নির্বিচারে মানুষ হত্যা মহাপাপ

শাহ মাহমুদ হাসান

 

ইসলামে শুধু মানুষ হত্যা করাই অপরাধ নয় বরং মানুষকে হত্যার ইচ্ছা করা, হত্যার পরিকল্পনা করা, হত্যার জন্য কাউকে প্ররোচিত করাও হত্যার অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। একজন মুমিন যার মধ্যে খোদাভীতি আছে সে কখনও অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা করতে পারে না, মানুষ হত্যায় কাউকে প্ররোচিত করতেও পারে না। কারণ মানুষ হত্যা করার ব্যাপারে কোরআনে রয়েছে কঠোর হুঁশিয়ারি।

আল্লাহ বলেন, ‘কেউ স্বেচ্ছায় কোনো মুমিনকে হত্যা করলে তার শাস্তি জাহান্নাম, সেখানে সে চিরকাল অবস্থান করবে। আর আল্লাহ তার প্রতি ক্রুদ্ধ হয়েছেন ও তাকে অভিশপ্ত করেছেন এবং তার জন্য মারাত্মক শাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন।’ (সুরা নিসা : ৯৩)। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে কোনো মুসলমানের হত্যাকান্ড সমগ্র পৃথিবীর ধ্বংস হয়ে যাওয়ার চেয়েও মারাত্মক ঘটনা।’ (তিরমিজি : ১৩৯৫)
কেয়ামতের দিন সর্বপ্রথম হত্যাকান্ডের বিচার করা হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘হত্যার ভয়াবহতার কারণে কেয়ামত দিবসে সর্বপ্রথম খুনের বিচার করা হবে।’ (বুখারি : ৬৩৫৭)। রাসুলুল্লাহ (সা.) কোনো মুসলমানকে অন্যায়ভাবে হত্যা করাকে কুফরি বলে আখ্যায়িত করে বলেছেন, ‘কোনো মুসলমানকে গালি দেওয়া ফাসেকি কাজ এবং তাকে হত্যা করা কুফরি।’ (বুখারি : ৬০৪৪)
নিরপরাধ ও নির্দোষ মানুষকে গণধোলাই দিয়ে বা কুপিয়ে হত্যা করা ইসলামে জঘন্য অপরাধ। নরহত্যা, গুপ্তহত্যা, গুম, খুনের বিরুদ্ধে ইসলাম শক্ত অবস্থান নিয়েছে। পবিত্র কোরআনে নরহত্যাকে চিরতরে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন, যথার্থ কারণ ব্যতিরেকে তোমরা তাকে হত্যা কর না।’ (সুরা বনি ইসরাইল : ৩৩)
পবিত্র কোরআনে একজন নিরপরাধ মানুষের হত্যাকে পুরো মানবজাতির হত্যা বলে অভিহিত করা হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছেÑ ‘যে কেউ প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ অথবা পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করা ছাড়া কাউকে হত্যা করল, সে যেন গোটা মানবজাতিকেই হত্যা করল।’ (সুরা মায়েদা : ৩১)। অন্যদিকে একজন মানুষের জীবন রক্ষাকেও গোটা মানবজাতির জীবন রক্ষা বলে সাব্যস্ত করে বলা হয়েছে, ‘এবং যে ব্যক্তি কারও জীবন বাঁচাল, সে যেন গোটা মানবজাতিকে বাঁচাল।’ (সুরা মায়েদা : ৩২)
মানুষের জীবনের মূল্য অত্যন্ত বেশি হওয়ায় তার সুরক্ষা ও নিরাপত্তার জন্য আল্লাহ তায়ালা কিসাসের মতো কঠোর শাস্তির বিধান দিয়েছেন। কিসাস হচ্ছে কেউ কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করলে এর শাস্তিস্বরূপ ঘাতককে মৃত্যুদÐে দÐিত করা। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘হে ইমানদারগণ! তোমাদের প্রতি নিহতদের ব্যাপারে কিসাস গ্রহণ করা বিধিবদ্ধ করা হয়েছে।’ (সুরা বাকারা : ১৭৮)। এই কিসাসের মধ্যেই রয়েছে মানবজাতির নিরাপত্তা ও জীবনের নিশ্চয়তা। আল্লাহ তায়ালা বলন, ‘হে বুদ্ধিমানগণ! কিসাসের মধ্যে তোমাদের জন্য জীবন রয়েছে, যাতে তোমরা সাবধান হতে পার।’ (সুরা বাকারা : ১৭৯)। কেননা অন্যায়ভাবে যখন কোনো ব্যক্তি কোনো মানুষকে হত্যা করে তখন সে মানব সমাজে বেঁচে থাকার অধিকার হারিয়ে ফেলে। সে মানব সমাজের নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকিতে পরিণত হয়। মানব সমাজ টিকিয়ে রাখার জন্য তার অপসারণ অপরিহার্য হয়ে ওঠে। আর এই অপসারণের কাজটিই সম্পন্ন করা হয় কিসাস তথা ঘাতকের মৃত্যুদÐ কার্যকরের মাধ্যমে। তাই কোনো ঘাতকের মৃত্যুদÐ কার্যকর করার অর্থই হচ্ছে অন্যান্য মানুষের নিরাপদ জীবন লাভের পরিবেশ সৃষ্টি করা।
কিসাস বা শাস্তি প্রয়োগের এই কাজটি পালন করবে রাষ্টশক্তি। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আইন নিজেদের হাতে তুলে নিতে পারবে না। কোথাও অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়লে প্রশাসনের সহায়তা নিতে হবে। গুজব ছড়িয়ে কাউকে ছেলেধরা বলে গণপিটুনি দেওয়া শুরু হলে বহু নিরপরাধ মানুষও জুলুমের ও খুনের শিকার হবে। অনিরাপদ হয়ে উঠবে আরও বহু মানুষের জীবন। তাই হুজুগের বসে গণপিটুনির মাধ্যমে বিনা বিচারে মানুষ হত্যা থেকে আমাদের অবশ্যই বিরত থাকতে হবে। আর প্রশাসনের কাজ হচ্ছে অপরাধীদের অতিদ্রæত বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করে বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা। কেননা বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষ যখন আস্থা হারিয়ে ফেলে তখনই জনমনে আইন হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা ছড়িয়ে পড়ে।

শেয়ার করুন

Leave a Comment