নেক আমল কবুল হবার পূর্বশর্ত

শাহ মাহমুদ হাসান।।


শিরক মুক্ত ঈমান: ঈমান ছাড়া কোন আমলই আল্লাহ তায়ালার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। আমলের মধ্যে শিরক থাকার কারণে ভাল আমলগুলোকেও ধ্বংস করা হবে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, এবং তাদের সমস্ত আমল নিয়ে আমি ধূলোর মতো উড়িয়ে দেবো। সূরা ফুরকান, আয়াত : ২৩। অবিশ্বাসীদের আমল যত ভালই হোক তা আল্লাহ তায়ালা কাছে মূল্যহীন। এ কথাই উচ্চারিত হয়েছে নিম্নোক্ত আয়াতের মাঝে। ‘যারা স্বীয় পালনকর্তার সত্তার অবিশ্বাসী তাদের অবস্থা এই যে, তাদের কর্মসমূহ ছাইভস্মের মত যার উপর দিয়ে প্রবল বাতাস বয়ে যায় ধূলিঝড়ের দিন। তাদের উপার্জনের কোন অংশই তাদের করতলগত হবে না। এটাই দুরবর্তী পথভ্রষ্টতা। সূরা ইবরাহিম, আয়াত : ১৮।
‘যে সৎকর্ম স¤পাদন করে এবং সে ঈমানদার, পুরুষ হোক কিংবা নারী আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করব এবং প্রতিদানে তাদেরকে তাদের উত্তম কাজের কারণে প্রাপ্য পুরষ্কার দেব যা তারা করত।’ সূরা নাহাল, আয়াত : ৯৭। আল্লাহ তায়ালা অন্যত্র ইরশাদ করেন, ‘আর যারা পরকাল কামনা করে এবং মুমিন অবস্থায় তার জন্য যথাযথ চেষ্টা-সাধনা করে, এমন লোকদের চেষ্টাই স্বীকৃত হয়ে থাকে।’ সূরা বানি ইসরাঈল, আয়াত : ১৯। সূরা আসরের মধ্যেও আল্লাহ তায়ালা নেক আমলের পূর্বে ঈমানের শর্ত দিয়ে বলেছেন, ‘নিশ্চয় মানুষ বর ক্ষতিগ্রস্ত; কিন্তু তারা নয়, যারা ঈমান আনায়ন করে ও সৎকর্ম করে এবং পরস্পরকে তাকীদ করে সত্যের এবং তাকীদ করে সবরের।’
বেদআত মুক্ত আমল: বেদআতের ব্যাপারে রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বেদআত সম্পর্কে উম্মতকে সতর্ক করে বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তি যদি আমাদের এই দ্বীনের ভেতর এমন কিছু সৃষ্টি করে, যা তার অন্তর্ভুক্ত নয়, তবে তা প্রত্যাখ্যাত। বুখারি, হা/২৫৫০।’ তিনি আরো বলেছেন, ‘সবচেয়ে ভালো বাণী হচ্ছে আল্লাহর কিতাব। আর সবচেয়ে ভালো নিয়ম হলো মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিয়ম। আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট কাজ হলো (দ্বীনের ব্যাপারে) বিদআত তথা নতুন কিছু সৃষ্টি করা। আর প্রতিটি বিদআত হলো ভ্রষ্টতা।’ মুসলিম, হা/২০৪০।
ইখলাসপূর্ণ আমল: আমলের মধ্যে ইখলাস বা একনিষ্ঠতা থাকা চাই। এ ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘তাদেরকে এছাড়া কোন নির্দেশ করা হয়নি যে, তারা খাঁটি মনে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর এবাদত করবে, নামায কায়েম করবে এবং যাকাত দেবে। এটাই সঠিক ধর্ম।’ সূরা বাইয়্যেনা, আয়াত : ৫। ইবরাহিম আলাইহিস সালাম একনিষ্ঠভাবে সব কিছু আল্লাহ তায়ালার জন্য নিবেদন করে বলেছিলেন, ‘আমার নামায, আমার কোরবাণী এবং আমার জীবন ও মরন বিশ্ব-প্রতিপালক আল্লাহরই জন্যে নিবেদিত।’ সূরা আনআম, আয়াত : ১৬২।
নিয়ত পরিশুদ্ধ করণ: যে কোন নেক আমলের পূর্বেই নিয়তকে বিশুদ্ধ করে নিতে হবে। কারণ, ‘সকল কাজের প্রতিফল কেবল নিয়্যাতের ওপর নির্ভরশীল। প্রত্যেক ব্যক্তিই নিয়্যাত অনুসারে তার কাজের প্রতিফল পাবে।’ বুখারি, হা/১। হযরত মুয়াজ বিন জাবালকে ইয়ামেনে গভর্ণর হিসেবে প্রেরণের পূর্বে তিনি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন, ইয়া রসুলাল্লাহ আমাকে কিছু উপদেশ দিন, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তুমি তোমার দ্বীনকে পরিশুদ্ধ কর অল্প আমলই নাজাতের জন্য যথেষ্ঠ হবে।’ মুসতাদরাক হাকেম, হা/৭৮৪৪)। নিয়ত পরিশুদ্ধ না থাকার কারণে অনেক শহীদ, আলেম এবং দানশীল ব্যক্তিরা জাহান্নামে যাবে। এ প্রসঙ্গে মুসলিম শরিফে বর্ণিত হদিসে এসেছে, ‘কিয়ামতের দিন সব লোকের আগে যার ফয়সালা হবে সে হবে শহীদ। তাকে ডাকা হবে, তবে আল্লাহ তাকে আপন নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন। সে নিয়ামতগুলোকে চিনতে পারবে। আল্লাহ তাকে জিজ্ঞেস করবেনঃ তুমি নিয়ামতগুলোর ব্যবহার কিভাবে করেছো? সে জবাব দেবে, আমি তোমার পথে লড়াই করেছি এবং শহীদ হয়ে গেছি। আল্লাহ বলবেনঃ তুমি মিথ্যা বলেছো। তুমি তো এই জন্য লড়াই করেছো যে, লোকেরা তোমায় বীর বলবে। সেমতে তোমাকে বীর বলা হয়েছে। অতঃপর তার ব্যাপারে নির্দেশ দেয়া হবে তাকে তার অগ্রভাগের চুল ধরে চেনে জাহান্নমে নিক্ষেপ করা হবে। এরপর একটি লোককে নিয়ে আসা হবে, যে নিজে জ্ঞান অর্জন করেছে এবং অপরকেও তা শিখিয়েছে। সে কুরআন অধ্যয়ন করেছে। তাকে উপস্থাপন করা হবে। আল্লাহ স্বীয় নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিবেন এবং সে তা স্মরণ করতে পারবে। আল্লাহ তাকে জিজ্ঞেস করবেনঃ তুমি আমার এসব নিয়ামতের ওপর কিরূপ আমল করেছো? সে বলবেঃ আমি জ্ঞান-অর্জন করেছি এবং অন্যকে তা শিখিয়েছি। আমি তোমার সন্তুষ্টির জন্য কুরআন পড়েছি। আল্লাহ বলবেনঃ তুমি মিথ্যা বলছো। তুমি এজন্যে জ্ঞান অর্জন করেছো যে, লোকেরা তোমায় আলেম বলবে। তুমি এ জন্যে কুরআন শিখেছো যে, লোকেরা তোমায় ক্বারী বলবে। সুতরাং তোমায় ক্বারী বলা হয়েছে। এরপর তার স¤পর্কে এ মর্মে আদেশ করা হবে যে, তার মুখের অগ্রভাগের চুল টেনে তাকে জাহান্নমে নিক্ষেপ করো। এরপর এক ব্যক্তিকে উপস্থাপন করা হবে, যার প্রতি আল্লাহ প্রচুর উদারতা প্রদর্শন করেছেন এবং তাকে সবরকমের মালামাল প্রদান করেছেন। তাকে নিয়ে আসার পর আল্লাহ তাকে আপন নিয়ামত স¤পর্কে অবহিত করবেন। সে তাবত বিষয়ে জানতে পারবে। আল্লাহ তাকে জিজ্ঞেস করবেন, সে এ সবের মধ্যে কোন আমলটি করেছো? সে বলবে, আমি কোন আমলই হাতছাড়া করিনি। তুমি যেখানেই চেয়েছো, সেখানেই খরচ করেছি। আমি তোমার সন্তুষ্টির জন্যেই এসব ব্যয় করেছি। আল্লাহ বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছ, আসলে তুমি এজন্যে ব্যয় করেছো যেন লোকেরা তোমায় দানশীল বলবে। সুতরাং তা-ই বলা হয়েছে। অতঃপর তার স¤পর্কে আদেশ করা হবেঃ তাকে তার অগ্রভাগের চুল ধরে জাহান্নমে নিক্ষেপ করা হোক। অবশেষে তাই করা হবে। মুসলিম, হা/৫০৩২।

শেয়ার করুন

Leave a Comment