীয়বার প্রশ্নের উত্তরে বললেন, ‘প্রতিদিন ৭০ বার ক্ষমা করবে।’  (তিরমিজি : ১৯৪৯)।
রসুলুল্লাহ (সা.) গৃহকর্মীকে কষ্ট দেওয়া, অপমান করা ও নির্যাতন করার ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছেন। আবু মাসউদ আনসারী (রা.) থেকে বর্ণিত,

كُنْتُ أَضْرِبُ غُلاَمًا لِى بِالسَّوْطِ فَسَمِعْتُ صَوْتًا مِنْ خَلْفِى : اعْلَمْ أَبَا مَسْعُودٍ فَلَمْ أَفْهَمِ الصَّوْتَ مِنَ الْغَضَبِ فَقَالَ : اعْلَمْ أَبَا مَسْعُودٍ . فَلَمَّا دَنَا مِنِّى إِذَا هُوَ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم فَقَالَ : اعْلَمْ أَبَا مَسْعُودٍ أَنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ أَقْدَرُ عَلَيْكَ مِنْكَ عَلَى هَذَا الْغُلاَمِ . فَأَلْقَيْتُ السَّوْطَ مِنْ يَدِى وَقُلْتُ : لاَ أَضْرِبُ غُلاَمًا بَعْدَ الْيَوْمِ أَبَدًا

একদা আমি আমার এক গোলামকে প্রহার করছিলাম, এমতাবস্থায় পেছন থেকে একটি আওয়াজ শুনতে পেলাম, সাবধান! হে আবু মাসউদ। রাগের কারণে আমি সে আওয়াজ ভালোভাবে শুনিনি। আমার কাছে আসার পর দেখলাম স্বয়ং আল্লাহর রসুল (সা.) বলেছেন সাবধান, হে আবু মাসউদ! সাবধান, হে আবু মাসউদ! বর্ণনাকারী বলেন, এরপর আমি হাত থেকে লাঠিটা ফেলে দিলাম। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, সাবধান, হে আবু মাসউদ! তুমি তার উপর যতটুকু ক্ষমতাবান, তার চেয়েও বেশি আল্লাহ তায়ালা তোমার উপর ক্ষমতাবান। এরপর আমি বললাম, আমি আর কখনো কোন গোলামকে প্রহার করব না। (মুসলিম : ৪৩৯৭)।
অন্য হাদিসে এসেছে,

كُنْتُ أَضْرِبُ غُلاَمًا لِى فَسَمِعْتُ مِنْ خَلْفِى صَوْتًا : اعْلَمْ أَبَا مَسْعُودٍ اعْلَمْ أَبَا مَسْعُودٍ اعْلَمْ أَبَا مَسْعُودٍ لَلَّهُ أَقْدَرُ عَلَيْكَ مِنْكَ عَلَيْهِ . فَالْتَفَتُّ فَإِذَا هُوَ النَّبِىُّ -صلى الله عليه وسلم فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ هُوَ حُرٌّ لِوَجْهِ اللَّهِ قَالَ : أَمَا لَوْ لَمْ تَفْعَلْ لَلَفَعَتْكَ النَّارُ أَوْ لَمَسَّتْكَ النَّارُ

একদা আমি আমার এক গোলামকে প্রহার করছিলাম, এমতাবস্থায় পেছন থেকে একটি আওয়াজ শুনতে পেলাম, সাবধান! হে আবু মাসউদ। রাগের কারণে আমি সে আওয়াজ ভালোভাবে শুনিনি। আমার কাছে আসার পর দেখলাম স্বয়ং আল্লাহর রসুল (সা.) বলেছেন সাবধান, হে আবু মাসউদ! সাবধান, হে আবু মাসউদ! বর্ণনাকারী বলেন, এরপর আমি হাত থেকে লাঠিটা ফেলে দিলাম। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, সাবধান, হে আবু মাসউদ! তুমি তার উপর যতটুকু ক্ষমতাবান, তার চেয়েও বেশি আল্লাহ তায়ালা তোমার উপর ক্ষমতাবান। এরপর আমি বললাম, ইয়া রসুলুল্লাহ! সে এখন আযাদ। এরপর রসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘শোন! যদি তুমি তা না করতে তাহলে অবশ্যই জাহান্নামের আগুন তোমাকে ঝলসে দিত।’ (মুসলিম : ৪৩৯৮)।

একবার হযরত আবু যর (রা.) তার গোলামকে কটু কথা বললেন এবং তার মায়ের ব্যাপারেও কুটক্তি করলেন৷ এটা দেখে রসুলে আকরাম (সা.) আবু যর (রা.) কে কঠোর ভাবে হুঁশিয়ার করে বললেন,

إِنَّكَ امْرُؤٌ فِيكَ جَاهِلِيَّةٌ، إِخْوَانُكُمْ خَوَلُكُمْ جَعَلَهُمُ اللهُ تَحْتَ أَيْدِيكُمْ، فَمَنْ كَانَ أَخُوهُ تَحْتَ يَدِهِ فَلْيُطْعِمْهُ مِمَّا يَأْكُلُ، وَلْيُلْبِسْهُ مِمَّا يَلْبَسُ، وَلاَ تُكَلِّفُوهُمْ مَا يَغْلِبُهُمْ، فَإِنْ كَلَّفْتُمُوهُمْ فَأَعِينُوهُمْ

‘তোমার মধ্যে এখনো জাহিলিয়াত রয়েছে৷ এই লোকগুলি তোমাদের ভাই৷ আল্লাহ তাদেরকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন৷ অতএব যে ব্যক্তিদের অধীনে তার ভাই রেয়েছে তারা যা খাবে অধিনস্তদের তাই খাওয়াবে এবং তারা যেই মানের পোশাক পরিধান করবে অধিনস্তদের সেই মানের পোশাক পরিধান করাবে। সাধ্যাতীত কাজের জন্য তাকে বাধ্য করা যাবে না। আর কাজ যদি তাকে দিয়েই করাতে হয় তবে গৃহকর্তী বা গৃহস্বামী তাকে সাহায্য করবে।’ (বুখারি : ৩০)। এই হাদিসের মধ্যে কাজের লোকদেরকে পরিবারের সদস্য জ্ঞান করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অধিকাংশ সময় কাজের লোকদেরকে উচ্ছিষ্ট ও নিম্নমানের খাবার দেওয়া হয়। আবার অনেকে সময় বেড়াতে গিয়ে কিংবা রেস্টুরেন্টে গিয়ে গৃহকর্মীকে খাবার না দিয়ে নিজেদের পাশে বসিয়ে রাখা হয় অথবা কমদামী খাবার খেতে দেওয়া হয়। এ জাতীয় বিভাজন ইসলামী আদর্শ ও চেতনার স¤পূর্ণ বিপরীত।
অতএব গৃহকর্মী নির্যাতন বন্ধে কঠোর আইন, দ্রুত বিচারের পাশাপাশি ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ইসলামের আলোকে পরিবর্তন করতে হবে মানুষের মনমানসিকতা। কেননা গৃহকর্মী নির্যাতনের পেছনে মানসিক দৃষ্টিভঙ্গিগত সমস্যা কিংবা অহংবোধের বিকারগস্ততা অনেকাংশেই দায়ী।

শেয়ার করুন

Leave a Comment