তারাবির বিধান

শাহ মাহমুদ হাসান


 

তারাবি অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ নামাজ যার দ্বারা বান্দার জীবনের গুনাহ ক্ষমা করা হয়। নবী কারীম (সা.) তারাবির প্রতি উৎসাহিত করে বলতেন ‘যে রমযানের রাতে ঈমানের সঙ্গে নেকির আশায় দন্ডায়মান হয় তার পূর্ববর্তী সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হয়।’ (মুসলিম : ১৮১৬)।
রাসূল (সা.) এর যুগে আনুষ্ঠানিকভাবে তারাবির ব্যাবস্থা ছিল না। উম্মতের প্রতি অতিশয় করুণা ও দয়াশীলতার কারণেই তিনি তারাবির নামাজ নিয়মিত জামাতে আদায় করেন নি। কারণ তা ফরজ হয়ে গেলে দুর্বল উম্মতের জন্য নিয়মিত তারাবি আদায় করা কষ্টসাধ্য হবে। এ ব্যাপারে হাদীসে এসেছে, নবী কারীম (সা.) রমযানের এক রাতে মসজিদে তারাবি পড়লেন। সাহাবীগণও তার সঙ্গে জামাতে শামিল হলেন। দ্বিতীয় রাতে মুকতাদীর সংখ্যা আরো বেড়ে গেল। এরপর তৃতীয় বা চতুর্থ রাতে নবী কারীম (সা.) তারাবির জন্য মসজিদে আসলেন না। ফজরের পর সবাইকে লক্ষ করে বললেন, আমি তোমাদের আগ্রহ ও উপস্থিতি লক্ষ করেছি, কিন্তু এ নামাজ তোমাদের উপর ফরয হয়ে যাবার আশঙ্কায় আমি তোমাদের নিকট আসিনি। (মুসলিম : ১৮১৯)।
২০ রাকাত তারাবির দলিল:
২০ রাকাত তারাবির নামাজের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছিল হযরত উমর (রা.) এর খেলাফতের সময় থেকে। এবং এর উপর খোলাফয়ে রাশেদীন, সাহাবাগণ, তাবেইন, তাবে তাবেইন, সালফে সালেহীন সকলেই ঐক্যমতে আমল করেছেন। এবং চার মাজহাবের ইমাম গনও এ ব্যাপারে ঐক্যমত পোষন করেছেন।
হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন যে ‘নাবী কারীম (সা.) রমযান মাসে ২০ রাকাত তারাবি নামাজ আদায় করতেন এবং এরপর ৩ রাকাত বেতরের নামাজও আদায় করতেন।’ (মোসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা : ৭৬৯২)।
হযরত সাঈব ইবনে ইয়াযীদ (রা.) বলেন, ‘খলীফা হযরত উমর (রা.) এর শাসনামলে রমযান মাসে মুসলমানগণ ২০ রাকাত তারাবি নামাজ পড়তেন।’ (বাইহাকী : ৪৬১৭) ইমাম নববী (রহ:) এই হাদীসকে সহীহ বলে আখ্যায়িত করেছেন। (আল খুলাসাতুল আহকাম : ১৯৬১)।
৮ রাকাত তারাবি প্রসঙ্গ:
তারাবির নামাজ ৮ রাকাত বলে যারা দাবী করে, তারা দলিল হিসাবে হযরত আয়শা সিদ্দীকা )রা.) থেকে বর্ণীত একটি হাদীস পেশ করে থাকে। হযরত আয়শা সিদ্দীকা )রা.) বলেন, নাবী কারীম (সা.) রমজান মাসে ও রমজান মাস ব্যতীত অন্য মাসে এগার রাকায়াতের অধিক নামাজ পড়তেন না। (বুখরী : ১১৪৭)।
কয়েকটি কারণে উপরোক্ত হাদীস দ্বারা কখনোই তারাবির নামাজ ৮ রাকাত প্রমাণিত হয়না। কারণ উপরোক্ত হাদীস এ ‘রমজান মাসে’ এর সাথে সাথে ‘রমজান মাস ব্যতীত অন্য মাসে’ একথাও উল্লেখ আছে। অর্থাৎ বলা হয়েছে যে, তিনি অন্য মাসে যেরূপ এগার রাকাত নামাজ পড়তেন তদ্রূপ রমজান মাসেও এ্ই এগার রাকাত নামাজ পড়তেন। এখন প্রশ্ন হলো, রমজান মাসে না হয় তারাবি নামাজ পড়েছেন কিন্তু রমজান ব্যতীত অন্য মাসে তারাবির নামাজ পড়লেন কিভাবে?
মূলতঃ এ হাদিসের মাঝে তারাবি নামাযের কোন কথা বলা হয়নি বরং বলা হয়েছে তাহাজ্জুদ নামাযের কথা। কেননা, তিনি সারা বছরই তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করতেন।
এ প্রসংগে প্রখ্যাত মুহাদ্দিস, শামসুদ্দীন কিরমানী (রাহ.) কাওকাবুদ দুরারী শরহে বুখারী গ্রন্থে বলেন, ‘হযরত আয়শা সিদ্দীকা (রা.) এর হাদীস দ্বারা তাহাজ্জুদ নামাজকে বুঝানো হয়েছে।’
উক্ত হাদীসের ব্যাখ্যায় হযরত শাহ আব্দুল হক মুহাদ্দিস দেহলভী (রাহ.) বলেন, ‘সহীহ মত এটাই যে, রাসূল (সা.) বিতরসহ যে এগার রাকাত নামাজ পড়েছেন, তা ছিল তাহাজ্জুদের নামাজ’ একারনেই ইমাম বুখারী সহ অন্যান্য হাদীস গ্রন্থাকারগনও এই হাদীসকে তাহাজ্জুদের অধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন, তারাবির অধ্যায়ে উল্লেখ করেননি। তাই তাহাজ্জুদের হাদীস দিয়ে তারাবির রাকাআত-সংখ্যা প্রমাণ করা গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ তারাবি ও তাহাজ্জুদ একই জাতীয় নামাজ নয়।
তারাবিতে সাহাবাদের অংশগ্রহণ:
২০ রাকাত তারাবিতে সাহাবায় কেরামের ছিল স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। এ ব্যাপারে রয়েছে অসংখ্য হাদীস। ইয়াযীদ ইবনে রুমান বলেছেন, ‘খলীফা হযরত উমর (রা.) এর শাসনামলে মুসলমানবৃন্দ রমযান মাসের প্রতি রাতে ২০ রাকাত তারাবি ও ৩ রাকাত বিতর নামাজ পড়তেন।’ (মুয়াত্তা মালেক : ৩৮০)। হযরত আবদুল আযীয বিন রাফি বলেন, ‘হযরত উবাই ইবনে কাআব (রা.) মদীনায় রমযান মাসে ২০ রাকাত তারাবি নামাযের জামাতে ইমামতি করতেন।’ (মোসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা :৭৭৬৬)। ইবনে তাইমিয়াহ (রাহ.) এ সম্পর্কে বলেন, ‘হযরত উবাই ইবনে কাব (রা.) রমযান মাসে সাহাবায় কেরামদের জামাতে ২০ রাকাত তারাবি ও ৩ রাকাত বেতরের নামাযে ইমামতি করতেন। (মজমুয়ায়ে ফাতাওয়া : ১৯১)।
সুতরাং ২০ রাকাত সুন্নাত না হলে হযরত উবাই ইবনে কাআব (রা.) এই ২০ রাকাতের ইমামতি করার সময় ওখানে উপস্থিত সাহাবীবৃন্দ অবশ্যই এর বিরোধিতা করতেন। যদি ২০ রাকাত তারাবির নামাজ বিদআত ও নাজায়েয হতো, তাহলে হযরত আয়শা (রা.) হুজরার নিকটবর্তী মসজিদে নববীতে ২০ রাকাত তারাবির আয়োজন দেখে তিনি নিশ্চুপ থাকতেন না। কারণ আয়শা সিদ্দিকা (রা.) নিজেই রাসূল (সা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, যে ব্যক্তি দ্বীনের মাঝে দ্বীন হিসেবে নতুন বিষয় উদ্ভাবন করবে তার সে বিষয় পরিত্যাজ্য। তাছাড়া তিনি তার ৪২ বছরের জীবদ্দশায় কোন দিন ৮ রাকাত তাহাজ্জুদের হাদীসকে ২০ রাকাত তারাবিহের বিরুদ্ধে দলিল হিসেবেও উপস্থাপন করেননি।
হযরত ওমর (রা.), হযরত উসমান (রা.) ও হযরত আলী (রা.) এর শাসনামলে ২০ রাকাত তারাবিই পড়া হতো। সাহাবায় কেরাম থেকে দ্বীনের দরদ ও সহীহ বুঝ কারো বোশি থাকার কথা নয়। তাদের নিরবচ্ছিন্ন আমল ও ইজমার আলোকেই সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে ২০ রাকাত তারাবির নামাজ। এ আমলই পুরো পৃথিবীতে এখনো চালু রয়েছে। আজো বায়তুল্লাহ ও মসজিদে নববীতে বিশ রাকাত তারবীই অনুষ্ঠিত হচ্ছে। অতএব সাহাবায় কেরামের আমলের বিরধীতা করে রমজানুল মুবারকের বরকত থেকে নিজেরা বঞ্চিত থাকা এবং অন্যদের বঞ্চিত রাখা কোন বিবেকবান মুসলমানদের লক্ষ্য হতে পারে না।

শেয়ার করুন

Leave a Comment