আল্লাহর আদালতে অবৈধ সম্পদের কঠিন বিচার

মুফতি আমিন ইকবাল


 

এক.
সম্প্রতি পত্রিকার পাতা খুললেই অবৈধ ক্যাসিনো, ক্লাব, স্পা, মদ, জুয়া, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি আর ভয়াবহ দুর্নীতির খবর চোখে পড়ছে।

স্বার্থান্বেষী কিছু ব্যক্তি এসব অবৈধ ব্যবসা ও দুর্নীতির মাধ্যমে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন। নগদ টাকা আর স্বর্ণের ঝনঝনানিতে ভরে উঠছে তাদের ব্যাংক-ব্যালেন্স ও বাসা-বাড়ি। ফলে খবরের শিরোনাম হচ্ছে—‘টাকা-স্বর্ণ লুকাতে ব্যস্ত প্রভাবশালীরা’, ‘নেতাদের বাসায় টাকার খনি’, ‘হাত দিলেই টাকা আর টাকা’ ইত্যাদি।

সংবাদের ভেতরের ভাষ্য—‘অবৈধ ক্যাসিনো, চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজির টাকায় যেন ভাসছে রাজধানী ঢাকা। প্রভাবশালী নেতাদের বাসা-অফিসে অভিযান চালালেই মিলছে কোটি কোটি নগদ টাকা, বিপুল স্বর্ণ ও শত কোটি টাকারও বেশি এফডিআর।

শুধু বাসা কিংবা অফিসেই নয়, বিপুল টাকা মিলছে নেতাদের বন্ধু-স্বজনদের বাসাতেও। ধরা পড়ার আশঙ্কায় অনেক নেতাই নিজ বাসা-অফিস থেকে টাকা সরিয়ে লুকিয়ে রাখছেন আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের কাছে। তবুও রক্ষা পাচ্ছেন না তারা। যেখানে অভিযান হচ্ছে সেখানেই মিলছে টাকা আর টাকা। নেতারা যেন টাকার খনি!’

কী ভয়াবহ ব্যাপার-স্যাপার! দেশের সাধারণ লোকজন যেখানে ‘নুন আনতে পান্তা ফুরায়’ অবস্থা—সেখানে গুটিকয়েক লোকের কাছে জিম্মি হয়ে থাকছে লাখো-কোটি টাকা! যেন আলাদিনের চেরাগের মালিক তারা!

দুই.
সরকারকে ধন্যবাদ—দেশব্যাপী শুদ্ধি অভিযান পরিচালনার জন্য। দেশে এত এত ক্যাসিনো, স্পার আড়ালে দেহ ব্যবসা, ক্লাবে ক্লাবে মদ-জুয়ার আড্ডা আর লটারির নামে কাঁচা টাকার ঝনঝনানি—এ অভিযান শুরু না হলে হয়তো আরও দীর্ঘ সময় পর্যন্ত দেশের মানুষ এসব বিষয়ে জনতেই পারত না। বুঝতে পারত না—কী ভয়াবহ পরিস্থিতিই না তৈরি হয়েছে মসজিদের শহর ঢাকায়। এত দিন গর্বের সঙ্গে বলতাম—‘ঢাকা হলো মসজিদের শহর’। এখন কেউ যদি দাবি করে—‘ক্যাসিনোর শহর ঢাকা’! তার এই দাবি অস্বীকার করার সুযোগ কই!

ক্যাসিনোতে কী হয় না! জুয়া, বাজি, মদ, নাচ, গান আর অবৈধ নারী ভোগ! এর সবগুলোই সমাজের নৈতিকতা, স্বচ্ছতা ও অর্থনৈতিক ভীত ধ্বংসের জন্য দায়ী। এসবের মাধ্যমে সাধারণ লোকদের একটা ঘোরের মধ্যে রেখে একশ্রেণির মানুষ হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। অবৈধ সেই টাকা এবার বেরিয়ে আসছে র‌্যাব-পুলিশের বিশেষ অভিযানে।

তিন.
ইসলামে জুয়া খেলা, লটারি করা ও বাজি ধরা সম্পূর্ণ হারাম। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‍‍‍‘হে ঈমানদারগণ! মদ, জুয়া, প্রতিমা ও লটারি এসবই শয়তানের কাজ। তোমরা এগুলো থেকে বিরত থাক। আশা করা যায়, তোমরা সফল হতে পারবে। নিশ্চয়ই শয়তান মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে চায় এবং আল্লাহর জিকির ও নামাজ থেকে তোমাদের মধ্যে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে থাকে। তাই তোমরা এসব জিনিস থেকে বিরত থাকবে কি?’ (সুরা মায়েদা : ৯০-৯১)।

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, ‘তারা আপনাকে (নবী) মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। আপনি বলে দিন, উভয়ের মধ্যেই রয়েছে মহাপাপ।’ (সুরা বাকারা : ২১৯)।

অথচ আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের গড়া ক্যাসিনো ও ক্লাবে অবৈধ এসব কাজই চলছে দেদারছে। সরকারকে আবারও ধন্যবাদ ক্ষমতাসীন দলের সহযোগী সংগঠনের লোক বলে এড়িয়ে না গিয়ে—অব্যাহত অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করছে প্রভাবশালী নেতাদেরও! এ অভিযান নিঃসন্দেহে সমাজের মানুষকে সচেতন করবে। অনৈতিক, অবৈধ ও অশ্লীল কাজ থেকে কিছু মানুষকে হলেও বিরত রাখবে।

চার.
টাকা-পয়সা, ধন-সম্পদ আল্লাহর দান। তবে যার সম্পদ বেশি, পরকালে তার হিসাব হবে তত বেশি। দুনিয়াতে যেমন দুদকের কাছে আয়ের উৎসের হিসাব দিতে হয়, তেমনি পরকালে আল্লাহর আদালতে ব্যক্তির সমুদয় সম্পদের হিসাব দিতে হবে। হাশরের মাঠে আল্লাহ তায়ালা প্রতিটি বান্দাকে পাঁচটি প্রশ্ন করবেন।

হজরত মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘সেই দিন পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে কোনো আদম সন্তান তার পা এক কদমও নাড়াতে পারবে না; ১. তুমি তোমার সারা জীবন কোন পথে কাটিয়েছ? ২. যৌবনকালে কোন আমল করেছ? ৩. ধন-সম্পদ কোন পথে উপার্জন করেছ? ৪. কোন পথে ধন সম্পদ ব্যয় করেছ? ৫. দীন ইসলাম সম্পর্কে যতটুকু জেনেছ, সে অনুযায়ী কতটুকু আমল করেছ।’ (তিরমিজি : ৪/৫৬৯)

নবীজি (সা.) অবৈধ হারাম উপার্জনকে কেয়ামতের আলামত আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমার উম্মতের মধ্যে এমন এক সময় আসবে যখন সম্পদ কামাই করার ব্যাপারে হালাল-হারামের বিবেচনা করা হবে না।’ (বুখারি : ২০৮৩)। তিনি আরও বলেন, ‘নিশ্চয় কেয়ামতের আলামতের অন্যতম হচ্ছে সুদের প্রসার লাভ করবে।’ (আত-তারগিব ওয়াব তারহিব : ২৪)

পাঁচ.
দুনিয়াতে যারা বৈধ পথে সম্পদ উপার্জন করে—পরকালে তাদের হিসাব হবে সহজ। অবশ্য বৈধ পথে সম্পদ উপার্জন করেও যারা সম্পদের হক আদায় করে না তথা জাকাত দেয় না, তাদেরও শাস্তি হবে ভয়াবহ। পরকালে এই সম্পদই
বিষধর সাপ হয়ে তাদের দংশন করবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর যারা কার্পণ্য করে (আল্লাহ ও বান্দার হক নিয়ে) ওই জিনিসের মধ্যে, যা আল্লাহ তাদেরকে আপন করুণা থেকে (ধন সম্পদ বা জ্ঞানাকারে) দান করেছেন তারা কখনও যেন ওই কৃপণতাকে নিজেদের জন্য মঙ্গলজনক মনে না করে বরং সেটা তাদের জন্য অকল্যাণকর। তারা যেসব সম্পদের মধ্যে কার্পণ্য করেছিল অচিরেই কেয়ামতের দিন সেগুলো তাদের গলায় শৃঙ্খল হবে এবং আল্লাহ তায়ালাই নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের স্বত্ত্বাধিকার। আর আল্লাহ আমাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে অবগত।’ (সুরা আলে ইমরান : আয়াত ১৮০)

নবীজির হাদিসে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন, আল্লাহ তায়ালা যাকে ধন-সম্পদ দান করেছেন, কিন্তু সে তার জাকাত আদায় করেনি; কেয়ামত দিন তার সম্পদকে এমন এক বিষধর সাপে রূপান্তর করা হবে, যা অত্যধিক বিষাক্ত হওয়ার কারণে তার মাথার পশম থাকবে না এবং চোখের ওপর দুটি কালো তিলক থাকবে। কেয়ামতের দিন ওই সাপ তার গলায় হারের ন্যায় পরিয়ে দেওয়া হবে। সাপটি তার মুখের উভয় চোয়ালে কামড় দিয়ে ধরবে এবং বলবে ‘আমিই তোমার ধন-সম্পদ’ ‘আমিই তোমার সঞ্চিত ধন ভান্ডার।’ (বুখারি : ১৪০৩; মুসনাদে আহমদ : ৮৬৬১)

ছয়.
আর সম্পদশালীদের মধ্যে যারা জাকাত প্রদান করবে, গরিব মানুষের মাঝে দান সদকার করবে, তাদের বিষয়ে আল্লাহ বলেন, ‘যারা তাদের সম্পদ দিন-রাত প্রকাশ্যে, গোপনে আল্লাহর পথে খরচ করে তাদের পুরস্কার তাদের প্রতিপালকের কাছে রাখা আছে। তাদের কোনো ভয় নেই, তারা কোনো আফসোস করবে না।’ (সুরা বাকারা : আয়াত ২৭৪)

এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা সেসব মানুষদের কথা বলেছেন, যারা সবসময় দান করেন। দিনের বেলা রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় কোনো অভাবীকে দেখলে দান করেন। কেউ তাকে অভাবী মানুষের দুর্দশার কথা শোনালে তিনি দান করার জন্য ছুটে যান। কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারিতে দুস্থ মানুষদের দান করার সুযোগ পেলে তিনি কখনও ছেড়ে দেন না। আত্মীয়রা চাওয়ার আগেই তিনি তাদের অবস্থা সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে তাদেরকে সাহায্য করেন। মসজিদে কারও চেহারা দেখে সে কষ্টে আছে মনে হলে, তিনি তার কষ্ট কমাতে এগিয়ে যান। এই ধরনের নিবেদিতপ্রাণ মানুষরা দিনে, রাতে, প্রকাশ্যে, গোপনে যখন যেভাবে পারেন দান করতে থাকেন। এদের সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলছেন— এদের পুরস্কার বিশেষভাবে তার কাছেই জমা আছে। এরা কেয়ামতের দিন যখন তার কাছে আসবেন, সেদিন তাদের কোনো ভয়, কোনো আফসোস বা দুঃখ থাকবে না। আল্লাহ তায়ালা এদেরকে বিরাট পুরস্কার দেবেন। এমন পুরস্কার, যা তিনি তায়ালা নিজের কাছে রেখেছেন।

অতএব, বাসা কিংবা ব্যাংকে টাকা-পয়সার খনি না বানিয়ে, সম্পদের পাহাড় গড়ে না তুলে—আল্লাহর বিধান অনুযায়ী সম্পদের একটা অংশ গরিব মানুষদের মাঝে বিলিয়ে দেওয়া চাই। অন্তত জাকাত (সম্পদের চল্লিশভাগের এক ভাগ) অবশ্যই দিতে হবে। যথাসাধ্য গরিব-অসহায়ের পাশে থেকে মানবতারও পরিচয় দিতে হবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে ইসলামের শ্বাসত বিধান বোঝার এবং মানার তাওফিক দান করুন।

লেখক : বিভাগীয় প্রধান, ইসলাম,
দৈনিক সময়ের আলো
সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ ইসলামী লেখক ফোরাম

শেয়ার করুন

Leave a Comment