নবীকে জীবনের চেয়েও বেশি ভালবাসতে হবে

শাহ মাহমুদ হাসান।।

হযরত মুহাম্মদ (সা.) সর্বশেষ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রসুল। তিনি ছিলেন সমস্ত বিশ্ববাসীর জন্য রহমত, অনুগ্রহ ও ভালবাসা। আল্লাহ তায়ালা রসুলের শানে ইরশাদ করেন, ‘আমি আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্যে রহমত স্বরূপই প্রেরণ করেছি।’ (সূরা আম্বিয়া : ১০৭)।

রসুলের প্রতি বিশ্ববাসীর শ্রদ্ধা ভালবাসা
পৃথিবীর সকল জীব ও পদার্থ রসুলকে ভালবাসত এবং তাঁকে গভীর শ্রদ্ধা করত। এ ব্যাপারে রসুল (সা.) নিজেইে ইরশাদ করেছেন,

إِنِّى لأَعْرِفُ حَجَرًا بِمَكَّةَ كَانَ يُسَلِّمُ عَلَىَّ قَبْلَ أَنْ أُبْعَثَ

إِنِّى لأَعْرِفُهُ الآن

‘আমি মক্কার সেই পাথরগুলোকে এখনো চিনি যারা আমার নবুয়াতের পূর্বে আমাকে সালাম দিত।’ (মুসলিম : ৬০৭৮)। হজরত আলী (রা.) বলেছেন,

كنت مع النبي صلى الله عليه و سلم بمكة فخرجنا في بعض نواحيها فما استقبله جبل ولا شجر إلا وهو يقول السلام عليك يا رسول الله

আমি একবার মক্কায় রসুলের সফর সঙ্গী ছিলাম। যখনই কোন পাহাড় ও গাছপালা রসুলের সমানে পরত তখনই তা বলত আস সালামু আলাইকা ইয়া রসুলুল্লাহ। (তিরমিজি : ৩৬২৬)। হজরত জাবের বিন আব্দুলাহ বলেন,

كان المسجد مسقوفا على جذوع من نخل فكان النبي صلى الله عليه و سلم إذا خطب يقوم إلى جذع منها فلما صنع له المنبر وكان عليه فسمعنا لذلك الجذع صوتا كصوت العشار حتى جاء النبي صلى الله عليه و سلم فوضع يده عليها فسكنت

মসজিদে নববীর একটি খেজুর বৃক্ষের কান্ডের উপর রসুল (সা.) দাড়িয়ে খুতবা দিতেন। এরপর রসুলের জন্য একটি কাঠের মেম্বার বানান হলো। রসুল যখন উক্ত মেম্বারে বসে খুতবা দিতে গেলেন তখন আমরা শুনলাম কান্ডটি শিশুর মত চিৎকার করে কাঁদতে লাগল। রসুল মিম্বার হতে নেমে এসে ওটাকে জড়িয়ে ধরলেন। তখন তা শান্ত হলো। (বুখারি : ৩৩৯২)।

রসুলকে ভালবাসা ইমানের দাবি

একজন মুসলমান নবিজিকে পরিবার-পরিজন, স্ত্রী-সন্তান, মা-বাবার, ধন-সম্পদের চেয়েও বেশি ভালোবাসে। নবীকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালবাসা মুমিনের একান্ত কর্তব্য। এমন ভালোবাসা না থাকলে কেউ প্রকৃত মুসলিম হতে পারে না। আল্লাহ তায়ালা মুমিনদেরকে রসুল (সা.) এর প্রতি গভীর ভালবাসা বজায় রাখতে বলেছেন,

النَّبِيُّ أَوْلَى بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنْفُسِهِمْ

‘নবী মুমিনদের কাছে তাদের নিজেদের চেয়েও অধিক ঘনিষ্ঠ।’ (সূরা আহযাব : ৬)। আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন,

قُلْ إِنْ كَانَ آبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ وَإِخْوَانُكُمْ وَأَزْوَاجُكُمْ وَعَشِيرَتُكُمْ وَأَمْوَالٌ اقْتَرَفْتُمُوهَا وَتِجَارَةٌ تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَمَسَاكِنُ تَرْضَوْنَهَا أَحَبَّ إِلَيْكُمْ مِنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَجِهَادٍ فِي سَبِيلِهِ فَتَرَبَّصُوا حَتَّى يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ [التوبة : ২৪]

‘বলুন, তোমাদের নিকট যদি তোমাদের পিতা তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই তোমাদের পতœী, তোমাদের গোত্র তোমাদের অর্জিত ধন-সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা যা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় কর এবং তোমাদের বাসস্থান-যাকে তোমরা পছন্দ কর-আল্লাহ, তাঁর রসুল ও তাঁর রাহে জেহাদ করা থেকে অধিক প্রিয় হয়, তাহলে অপেক্ষা করো আল্লাহর (আজাবের) নির্দেশ আসা পর্যন্ত। আল্লাহ পাপাচারী সম্প্রদায়কে হেদায়েত দেন না।’ (সূরা তওবা : ২৪)।
তাই প্রত্যেক মুসলমানের অন্তরে নবীর প্রতি গভীর ভালবাসা থাকা ইমানের দাবি। যার মাঝে নবীপ্রেম নেই তার মধ্যে ঈমান নেই। তাইতো রসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন,

لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُوْنَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَلَدِهِ وَوَالِدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِيْنَ

‘তোমাদের কেউ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা-মাতা, সন্তান ও সব মানুষের চেয়ে বেশি প্রিয় হই। (বুখারি : ১৪)। হাদীসের এই দাবি প্রতিফলিত হয়েছিল সাহাবীদের বাস্তব জীবনে। মহানবী (সা.) ছিলেন সাহাবীদের কাছে তাঁদের জীবনের চেয়েও প্রিয়। হযরত ওমর (রা.) রসুল (সা.) কে বললেন, হে রসুল! আমি আপনাকে সবচাইতে বেশি ভালবাসি তবে আমার নিজের চাইতে বেশি নয়। রসুল (সা.) বললেন, ‘আল্লাহর শপথ! তোমার নিজের চাইতেও আমাকে বেশি ভালবাসতে হবে।’ তখন ওমর (রা.) বললেন, এখন আমি আপনাকে নিজের চেয়েও বেশি ভালবাসি। অত:পর রসুল (সা.) বললেন, ‘হে ওমর তাহলে এখন ঠিক আছে।’ (বুখারি : ৬২৫৭)। আরেক সাহবী হযরত জায়িদ ইবনে দাসিনা (রা.) কে হারাম শরীফের বাইরে তানয়ীমে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল হত্যার উদ্দেশ্যে। সেখানে আবু সুফিয়ান সহ কোরাইশদের এক বিরাট জনতা জায়িদকে ঘিরে ধরলো। জায়িদকে যখন হত্যা করার জন্য এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হল তখন আবু সুফিয়ান বললো, ‘হে জায়িদ, তোমার বদলে আজ যদি আমরা মুহাম্মাদকে হাতে পাই ও তাকে হত্যা করি এবং তোমাকে তোমার পরিবার পরিজনের কাছে পাঠিয়ে দেই, তাহলে তুমি কি তা পছন্দ করবে?’ জায়িদ বললেন, ‘আল্লাহর কসম, আমি এতটুকুও পছন্দ করব না যে, মুহাম্মাদ (সা.) যেখানে আছেন সেখানে থাকা অবস্থাতেই তাঁর গায়ে কাঁটা ফুটবে, তিনি তাতে যন্ত্রণায় ভুগবেন আর আমি নিজে ও পরিবার পরিজনের মধ্যে আরামে বসে থাকব।’ তাই প্রকৃত মুমিন হওয়ার জন্য অপরিহার্য হলো রসুলের প্রতি সাহাবাদের মত সর্বোচ্চ ভালোবাসা পেষণ করা।

রসুলের ভালবাসায় মিলবে আল্লাহর ভালবাসা

রসুলকে অনুসরণ ও ভালবাসা ছাড়া আল্লাহর দয়া ও ভালবাসা লাভ করা যাবে না। আর প্রিয়পাত্র হওয়ার জন্য আল্লাহ তায়ালা একটি মানদন্ড নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এ স¤পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন,

قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ

‘বলুন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসো, তবে আমাকে অনুসরণ করো। তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করে দেবেন। আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সূরা আলে ইমরান : ৩১)। রসুলের প্রতি ভালবাসা থাকলেই ইমান পরিপূর্ণ হবে এবং ইমানের স্বাদ অনুভব করা যাবে। রসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন,

ثَلاثٌ مَنْ كُنَّ فِيهِ وَجَدَ حَلاوَةَ الإِيمانِ، أَنْ يَكُونَ اللهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمّا سِواهُما، وَأَنْ يُحِبَّ الْمَرْءَ لا يُحِبُّهُ إِلاّ للهِ، وَأَنْ يَكْرَهَ أَنْ يَعُودَ في الْكُفْرِ كَما يَكْرَهُ أَنْ يُقْذَفَ في النَّارِ

‘তিনটি গুণ যার মধ্যে আছে, সেই ইমানের স্বাদ আস্বাদন করতে পারবে। এক. আল্লাহ ও তাঁর রসুল তার কাছে অন্য সব কিছু থেকে অধিক প্রিয় হওয়া। দুই. কাউকে একমাত্র আল্লাহর জন্যই ভালোবাসা। তিন. কুফরিতে প্রত্যাবর্তনকে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মতো অপছন্দ করা। (বুখারি : ১৬)।
রসুলের ভালবাসার নিদর্শন
রসুলকে (সা.) যারা ভালবাসবে কাজে কর্মে তার আলামত ও নিদর্শন ফুটে উঠবে। রসুল (সা.) কে ভালোবাসার অন্যতম নিদর্শন হচ্ছে- রসুল (সা.) যা বলেছেন এবং যা করেছেন তার পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ ও আনুগত্য করা। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَنْ كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا

যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্যে রসুলুল্লাহর মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে। (সূরা আহযাব : ২১)। আল্লাহ তায়ালা রসুলের আনুগত্যকে তাঁর আনুগত্য হিসেবে ঘোষণা দিয়ে বলেছেন,

مَنْ يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ

‘যে ব্যক্তি রসুলের আনুগত্য করে সে আল্লাহর আনুগত্য করে।’ (সূরা নিসা : ৮০)। তাই রসুল (সা.) এর অনুসরণ ও আনুগত্য করাও সকল মুসলমানের ওপর ফরজ। এ স¤পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন,

وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا

‘রসুল তোমাদেরকে যে নির্দেশ দেন, তা গ্রহণ কর এবং যা নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাক।’ (সূরা হাশর : ৭)। অতএব, প্রত্যেক কাজে রসুলের অনুগত্য করার মধ্যেই রয়েছে রসুলের প্রতি ভালবাসার নিদর্শন। আর তাই রসুলের ভালবাসা যত বাড়বে রসুলের অনুসরণ এবং আনুগত্যও তত বাড়বে। আল্লাহ ও তাঁর রসুল (সা.) কে সর্ব বিষয়ে চূড়ান্ত ফয়সালাকারী হিসেবে মেনে নেওয়ার মধ্যেও রয়েছে রসুল (সা.) কে ভালবাসার নিদর্শন। এ প্রসংগে আল্লাহ বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا

‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহ ও রসুলের এবং তাদের যারা তোমাদের মধ্যে ফয়সালার অধিকারী। তারপর যদি তোমরা কোন বিষয়ে মতভেদ কর, তবে তা প্রত্যার্পণ কর আল্লাহ তাঁর রসুলের প্রতি। যদি তোমরা ইমান এনে থাক আল্লাহ এবং শেষ দিবসের প্রতি। আর এটাই উত্তম এবং পরিণামে কল্যাণকর।’ (সূরা নিসা : ৫৯)। কিন্তু যারা নিজেদেরকে মুসলমান দাবি করার পরেও আল্লাহ ও তাঁর রসুলের ফয়সালা মানতে পারে না তারা মূলত মোনাফেক। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يَزْعُمُونَ أَنَّهُمْ آمَنُوا بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنْزِلَ مِنْ قَبْلِكَ يُرِيدُونَ أَنْ يَتَحَاكَمُوا إِلَى الطَّاغُوتِ وَقَدْ أُمِرُوا أَنْ يَكْفُرُوا بِهِ وَيُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَنْ يُضِلَّهُمْ ضَلَالًا بَعِيدًا وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ تَعَالَوْا إِلَى مَا أَنْزَلَ اللَّهُ وَإِلَى الرَّسُولِ رَأَيْتَ الْمُنَافِقِينَ يَصُدُّونَ عَنْكَ صُدُودًا

‘আপনি তাদের দেখেননি যারা দাবি করে যে, আপনার প্রতি যা নাযিল হয়েছে এবং আপনার পূর্বে যা নাযিল হয়েছে তাতে তারা বিশ্বাসী? অথচ তারা বিচারপ্রার্থী হতে চায় তাগুতের কাছে, যদিও তাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে তা প্রত্যাখ্যান করতে। আর শয়তান তাদের পথভ্রষ্ট করে বহু দূরে নিতে চায়। আর যখন তাদের বলা হয়, এস আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তার দিকে এবং রসুলের দিকে, তখন আপনি মুনাফিকদের দেখবেন আপনার কাছ থেকে স¤পূর্ণভাবে মুখ ফিরিয়ে সরে যাচ্ছে।’ (সূরা নিসা : ৬০-৬১)।

রসুলের ভালবাসায় রয়েছে পরকালীন নাজাত ও মুক্তি

রসুলের প্রতি ভালবাসার কারণে বহু মানুষকে কিয়ামতের দিন মুক্তি দেওয়া হবে। একবার এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করল, হে আল্লাহর রসুল!

مَتَى السَّاعَةُ ؟ قَالَ رَسُول الله صلى الله عليه وسلم : مَا أعْدَدْتَ لَهَا ؟ قَالَ : حُبَّ الله ورسولهِ ، قَالَ : أنْتَ مَعَ مَنْ أحْبَبْتَ

কিয়ামত কখন হবে? জবাবে আল্লাহর রসুল পাল্টা প্রশ্ন করলেন, কিয়ামতের জন্য তুমি কী প্রস্তুতি নিয়েছ? লোকটি বলল, এর জন্য আমি তেমন কোনো প্রস্তুতি নিতে পারিনি; তবে আমি আল্লাহ ও তাঁর রসুলকে ভালোবাসি। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তুমি যাঁকে ভালোবাসো কিয়ামত দিবসে তুমি তাঁর সঙ্গেই থাকবে।’ (বুখারি : ৩৪৮৫)।

শেয়ার করুন

2 thoughts on “নবীকে জীবনের চেয়েও বেশি ভালবাসতে হবে”

Leave a Comment