যেসব পাপের শাস্তি দুনিয়াতেই দেওয়া হয়

শাহ মাহমুদ হাসান।।

মানুষ পাপকর্মের মাঝে সাময়িক সুখ খোজে। মূলত পাপের মধ্যে কোন সুখ বা শান্তি নেই। অপরাধ ও দুর্নীতি করে দুনিয়াতে সুখি হওয়া যায়না। পাপের মধ্যেই রয়েছে যাবতীয় অস্থিরতা ও পেরেশানি। পাপের কারণে পাপিকে দুনিয়াতেই লাঞ্ছিত ও অপদস্থ হতে হয়। আল্লাহদ্রোহিতা ও পাপাচারে মেতে ওঠে যারা শান্তির সন্ধান করে আল্লাহ তাআলা তাদের সুখ ও শান্তির সকল পথ বন্ধ করে দেন। এবং দুশ্চিন্তা ও দুঃখ-দুর্দশা তাদের ওপর চাপিয়ে দেন। একসময় তাদের বিলাসী জীবনের উপকরণ তাদের জন্য আজাব ও শাস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আল্লাহ তায়ালা তা পরিষ্কারভাবে মানুষকে জানিয়ে দিয়েছেন, ‘যে মন্দ কাজ করবে, তাকে সেই কাজের শাস্তি ভোগ করতে হবে।’ (সূরা নিসা : ১২৩)। পাপের শাস্তি শুধু যে পরকালেই হবে এমন নয় বরং দুনিয়াতেও মানুষ পাপের শাস্তি ভোগ করে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমি অবশ্যই তাদেরকে গুরু শাস্তির পূর্বে লঘু শাস্তি আস্বাদন করাব, যাতে তারা ফিরে আসে।’ (সূরা সেজদা : ২১)। উক্ত আয়াতে লঘু শাস্তি বলে দুনিয়ার বিপদাপদ ও রোগ-শোককে বোঝানো হয়েছে। আর গুরু শাস্তি দ্বারা পরকালের কঠিন শাস্তি বোঝানো হয়েছে। পাপের কারণে বিভিন্ন বিপদাপদ ও বিপর্যয় দেখা দেয়। আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন, জলে ও স্থলে মানুষের কৃতকর্মের দরুন বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে। আল্লাহ তাদেরকে তাদের কর্মের শাস্তি আস্বাদন করাতে চান, যাতে তারা ফিরে আসে।’ (সুরা রোম : ৪১)। এখানে বিপর্যয় বলে দুর্ভিক্ষ, মহামারী, অগ্নিকা-, বন্যা, যুদ্ধবিগ্রহ, নিরাপত্তাহীনতা ইত্যাদি আপদ-বিপদ বোঝানো হয়েছে। এমন কিছু পাপকর্ম রয়েছে যার প্রায়শ্চিত্ত দুনিয়াতেই মানুষকে ভোগ করতে হয়। যেমন-
১. আল্লাহ বিমুখ হওয়া
আল্লাহ বিমুখ হওয়ার প্রাথমিক শাস্তি হচ্ছে মানসিক অস্থিরতা ও যন্ত্রনা। পাপচারে নিমগ্ন হয়ে যারা আল্লাহর নিষেধাজ্ঞার কথা ভুলে যায় তাদের জন্য আল্লাহর হুঁশিয়ারি হলো, ‘এবং যে আমার জিকির থেকে বিমুখ হবে, তার জীবনযাত্রা সংকীর্ণ হবে এবং আমি তাকে কেয়ামতের দিন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করব। (সূরা ত্বহা : ১২৪)।
২. কুফর ও শিরক করা
অধিক পাপচারের কারণে মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা থাকে না। অপরাধী ব্যাক্তি সর্বদা অশান্তি ও অস্বস্তিবোধ করে। তারা থাকে সবসময় আতঙ্কগ্রস্থ। আল্লাহর সাথে কুফর ও শিরক করাটাও এমন এক মারাত্মক অপরাধ যাতে মানুষের মধ্যে ভয় ভীতি ও আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। আল্লাহ তাআলার ইরশাদ, ‘আমি কাফিরদের অন্তরে ভীতি ঢুকিয়ে দেব, তারা আল্লাহর সঙ্গে শিরক স্থাপন করেছে।’ (সূরা আল ইমরান : ১৫১)।
৩. অশ্লীলতা
মানুষ যখন পাপচারের সব সীমা ছাড়িয়ে যাবে এবং অশ্লীলতার শ্রোতে গা ভাসিয়ে দিবে তখন তাদের মধ্যে দূরারোগ্যব্যাধির সংক্রমন ঘটবে বলে হাদিসের মাঝে হুশিয়ারি রয়েছে, ‘যখন কোন সম্প্রদায়ের মধ্যে অশ্লীলতা এমনভাবে ছড়িয়ে পড়বে যে তারা প্রকাশ্যে অশ্লীলতায় লিপ্ত হতে থাকে, তখন তাদের মাঝে এমন সব দূরারোগ্যব্যাধির সংক্রমন হবে, যা তাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে ছিল না।’ (ইবনে মাজাহ : ৪০১৯)।
৪. সুদ খাওয়া
মুসতাদরাক হাকেমের বর্ণনায় এসেছে, ‘যখন কোন জাতির মধ্যে ব্যভিচার ও সুদ ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পরে, তখন আল্লাহ পাক সেই জাতিকে ধ্বংস করার নির্দেশ দেন।’ ইরশাদ হচ্ছে, ‘তিনি সুদকে ধ্বংস করে দেন এবং দান-সাদকাকে বৃদ্ধি করে দেন।’ (সূরা বাকারা : ২৭৬)। এই ধ্বংস ও পতন হতে পারে বিভিন্নভাবে। যেমন আসমানি-যমিনি বালা মুসিবত, প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাধ্যমে সুদের অর্থ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। আবার আসতে পারে কোর দূরারোগ্য ব্যাধি, যা সুদখোরকে তিলে-তিলে নিঃশেষ করে দিতে পারে।

৫. জুয়া ও মদপান
মদপান ও জুয়া খেলা উভয় শয়তানের কাজ। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘হে মুমিনরা, মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্য নির্ধারক শরগুলো শয়তানের কার্য বৈ কিছু নয়। অতএব, এগুলো থেকে বেঁচে থাক, যাতে তোমরা কল্যাণপ্রাপ্ত হও। (সূরা মায়েদাহ ৯০)।
এছাড়াও ৬. অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ, ৭. ব্যভিচার, ৮. ওজনে কম দেওয়া, ৯. অন্যায়ভাবে বিচার-ফয়সালা করা ও ১০. প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা এই অপরাধগুলোর শাস্তিও পাপিকে দুনিয়াতে ভোগ করতে হয়। যেমন হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ‘কোনো জাতির মধ্যে আত্মসাৎ করার প্রবণতা বেড়ে গেলে সে জাতির অন্তরে ভয়ের সঞ্চার করা হয়। কোনো জাতির মধ্যে ব্যভিচার ছড়িয়ে পড়লে সেখানে অপমৃত্যুর হার বেরে যায়। কোনো সম্প্রদায়ের লোকেরা ওজনে কম দিলে তাদের রিজিক সংকুচিত করা হয়। কোনো জাতির লোকেরা অন্যায়ভাবে বিচার-ফয়সালা করলে তাদের মধ্যে রক্তপাত বিস্তৃতি লাভ করে। কোনো জাতি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করলে আল্লাহ তাদের ওপর শত্রুদের চাপিয়ে দেন।’ (মুয়াত্তা মালেক : ১৩২৩)।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বড় বড় পাপী ও অপরাধীদের দুনিয়াতেই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হয়েছে। যেমন হজরত নুহ (আ.)-এর উম্মতদের অবাধ্যতা যখন চরমে পৌছেছে তখন আল্লাহ মহা প্লাবন দিয়ে গোটা জাতিকে ধ্বংস করে দিয়েছেন। আদ জাতির পাপের কারণে তাদের ওপর টানা আট দিন প্রবল ঝড়-ঝঞ্ঝা বয়ে যায়। এতে তারা সমূলে ধ্বংস হয়। সামুদ জাতিকে বিকট আওয়াজ ও ভূমিকম্পন দিয়ে ধ্বংস করা হয়। লুত (আ.) এর সম্প্রদায়ের পাপাচারের কারণে তাদের পুরো বস্তি উল্টে দিয়ে ধ্বংস করা হয়। সুতরাং আমরাও যদি পাপাচারে গা ভাসিয়ে দেই আল্লাহর গজব ও শাস্তি থেকে আমরাও রেহাই পাব না।
অতএব, যেকোনমূল্যে আমাদেরকে যাবতীয় পাপকর্ম থেকে বিরত থাকতে হবে। কৃত পাপের জন্য অনুতপ্ত হয়ে তওবা করতে হবে এবং ভবিষ্যতে পাপকর্ম না করার ব্যাপারে সংকল্পবদ্ধ হতে হবে। এতে দুনিয়ার জীবনও আমাদের জন্য সুখময় হবে। কেননা অপরাধমুক্ত জীবনের প্রতিজ্ঞা ও ভালো কাজের মাঝেই রয়েছে মানসিক প্রশান্তি ও সুখি জীবন লাভ করার নিশ্চয়তা। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘যে সৎকর্ম স¤পাদন করে এবং সে ঈমানদার, পুরুষ হোক কিংবা নারী আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করব এবং তাদের কৃতকর্মের চেয়ে উত্তম প্রতিদান দান করব।’ (সূরা নাহল : ৯৭)।

শেয়ার করুন

Leave a Comment