সততার অভাবে সমাজ অস্থির

শাহ মাহমুদ হাসান

 

আমাদের সমাজে সততার দুর্ভীক্ষ চলছে। মিথ্যা, প্রতারণা সমাজটাকে কলুষিত করে ফেলেছে। যার ফলে আমাদের সমাজে অপরাধ, অশান্তি ও অস্থিরতা দিন-দিন বেড়েই চলছে। সততা না থাকার কারণে সমাজের বহু মানুষ বিভিন্ন ধরণের অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ছে এবং চুরি, ডাকাতি, দুর্নীতি, খুন-খারাবির মত অপরাধ করছে। তাদের মধ্যে সততা ও নৈতিকতা থাকলে তারা এ ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ত না। কারণ সৎ মানুষেরা কখনও অপরাধ ও দুর্নীতি করে না এবং তাদের দ্বারা কোন মানুষ ক্ষতিগ্রাস্তও হয় না। তাই ইসলামে সৎ ও ভালো কাজের প্রতি সর্বাধিক উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে এবং ভালো কাজের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে আসার জন্য বলা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘ভালো কাজে প্রতিযোগিতামূলকভাবে এগিয়ে যাও।’ সূরা বাকারা, আয়াত ১৪৮। মানব জীবনের আসল লক্ষ্যই হলো ভালো ও সৎকাজে নিজেকে নিবেদিত করা। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যিনি সৃষ্টি করেছেন মরণ ও জীবন, যাতে তোমাদেরকে পরীক্ষা করেন-কে তোমাদের মধ্যে কর্মে শ্রেষ্ঠ? (সূরা মুলক : ২)। মানুষকে সৎ ও ভালো বানানোর জন্য ইসলামে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা। যেমন-
নেক আমল করা
ভালো মানুষ হওয়ার জন্য এবং অপরাধমুক্ত জীবন গঠনের জন্য ইমান আনার পরপরই বেশি বেশি নেক আমল করতে হবে। জনৈক ব্যক্তি একবার বললেন, ইয়া রসুলুল্লাহ! মানুষের মধ্যে সবচেয়ে ভালো কে? তিনি বললেন, যার বয়স দীর্ঘ এবং আমলও ভালো। লোকটি বললেন, সবচেয়ে মন্দ লোক কে? তিনি বললেন, যার বয়স দীর্ঘ এবং আমলও খারাপ। (তিরমিজি : ২৩৩০)। অতএব ভালো মানুষ হতে হলে নেক আমল করার বিকল্প নেই। নেক আমলের মাধ্যমেই মানুষের জন্য নাজাতের ফয়সালা হবে। রসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, আমল যাকে পিছিয়ে রেখেছে বংশ তাকে এগিয়ে নিতে পারে না। (মুসলিম : ২৬৯৯)।
ভালো মানুষের সান্নিধ্য
মানুষের জন্য সততা এক অপরিহার্য গুণ। এই গুন অর্জনের জন্য সত্যপন্থীদের সান্নিধ্য নিতে কোরআনে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যানুসারীদের সঙ্গী হও।’ (সূরা তওবা : ১১৯)। সত্যবাদীদের সঙ্গে ওঠা-বসা, তাদের সাহচর্য, তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ স¤পর্ক রাখা খুবই উপযোগী।
মিথ্যা পরিহার করা
মিথ্যা সকল পাপের মূল। এক ব্যক্তি একদিন রসুলুল্লাহ (সা.) এর নিকট এসে বললেন, হে আল্লাহর নবী! আমি তিনটি অপকর্মে জড়িত। আমি মিথ্যা কথা বলি, চুরি করি এবং ব্যভিচার করি। এই পাপগুলো থেকে আমি কীভাবে মুক্তি পেতে পারি? রসুলুল্লাহ (সা.) তাকে বললেন, ‘তুমি প্রথমে মিথ্যা বলা ছেড়ে দাও।’ রসুলুল্লাহ (সা.) এর পরামর্শে লোকটি মিথ্যা কথা বলা ছেড়ে দিল। পরে দেখা গেল মিথ্যা কথা ছাড়ার কারণে অপর দুটি অপকর্মও সে সহজে ছেড়ে দিতে পাড়ল।
সত্যবাদিতা
সত্যবাদিতা মানুষকে মুক্তি দেয়। আর মিথ্যা পরিণামে মানুষকে ধ্বংস করে। হাদিসে এরশাদ হয়েছে, সত্য মানুষকে পূণ্যের দিকে ধাবমান করে, আর পূণ্য তাকে জান্নাতের দিকে নিয়ে যায়। মিথ্যা পাপাচারকে ডেকে আনে আর পাপাচার জাহান্নামে পৌঁছে দেয়। কোনো মানুষ যখন অনবরত মিথ্যা বলে তখন আল্লাহ তায়ালার কাছে সে মিথ্যাবাদী হিসেবে গণ্য হয়ে যায়। (বুখারি : ৫৭৪৩)।
তাকওয়া অবলম্বন
আল্লাহর কাছে ভাল হবার ও মর্যাদা পাবার মানদন্ড হচ্ছে তাকওয়া। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহর কাছে সে-ই সর্বাধিক মর্যাদাবান যে সর্বাধিক পরহেজগার।’ (সূরা হুজুরাত : ১৩)। কেননা যারা তাকওয়াবান তারা পরকালে আল্লাহ তালার নিকট তাদের জীবনের যাবতীয় কাজকর্মের হিসাব দেওয়ার ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত থাকে। তাই তারা তারা আল্লাহর ভয়ে সকল প্রকার অপরাধ ও অসৎ কাজ থেকে বিরত থাকে। তাছাড়া তাকওয়া হচ্ছে জান্নাত লাভের উৎকৃষ্ট উপায়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি তার প্রভুর সামনে উপস্থিত হওয়াকে ভয় করে এবং নিজের অন্তরকে কুপ্রবৃত্তি থেকে দূরে রাখে, জান্নাতই হবে তার জন্য চূড়ান্ত আবাসস্থল।’ (সূরা নাজিয়াত : ৪০-৪১)।
হালাল আহার গ্রহণ
হালাল খাদ্য গ্রহণ ব্যতীত আল্লাহ তায়ালার কাছে বান্দার কোন ভালো কাজ বা নেক আমোলের মূল্য নেই। হালাল খাদ্য গ্রহণকারীরাই নাজাত পবে এবং তাদের ঠিকানা হবে জান্নাত। রসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে লোক হালাল খেয়েছে, সুন্নাহ মোতাবেক আমল করেছে এবং মানুষকে কষ্ট দান থেকে বিরত রয়েছে, সে জান্নাতে যাবে।’ (তিরমিজি : ২৫২০)।
হারাম থেকে আত্মরক্ষা
হারাম পথে উপার্জিত সম্পদ কেয়ামতের দিন বান্দার কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হবে। সুদ-ঘুষ, চুরি-ডাকাতি, ছিনতাই-রাহাজানি, জুয়া, চাদাবাজি, জবর দখল, যৌতুক, প্রতারণা ইত্যাদি অসামাজিক অনাচারে লিপ্ত হয়ে জীবিকা উপার্জন করা যাবে না। অবৈধ পন্থায় উপার্জন করার ব্যপারে আল্লাহ তায়ালার কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ঐ শরীর জান্নাতে প্রবেশ করবে না যা হারাম খাদ্য দ্বারা গঠিত হয়েছে।’ (কানযুল উম্মাল : ৯২৭৩)।
সৎকাজের পুরুস্কার জান্নাত
ইসলাম সৎকাজে ব্যাপকভাবে উৎসাহ যুগিয়েছে। আল্লাহ তায়ালা মানুষকে সৎ কাজের প্রতি উৎসাহিত করতে গিয়ে বলেন, ‘মুমিন পুরুষ কিংবা নারী যে কেউ সৎকর্ম করবে আমি তাকে পবিত্র জীবন দেব এবং তাদের তাদের কর্মের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার দান করব।’ (সূরা নাহাল : ৯৭)। পরিত্র কোরআনে সৎকাজের পুরুস্কার ঘোষণা করে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘যারা ঈমান আনে আর সৎকাজ করে তাদের জন্য রয়েছে নেয়ামতে ভরা জান্নাত।’ (সূরা লোকমান : ৮)।

শেয়ার করুন

Leave a Comment