মানব জাতির শ্রেষ্ঠ নেয়ামত মহাগ্রন্থ আল-কুরআন

 

ইমদাদুল হক যুবায়ের


আল-কুরআন সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ট আসমানী কিতাব। এটি যুগ জিজ্ঞাসার সঠিক সমাধান দাতা, মানব জাতির হেদায়ত সমেত মহা নেয়ামত; যা সূদীর্ঘ তেইশ বছরে আল্লাহ তা‘আলা জিবরাইল (আ.) এর মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর উপর মানুষের বিভিন্ন প্রয়োজনের প্রেক্ষাপটে অবতীর্ণ করেন। যাতে রয়েছে মানব জীবনের সকল দিক ও বিভাগ সম্পর্কে স্ববিস্তার আলোচনা ও সকল বিষয়ের বিস্তারিত বর্ণনা।
আল্লাহ তা‘আলা আল-কুরআনকে অবতীর্ণ করেছেন মানবজীবনের প্রয়োজনীয় সব বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাকারী হিসেবে। আর এরই মাধ্যমে খুলে দিয়েছেন মানবতার অন্ধ চোখগুলো, বধির কানগুলো এবং আবদ্ধ হৃদয়গুলো। মানবতাকে বের করেছেন অন্ধকারচ্ছন্ন গহ্বর থেকে আলোর দিকে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন- “আমি কুরআনে মানুষের জন্য যাবতীয় দৃষ্টান্ত বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছি, কিন্তু মানুষ অধিকাংশ বিষয়েই বিতর্ককারী”। (সূরা কাহফ, আয়াত : ৫৪)
এ কিতাবের অনন্য বৈশিষ্ট্য ও শ্রেষ্ঠত্ব হচ্ছে এর চিরন্ততা ও বিকৃতিমুক্ত অবস্থা। এটি হলো আল-কুরআনের অলৌকিকত্ব বা মু‘জিযা। এ কিতাব যা অলঙ্কার শাস্ত্রবিদদের তার প্রতিদ্ধন্ধিতা করা থেকে অপারগ করে দিয়েছে, জ্ঞানীদেরকে তার বিরোধিতা করা থেকে অক্ষম করেছে, সাহিত্যিকদেরকে তার অনুরূপ উপস্থাপন করতে বোকা বানিয়েছে। বিশুদ্ধ ভাষাশৈলী, বাক্য বিন্যাস, চিত্রকল্প, উপমামন্ডিত ছন্দ মাধুর্য এ সবকিছুই এর শ্রেষ্ঠত্বের জলন্ত প্রমাণ। অলঙ্কারপূর্ণ ভাষা আল-কুরআনে এত অধিক পরিমাণে ব্যবহার করা হয়েছে যা, সমস্ত আল-কুরআনকে অলঙ্কিত করেছে। এজন্য দিনরাত আল-কুরআন তেলাওয়াত করেও কেউ বিরক্ত, শ্রান্ত বা ক্লান্ত হয় না। সবই নতুন মনে হয়, বার বার শুনতে ও তেলাওয়াত করতে মন চায়। আল-কুরআনের শ্রেষ্ঠত্বের এও একটি বাস্তব প্রমাণ।
আল-কুরআনের ভাষাগত ও সাহিত্যিক মান অত্যন্ত উচ্চাঙ্গের। এর ভাষা যেমন স্বচ্ছ তেমনি এর বাক্য বিন্যাসও অত্যন্ত নিখুঁত ও অভিনব। আল-কুরআনের উঁচুমানের সাহিত্যিক ব্যঞ্জনা, চিত্তাকর্ষক উপমা, উদাহরণ এক কথায় অতুলনীয় শব্দ চয়নের ক্ষেত্রে এটি এক অনুপমগ্রন্থ। চিত্তাকর্ষক শব্দ, অভিনব বাচনভঙ্গি, সুন্দর বাক্য বিন্যাস যা কৃত্রিমতা ও শ্রুতিকটুভাব থেকে মুক্ত। এর বাক্যগুলো অলঙ্কার ও ভাষার সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ; যা দ্যোতিতে ভাস্বর, মাধুর্যে আবৃত। যার বাক্যগুলো আরব অনারব সবার জন্য উম্মুক্ত, সাধারণ ও বিশেষ ব্যক্তি সবার বোধগম্য, এর অর্থগুলো সময়োপযোগী এমন গ্রন্থ পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই।
আল্লাহ তা‘আলার চিরন্তন রীতি অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ (সা.) কে তাঁর স্বজাতির ভাষাতেই আল-কুরআন দান করেছেন। এ কিতাবটির নাম, নাজিলের ভাষা, বিষয়বস্তু সব কিছুই অত্যাশ্চর্য। এটি একটি নির্ভূল, সংশয় ও সন্দেহহীন মহাগ্রন্থ । আল্লাহ তা‘আলা আল-কুরআন নাজিলের প্রারম্ভেই বিশ্ব মানবতার প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন এভাবে- “বল, যদি এই কুরআনের অনুরূপ কুরআন আনয়নের জন্য মানুষ ও জ্বিন সমবেত হয় এবং তারা পরস্পরকে সাহায্য করে তবুও তারা এর অনুরূপ আনয়ন করতে পারবেনা।” (সূরা বনী ইসরাইল, আয়াত : ৮৮) অপর এক আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন-“আল-কুরআন সম্পর্কে যদি তোমাদের কোনো সন্দেহ থাকে যা আমি আমার বান্দার প্রতি অবতীর্ণ করেছি। তাহলে এর মত একটি সূরা রচনা করে নিয়ে এসো। তোমাদের সেসব সাহায্যকারীদেরকেও সঙ্গে নাও এক আল্লাহকে ছাড়া। যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাক।” (সূরা বাকারা, আয়াত: ২৩)
কিন্তু তৎকালীন যুগের বিশ্বসেরা আরব কবিগণসহ আল-কুরআন নাজিল হওয়ার পর হতে আজ অবধি কেউই আল্লাহ তা‘আলার এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে সক্ষম হয়নি। তারা আল-কুরআনের একটি সুরাতো নয়ই বরং একটি আয়াত পর্যন্তও রচনা করতে সক্ষম হয়নি। এটাই হলো আল-কুরআনের সর্বশ্রেষ্ঠ মু‘জিযা; যা কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।
আল-কুরআনের ভাব, ভাষা, বর্ণনাভংগী, প্রাঞ্জলতা, সম্বোধন প্রত্যেকটিই অলৌকিকতায় ভরপুর। আল্লাহ তা‘আলা বলেন – “তবে কি তারা আল-কুরআন সম্বন্ধে গবেষণা করেনা? এটি যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো বাণী হতো তবে নিশ্চয়ই এতে তারা অনেক অসঙ্গতি দেখতে পেতো।” (সূরা নিসা, আয়াত : ৮২) বাস্তব সত্য হলো- অতীতেও কেউ পারেনি, তাই ক্বিয়ামত পর্যন্ত চেষ্টা করেও কেউ এর সমকক্ষ বা কাছাকাছি কিতাব রচনা করতে পারবে না।
আল-কুরআন নাজিলের অন্যতম উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হলো, কুরআনকে তার অলৌকিকতার নিদর্শন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। আল-কুরআনের সকল সূরার প্রতিটি বাক্যবিন্যাস ও শব্দচয়ন অত্যন্ত সুন্দর, সাবলীল সহজ-এক কথায় অতুলনীয়। ফলে, অন্য ভাষার লোকেরাও কুরআন মজিদ পাঠ করে রস আস্বাদন করতে পারে। কুরআন তার অনুপম বর্ণনাভঙ্গি ও আলঙ্কারিকতার জন্য সর্বকালের শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ হিসেবে কিয়ামত পর্যন্ত অক্ষুন্ন থাকবে।
মহাগ্রন্থ আল-কুরআন অবতীর্ণের প্রাক্কালে স্বয়ং কুরআনই এর নির্ভুলতা, অলৌকিকতা ও সম্মোহনী শক্তিতে আরবদেরকে সম্মোহিত করেছিল। তাদের হৃদয়ে সৃষ্টি করেছিল এক বিরাট প্রভাব। যাদের মন ও চোখের উপর গুমরাহি ও ভ্রষ্টতার পর্দা পড়ে গিয়েছিল তাদের হৃদয়েও আল-কুরআনের প্রভাব পড়েছিল। যেমন- হযরত ওমর (রা.) এর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা এবং ওয়ালীদ বিন মুগিরার প্রভাবিত হওয়ার ঘটনা এর জ্বলন্ত প্রামাণ। সবই প্রমাণ করে যে, আল-কুরআনের সম্মোহনী শক্তি অত্যন্ত প্রবল। যা শুধু ঈমানদারকেই নয় বরং কাফিরদেরকেও প্রভাবিত করেছে।
কুরআন নাজিলের সময় মানুষের হৃদয়ে ছিল এর বিশাল প্রভাবের শক্তি। এর প্রতিক্রিয়ায় মানুষ দুদলের একটির অন্তর্ভুক্ত ছিল। একদল: কুরআন তাদের হৃদয়ে প্রভাব বিস্তার করেছে, ফলে তারা এর ধারকের সত্যতা চিনতে পেরেছে এবং কুরআনের বড়ত্ব ও শ্রেষ্টত্ব অনুভব করতে পেরেছে। এতদসত্বেও তারা হঠকারিতা ও কুফরী করেছে। আরেকদল: রাসূলুল্লাহ (সা.) এর বড়ত্ব সম্পর্কে দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করেছে, এবং তাঁরা আল-কুরআনকে বক্ষে ধারণ করে কুরআনিক জীবন গঠন করে তাক্বওয়ার গুণ অর্জন করেছে। যারা হয়েছে দুনিয়া ও আখেরাতে সফল। কারণ, তাঁরা তাদের মনে মরিচিকা সমবেত হতে দেয়নি। হঠকারিতা ও কুফরির পর্দায় ঈমানকে ঢাকতে এবং মুখকে বোবা বানাতে দেয়নি। ফলে তারা সত্যের ডাকে সাড়া দিয়ে, নিজেরাই সত্যের সাক্ষ্য হয়েছে এবং নবিদের দেখানো পথ ধরেছে। এভাবেই তারা সঙ্গি হয়েছে সত্যবাদী, শহীদ এবং ন্যায়পরায়ণদের। তাঁদের এমন অনেক আছেন, যারা শুধুমাত্র রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর অনুপম ব্যক্তিত্ব, আদর্শ ও মাধুর্যে প্রভাবিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। যেমন: রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর স্ত্রী হযরত খাদিজা (রা.), হযরত আবু বকর (রা.), রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চাচাতো ভাই হযরত আলী (রা.), তাঁর মুক্ত করা ক্রীতদাস হযরত যায়িদ (রা.) প্রমুখ।
আল-কুরআন মানুষের হৃদয়ে প্রভাব বিস্তার করার অতুলনীয় ক্ষমতাধর বাণীর নাম। যে ব্যক্তি আরবি হরফের সাথে কোনোভাবেই পরিচিত নয় তার উপরেও কুরআনের তেলাওয়াত প্রভাব বিস্তার করে। যারা রাসূলুল্লাহ (সা.) এর কাছে দূর-দুরান্ত থেকে আসতো। তারা রাসূলুল্লাহ (সা.) এর মুখে আল-কুরআনের বাণী শুনে এর তীব্র ও দুর্ণিবার আকর্ষণে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করতো।
আল-কুরআনের তেলাওয়াত শ্রবণ মানুষের হৃদয়ে প্রভাব সৃষ্টি করে এবং ইসলামের প্রতি আকর্ষণ বাড়িয়ে দেয়, যা ছিল আল-কুরআনের এক বিশেষ অলৌকিক ক্ষমতা। আর এ জন্যই কাফিররা তাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল আল-কুরআনের এই আকর্ষণীয় প্রভাব থেকে লোকদেরকে দূরে রাখার জন্য। তখনকার সময় আরবের নেতৃস্থানীয় লোকেরা ও তাদের অনুসারীদের বলতো, এমনকি তারা নিজেদেরও লক্ষ্য করে বলতো- তোমরা এ কুরআন শ্রবণ করো না এবং আবৃত্তির সময় হট্টগোল সৃষ্টির করো। আল-কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা বর্ণনা করেন এভাবে- “তোমরা কুরআন শুনবে না এবং কুরআন পাঠের সময় চেঁচামেচি শুরু করবে, তাতে মনে হয় তোমরা বিজয়ী হবে।” (সূরা হামীম সিজদাহ, আয়াত: ২৬)
কাফেদের ভয় ছিলো যদি মানুষদেরকে সুষ্ঠুভাবে আল-কুরআনকে শুনতে দেয়া হয় বা আল কুরআন শুনা হয় তবে এর প্রভাব শ্রোতার উপর অবশ্যই পড়বে এবং মানুষ এর অনুসারী হয়ে যাবে। কাজেই সকাল সন্ধ্যায় যাতে কেউ আল-কুরআন শুনেই মোহগ্রস্থ হতে না পারে সেজন্যই শোরগোল করা বাঞ্ছনীয়। অবশ্য তাদেরকেও প্রতিনিয়ত আল-কুরআন আকর্ষণ করছিলো, কিন্তু যাদের ভেতর সামান্য মাত্রায় হলেও আল্লাহ ভীতি ছিলো শুধু তারাই তাদের জাহেলিয়াতের গন্ডি থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিলো। কাফেররা নিজেরাও বুঝতে পেরেছিল যে, আল-কুরআনের মোকাবিলা করতে তারা পক্ষে অক্ষম। তাই তাদের শেষ চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যাওয়ার পর তারা এ দুষ্কর্মের আশ্রয় নিয়েছিল। নিঃসন্দেহে কুরআন এক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছে এবং হয়েছে বিজয়ী ও সবার উপর প্রভাবশালী। এবং এই প্রভাবের ফলে আল-কুরআন মানুষের হৃদয় জয় করার পাশা-পাশি বিশ্ব জয় করতে সক্ষম হয়েছিল।
আলোচনার প্রান্তঠিকায় এসে বলতে পারি যে, মানুষের হৃদয়ে আল-কুরআনের প্রভাব অসীম। আল-কুরআনের ভেতর আল্লাহ তা‘আলা যে সম্মোহনী শক্তি গচ্ছিত রেখেছেন তা নি:সন্দেহে আল-কুরআন শ্রবণকারীর হৃদয়ে বিরাট প্রভাব বিস্তার করে, চাই সেটা হোক আত্মিক প্রভাব বা মনস্তাত্বিক প্রভাব। এই প্রভাবে মুমিন-কাফির উভয়ই প্রভাবিত হয়। যেমন প্রভাবিত হয় জড়পদার্থ, জীব ও উদ্ভীদ প্রাণী। এর প্রভাবের ফলে আল-কুরআনের গ্রহণযোগ্যতা বিশ্বাসীর হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে এবং আল-কুরআনের এ আকর্ষণের ফলে গোটা বিশ্ব তার সামনে লুটিয়ে পড়েছে। কাফেরদের বিরোধিতা সত্বেও কুরআন বিশ্ব জয় করেছে। অক্ষম করে দিয়েছে তাদের বিরোধিতার সব অস্ত্র। হৃদয়ের বন্ধ দুয়ার খুলে দিয়েছে আল্লাহকে চেনার জন্য। বিশ্বকে বোকা, হতবিহবল করে দিয়েছে। ইসলামের চরম শত্রুকে বন্ধুতে পরিণত করেছে।
আল-কুরআন এর ধীরস্থির পঠন, তেলাওয়াতকারীর মস্তিষ্ককোষকে ক্রটিমুক্ত রাখে। সাথে সাথে শ্রোতার মেধার ক্ষমতা ও স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি করে। তাই নি:সন্দেহে বলা যায় আল-কুরআনের এই সম্মেহনী শক্তির প্রভাব অনাদিকাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। তাই আসুন আল কুরআনকে আমাদের হৃদয়ের মনিকুটায় স্থান দেওয়ার পাশাপাশি আল-কুরআনের আলোকে নিজের জীবন ও সমাজকে গড়ার জন্য সচেষ্ট হই। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে তাঁর প্রদত্ত আল-কুরআনের আলোকে জীবন গঠন করার তাওফীক দান করুন। আমীন।

লেখক: এম.ফিল গবেষক।

শেয়ার করুন

2 thoughts on “মানব জাতির শ্রেষ্ঠ নেয়ামত মহাগ্রন্থ আল-কুরআন”

Leave a Comment