উন্নত জীবনের আদর্শ

শাহ মাহমুদ হাসান


মহানবী হযরত মুহম্মাদ (সা.) ছিলেন সকল শ্রেণী পেশার মানুষের জন্য আদর্শ। তিনি ছিলেন শিশুর আদর্শ, যুবকের আদর্শ, সৈনিকের আদর্শ, সেনাপতির আদর্শ, স্বামীর আদর্শ, পিতার আদর্শ, নানার আদর্শ, ব্যবসায়ীর আদর্শ, শিক্ষকের আদর্শ এবং রাষ্ট্রনায়কেরও আদর্শ। পৃথিবীর অন্যকোন মহামনবের ভিতরে এমন অপুর্ব দৃষ্টান্ত পাওয়া যাবে না যার সমাহার ও সংমিশ্রণ কেবল এই মহামানবের জীনাদর্শেই বিদ্যমান। তার অনুসরণ-অনুকরণ করার মধ্যে মানব জীবনের ঐকান্তিক সফলতা নিহিত। রাসুল (সা.) পৃথিবীতে আগমন করেছেন সচ্চরিত্রের বিকাশ সাধনের লক্ষ্যে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আমাকে সচ্চরিত্রের পূর্ণতা সাধনের নিমিত্তই প্রেরণ করা হয়েছে।’ (জামেউল আহাদীস : ৬৭২৯)।
পবিত্র কুরআনে মহানবীর চরিত্রকে মানব জাতির জন্য আদর্শ হিসেবে আখ্যয়িত করা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর আদর্শ তোমাদের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ।’ (সূরা আহযাব : ২১)।
রাসূলে করিম (সা.) কে সৃষ্টি করা হয়েছে সবার জন্য অনুসরণীয় ও মুক্তির কান্ডারী হিসেবে। আল্লাহর ভালবাসা প্রপ্তিও মহানবীর পরিপূর্ণ আনুগত্য ও অনুসরণের উপর নির্ভরশীল। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেছেন, ‘হে রাসুল! তুমি লোকদের বলে দাও, যদি তোমরা আল্লাহ তায়ালাকে ভালবাস তাহলে আমার অনুসরণ করো। তবে আল্লাহও তোমাদের ভালবাসবেন।’ (সূরা ইমরান : ৩১)।
রাসূল (সা.) ছিলেন সৃষ্টির সেরা মানুষ। নিরপেক্ষ ঐতিহাশিকরাও অকপটে স্বীকার করেছেন যে, মুহাম্মাদ (সা.) সর্ব যুগের সর্ব শ্রেষ্ঠ মহামানব। উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.) কে রাসুলের চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, কুরআন মাজিদই হলো রাসূল (সা.)-এর চরিত্র। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রে অধিষ্ঠিত। (সূরা কলাম : ৪)। তার চরিত্র কত মহান তা পরিমাপ করার মত কোন যন্ত্র পৃথিবীতে আবিস্কৃত হয় নাই।
ক্ষমতা ও সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি শত্রুকে ক্ষমা করে দিতেন। মক্কা বিজয়ের দিনে রাসূল (সা.) মক্কার লোকদের উদ্দেশ্যে ঐতিহাশিক বক্তৃতায় বলেছিলেন,
‘হে কুরাইশগণ ! তোমরা আমার কাছ থেকে আজ কেমন ব্যবহার আশা কর? তারা বলল, সম্মানিত ভাই ও ভ্রাতুষ্পুত্রের মত! তিনি বললেন, তোমরা চলে যাও! আজ তোমরা মুক্ত!’ যারা একসময় তাকে অনেক অত্যাচার-নির্যাতন, সামাজিকভাবে বয়কট করা এমনকি হত্যার চেষ্টা পর্যন্ত করেছিল অথচ তিনি তাদের সবাইকে ক্ষমা করে দিলেন!
সহনশীলতা তার চরিত্রকে নিয়ে গিয়েছিল এক অনন্য উচ্চতায়। রাসূল (সা.) একবার সাহাবীদের সাথে মসজিদে বসা ছিলেন। এমন সময় একজন বেদুঈন এসে সেখানে পেশাব করা শুরু করলে সাহাবীরা তাকে ধমক দিয়ে থামতে বললেন। রাসূল (সা.) বললেন, ‘তাকে ছেড়ে দাও; বাধার সৃষ্টি করো না’ তারপর তিনি লোকটিকে ডেকে বললেন, ‘এটা মসজিদ; এস্থান অপবিত্রতা কিংবা পেশাব পায়খানার জন্য উপযুক্ত নয়।’ অতঃপর রাসূল (সা.) কওমের একজন লোককে বললেন, তুমি পানি ভর্তি একটা বালতি নিয়ে আসো। এরপর এর উপর ঢেলে দাও। তিনি বালতিতে পানি এনে তার উপর ঢেলে দিলেন। (মুসনাদে আহমাদ : ১২৯৮৪)। বিভিন্ন শারীরিক সমাস্যা হতে পারে এই চিন্তা থেকে রাসূল (সা.) লেকটিকে পেশাবের মাঝে বাঁধা দিতে নিষেধ করলেন; বরং মসজিদে পেশাব করাটাকেই সাময়িক ভাবে অনুমোদন করলেন। যারা উগ্র মানসিকতা সম্পন্ন তাদের জন্য এটি একটি শিক্ষণীয় ঘটনা। ভিন্নমতালম্বী মানুষের সাথে ইসলাম কি ব্যবহার করতে বলেছে তার একটি উজ্জল দৃষ্টান্ত এখানে বিদ্যমান।
সৃষ্টিকূলের মধ্যে রাসূল (সা.)-এর মত দানবীর আর কাউকে পাওয়া যাবেনা। কেউ তার কাছে কিছু চেয়েছে অথচ, তিনি তা দেননি এমন ঘটনা কখনো ঘটেনি। একবার তার কাছে একজন লোক আসল সাহায্য প্রর্থী হয়ে, তিনি তাকে দুই পাহাড়ের মাঝের সকল বক্রি দিয়ে দিলেন। অত:পর লোকটি নিজের সম্প্রদারয় কাছে গিয়ে বলল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা ইসলাম গ্রহণ কর। কেননা, মুহাম্মদ (সা.) এত বেশী পরিমাণে দান করেন যে, তিনি নি:স্ব হয়ে যাওয়ার কোন ভয় করেন না।’ (মুসলিম : ২৩১২)।
সৃষ্টির সেরা হয়েও তিনি বিলাশিতামুক্ত অত্যন্ত সাদা-মাটা ও অনাড়ম্বর জীবন-যাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। রাসূল (সা.) গাছের লতা-পাতা দিয়ে তৈরি করা বিছানায় ঘুমাতেন। এতে তার শরীর মুবারকে দাগ হয়ে যেত। সাহাবাগণ যখন ভাল কোন বিছানার ব্যবস্থা করার আবদার জানালে তার প্রতিউত্তরে তিন বলতেন, ‘আমার দুনিয়ার প্রতি কোন আকর্ষণ নেই। আমি দুনিয়াতে একজন পথচারী ছাড়া আর কিছুই নই। যে পথচারী একটা গাছের ছায়ায় আশ্রয় নিয়ে একটু পরে সেটা ছেড়ে চলে যায়।’ (তিরমীজি : ২৩৭৭)।
জীবনের সফলতা ও জান্নাত পেতে হলে তার আদর্শের পূর্ণ অনুসারী হতে হবে। ইরশাদ হচ্ছে, ‘যে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করল সে মহা সফলতা লাভ করল।’ (সূরা আহযাব : ৭১)। ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলের আনুগত্য করবে আল্লাহ তাকে এমন জান্নাতসমূহে প্রবেশ করাবেন যার তলদেশ দিয়ে নহরসমূহ প্রবাহমান। আর সেটিই প্রকৃত সফলতা।’ (সূরা নিসা : ১)। আবার তার আদর্শের অনুসারী না হলেও রয়েছে কঠোর শাস্তির হুশিয়ারী, ‘আর যে আল্লাহ এবং তার রাসুলের নাফরমানী করবে অবশ্যই তার শাস্তি হলো জাহান্নাম, সে সেখানে চিরকাল থাকবে।’ (সূরা জিন : ২৩)।

 

শেয়ার করুন

Leave a Comment