প্রতারণায় কঠোর হুশিয়ারি

শাহ মাহমুদ হাসান

প্রতারণা এখন একটি জাতীয় সমাস্যায় পরিণতি হয়েছে। এমন কোন ক্ষেত্র নেই যেখানে প্রতারণা হচ্ছেনা। নানাভাবে প্রতারণা করা হয়ে থাকে যেমন কথাবার্তা, কাজকর্ম, লেনদেন, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিদেশ গমন, মানব পাচার করা, দ্রব্যে ভেজাল মেশানো, পণ্যদ্রব্যের দোষ গোপন করা, মাছ ও সবজিতে ফরমালিন মেশানো, জাল টাকা চালিয়ে দেয়া, ওজনে কম দেয়া, মিথ্যা বলা, আমানতের খেয়ানত করা, মানুষকে ঠকানো, মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া প্রভৃতি।
এছারাও মোবইলে জিনের বাদশাহ সেজে টাকা পয়শা হাতিয়ে নেয়া, বিকাশ একাউন্ট ব্যবহার করে টাকা আত্মসাৎ করা, টাকার বিনিময় সার্টিফিকেট তৈরী করা ও প্রশ্নপত্র ফাস করার মত আরো অনেক নতুন-নতুন প্রতারনা শুরু হয়েছে।
আবার কিছু কিছু ডাক্তার অভিনব কায়দায় প্রতারণা করে ধরা পরছে। ডাক্তার না হয়েও ভুয়া সার্টিফিকেট জোগার করে ক্লিনিক ব্যবসা শুরু করেছে কেউ কেউ।
ধোঁকা ও প্রতারণা একটি জঘন্য বিষয়। ইসলামে কোনো ধোঁকা ও প্রতারণার স্থান নেই। ইসলাম প্রতারণা ও প্রবঞ্চনাকে কখনোই প্রশ্রয় দেয়নি। ইসলামের দৃষ্টিতে প্রতারণা হারাম। এটা মস্তবড় গুনাহর কাজও বটে। প্রতারণাকারীর জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে কঠিন শাস্তির ঘোষণা রয়েছে ইসলামে।
প্রতারণা করা মোমিনের কাজ নয়। কোনো মুসলমান প্রতারণা করতে পারে না। প্রতারণা মুনাফেকদের বৈশিষ্ট্য। “অবশ্যই মুনাফেকরা প্রতারণা করছে আল্লাহর সাথে, অথচ তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতারিত করে।” (সূরা নিসা : ১৪২)।
আল্লাহ তাআলা প্রতারণার জন্য কঠিন শাস্তির কথা বলেছেন। “ধ্বংস তাদের জন্য, যারা মাপে কম দেয়। যারা মানুষের থেকে মেপে নেয়ার কালে পূর্ণ মাত্রায় গ্রহণ করে। আর যখন তাদের জন্য মাপে বা ওজন করে, তখন কম দেয়। (সূরা মুতাফফিফিন : ১-৩)।
আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন, “তোমরা অন্যায়ভাবে একে অপরের সম্পদ ভোগ করো না। এবং জনগণের সম্পদের কিয়দংশ জেনে-শুনে পাপ পণ্থায় আত্মসাৎ করার উদ্দেশে শাসন কতৃপক্ষের হাতেও তুলে দিও না।” ( সূরা বাকারা : ১৮৮)।
একবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাবারের এক স্তুপের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। তিনি খাবারের স্তুপে হাত প্রবেশ করালেন, তার আঙুলগুলো ভিজে গেল। তিনি বললেন, “হে খাবারওয়ালা, এটা কি? সে বলল, হে আল্লাহর রাসূল, তাতে বৃষ্টির পানি পড়েছিল। তিনি বললেন, তুমি কি তা খাবারের উপরে রাখতে পারলে না, যাতে মানুষ তা দেখে? যে প্রতারণা করে, সে আমার দলভুক্ত নয়।” (মুসলিম : ২৯৫)।
ঈমানের অনুপস্থিতি, দুর্বলতাই প্রতারণার প্রধানতম কারণ। আল্লাহকে হাজির না ভাবার কারণে মানুষ প্রতিনিয়ত প্রতারণা ও জালিয়াতীর আশ্রয় নিচ্ছে।
ইসলাম শুধু অপরাধ ও শাস্তি বর্ণনা করেই ক্ষান্ত হয়নি; বরং প্রত্যেক অপরাধ ও শাস্তির সাথে আল্লাহভীতি ও পরকালের চেতনা সৃষ্টি করে মানুষের ধ্যানধারণাকে এমন এক জগতের দিকে ঘুরিয়ে দেয়, যার কল্পনা মানুষকে যাবতীয় অপরাধ ও গোনাহ থেকে পবিত্র করে দেয়। জনমনে আল্লাহ তায়ালা ও পরকালের ভয় সৃষ্টি করা ছাড়া পৃথিবীর কোনো আইন, পুলিশ, সেনাবাহিনী ও দুর্নিতি দমন কমিশন অপরাধ দমনের নিশ্চয়তা দিতে পারে না।
রাসূল (সা.) এমন একটি সমাজ বিনির্মানে সক্ষম হয়েছিলেন যার সদস্যদের অন্তরে ছিল পূর্ণমাত্রায় আল্লাহ তায়ালা ও পরকালের ভয়। যার একটি উজ্জল দৃষ্টান্ত নিম্নোক্ত ঘটনা। হযরত ওমর (রা.) রাতে ঘুরে বেরাতেন এবং প্রজাদের খোজ খবর নিতেন। রাতের শেষ প্রহরে মরুভুমির মাঝে একটি ঝুপরির মাঝে আলো দেখে কৌতুহল নিয়ে এগিয়ে গেলেন। শুনতে পেলেন মা-মেয়ের কথোপকোথন। মা তার মেয়েকে দুধে পানি মেশাতে বলছে আর মেয় তাতে আপত্তি করছে। মা তার কন্যার আপত্তির কারণ জানতে চাইলেন। কন্যা বলছে, তুমি জাননা, দুধে পানি মেশানো যে আমিরুল মুমিনীনের নিষেধ? মা বলছে আরে বেটি, ওমর কি এখন পানি মেশালে টের পাবে? এখনতো সে আরাম করে ঘুমাচ্ছে। মেয়ে বলছে মা, ওমর হয়ত ঘুমিয়ে আছেন, তার চোখ এড়ান যাবে, তার গোয়ান্দা বাহিনীর চোখ ফাকি দেয়া যাবে, কিন্তু ওমরের রব আসমান জমিনের রবের চোখকে কি করে তুমি ফাকি দিবে? হযরত ওমর (রা.) গোয়ালিনীর মেয়ের ত্বাকওয়া দেখে অভিভূত হলেন এবং পরবর্তিতে এই ময়েটিকে তার পুত্রবধু হিসেবে নির্বাচন করেন।
প্রতারণার পরিণতি সম্পর্কে ইবনে হাজার হায়সামী বলেন, “প্রতারণার ফলে আল্লাহ তাদের উপর যালিমদেরকে চাপিয়ে দেন, ফলে তারা তাদের ধন-সম্পদের ছিনতাইকারীতে পরিণত হয়। তাদের সম্মান হানী করে। এমনকি কখনো কখনো তাদের উপর কাফিরদেরকে চাপিয়ে দেন, তারা তাদেরকে বন্দী করে ফেলে, তাদেরকে দাসে পরিণত করে এবং তাদেরকে আক্রান্ত করে সর্বাত্মক শাস্তি ও সীমাহীন লাঞ্ছনা।”
প্রতারণা করে দুনিয়ায় পার পাওয়া গেলেও পরকালীন শাস্তি থেকে রেহাই পাওয়ার কোন সুযোগ থাকবেনা। প্রতারণার ব্যপারে রাসূল (সা.) এর হুশিয়ারি হল, “ধোঁকাবাজ ও প্রতারণাকারী জাহান্নামে যাবে।” (শুআবুল ঈমান: ৬৯৭৮)।

 

শেয়ার করুন

Leave a Comment