জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

শাহ মাহমুদ হাসান


দুনিয়ার অর্থ-সম্পদ, বাড়ি-গাড়ি, মান-সম্মান ও প্রভাব-প্রতিপত্তির মাঝে জীবনের সফলতা নিহিত নয়। পরকালীন জীবনের মুক্তির মাঝে নিহিত জীবনের আসল সফলতা। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘প্রত্যেক প্রাণীকে আস্বাদন করতে হবে মৃত্যু। আর তোমরা কিয়ামতের দিন পরিপূর্ণ বদলা প্রাপ্ত হবে। তারপর যাকে দোযখ থেকে মুক্তি দেয়া হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, তার কার্যসিদ্ধি ঘটবে। আর পার্থিব জীবন ধোঁকা ছাড়া অন্য কিছুই নয়।’ (সূরা ইমরান : ১৮৫)।
এজন্য একজন মোমিনের জীবনের আসল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর ইবাদত করে জান্নাতের চীরস্থায়ী বাসিন্দা হওয়া। তার নাফারমানি থেকে বেচে থাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তির আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। মানব জীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে কুরআনের বানী, ‘আমি জ্বিন ও মানুষকে আমার ইবাদত করা ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করিনি।’ (সূরা যারিয়াত : ৫৬)।
মানুষের লক্ষ্যে পৌছার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী হল শয়তান। শায়তান মানুষকে সর্বদা বিপথগামী করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। শয়তানের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। সে তো তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। সে তো তোমাদের নির্দেশ দেয় মন্দ ও অশ্লীল কাজ (ব্যভিচার, অবাধ মেলামেশা, মদ্যপান, হত্যা ইত্যাদি) করতে।’ (সূরা বাক্বারাহ : ১৬৮-১৬৯)।
শয়তানের অন্যতম অস্ত্র হল মাদকতা, অশ্লীলতা ও যৌনতা; যা মানুষের মাঝে বিভিন্ন উপলক্ষে ছড়িয়ে দেয়ার পায়তারা করে। তাই শয়তানের আনুগত্য না করার ব্যাপারেও মানুষকে সতর্ক করা হয়েছে। ‘শয়তানের ইবাদত করো না, সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু?’ (সূরা ইয়াছিন : ৬০)। ‘হে মুমিনগণ, এই যে মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্য-নির্ধারক শরসমূহ এসব শয়তানের অপবিত্র কার্য বৈ তো নয়। অতএব, এগুলো থেকে বেঁচে থাক-যাতে তোমরা কল্যাণপ্রাপ্ত হও। শয়তান তো চায়, মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের পরস্পরের মাঝে শুত্রুতা ও বিদ্বেষ সঞ্চারিত করে দিতে এবং আল্লাহর স্মরণ ও নামায থেকে তোমাদেরকে বিরত রাখতে। অতএব, তোমরা এখন ও কি নিবৃত্ত হবে?’ (সূরা মায়েদা : ৯০-৯১)।
মানব জীবনকে বিপদগ্রস্থ করতে ধ্বংসাত্মক কাজগুলোকে মানুষের নিকট আকর্ষণীয় করে পেশ করাই শয়তানের কাজ। শয়তান হল যৌনবাদী, তাই অশ্লীলতা ও যৌনতার মোহে মানুষকে আচ্ছন্ন করে সে তার দুরভিসন্ধী বাস্তবায়িত করে। শয়তানের প্রতারণা থেকে বাচার বিভিন্ন কলা-কৌশল কোরআনে বর্ণিত হয়েছে।
কোরআনের একটি কৌশল হচ্ছে দৃষ্টি সংযত রাখা, কারণ দৃষ্টি পাত থেকেই যত দুর্ঘটনার সূত্রপাত। ‘মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গর হেফাযত করে। এতে তাদের জন্য খুব পবিত্রতা আছে।’ (সূরা নূর : ৩০)।
পাপাচার থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখলেই দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব, এটি আর একটি কোরআনের কৌশল। ‘তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেও না। অবশ্যই এটা অশ্লীল কাজ ও নিকৃষ্ট পন্থা।’ (সূরা ইসরা : ৩২)। ব্যভিচারকে উৎসাহিত করে এমন পরিবেশ, কথা, কাজ ও উৎসব এ আয়াত দ্বারা নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। মোমিনের কর্তব্য অন্তর থেকে ব্যভিচারকে এবং ব্যাভিচারের প্রতি প্ররোচনা দানকারী সব কিছুর চর্চা থেকে বিরত থাকা। এ ব্যভিচার বিভিন্ন অঙ্গের দ্বারা হতে পারে, ইরশাদ হচ্ছে, ‘দুই চোখের যেনা হলো পরস্ত্রীর প্রতি নজর করা, দুই কানের যেনা হলো যৌন উত্তেজক কথা-বার্তা শ্রবন করা, মুখের যেনা হলো পরস্ত্রীর সাথে রসালো কণ্ঠে কথা বলা। হাতের যেনা হলো পরস্ত্রীকে স্পর্শ করা এবং পায়ের যেনা হলো যৌন মিলনের উদ্দেশ্যে পরস্ত্রীর কাছে গমন। অন্তরের যেনা হলো হারাম বস্তু কামনা করা। আর যৌনাঙ্গ এগুলো বাস্তবায়ন করে বা মিথ্যা সাব্যস্ত করে।’ (মুসলিম : ৬৯২৫)।
শয়তান চায় নারী ও পুরুষের অবাধ মেলামেশা ও অবাধ কথাবার্তার পরিবেশ তৈরী করতে। কেননা এই অবাধ মেলামেশাই ব্যভিচারের প্রথম ধাপ। তাই যা কিছুই মানুষকে ব্যভিচারের দিকে প্রলুব্ধ ও উদ্যোগী করতে পারে, তার সবগুলোকেই ইসলাম নিষিদ্ধ করেছে। ‘নিশ্চয় আমার পালনকর্তা সব প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য অশ্লীলতা হারাম করেছেন।’ (সূরা আরাফ : ৩৩)।
অতএব জাহান্নাম থেকে বাঁচার জন্য এমন সকল স্থান থেকে শতহাত দূরে থাকা কর্তব্য, যে সকল স্থানে দেখা, স্পর্শ, শোনা ও কথার ব্যভিচারের সুযোগকে উন্মুক্ত ও অবারিত করা হয়। কারণ যিনা-ব্যভিচারের প্রসারে সমাজ জীবনের কাঠামো ভেঙ্গে পড়ে, ছড়িয়ে পড়ে অশান্তি ও সন্ত্রাস এবং কঠিন রোগব্যাধি।
আল্লাহ তায়ালা যাদের জন্য জান্নাতে প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করেছেন তাদের তালিকাভুক্ত যেন কোন মোমিনকে হতে না হয় সে ব্যাপারে সকলের সতর্ক থাকা জরুরী। রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহ তায়ালা তিন ব্যক্তির জন্য জান্নাত হারাম করেছেন। মাদকাসক্ত, পিতা-মাতার অবাধ্য এবং দাইউস, যে তার পরিবারের মধ্যে ব্যভিচারকে প্রশ্রয় দেয়।’ (মুসনাদে আহমাদ: ৬১৮০)। যে সকল অবিভাবকগণ তাদের অধিনস্ত ভাই-বোন, স্ত্রী-সন্তানদের অশ্লীল ও অনৈতিক কর্মকান্ড থেকে নিবৃত করেনা মূলত তাদেরকেই দাইউস বলা হয়, যাদের পরিণাম জাহান্নাম।
মুসলমানদের জীবনের উদ্দেশ্য খেল-তামাশা নয়। ‘এই পার্থিব জীবন ক্রীড়া-কৌতুক বৈ তো কিছুই নয়। পরকালের গৃহই প্রকৃত জীবন; যদি তারা জানত।’ (সূরা আনকাবুত : ৬৪)। মুসলমানদের আনন্দ-উল্লাস ও ভোগবিলাসের স্থান ক্ষণস্থায়ী পৃথিবী নয়, বরং চিরস্থায়ী জান্নাত। দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী ভোগবিলাস তো কাফেরদের জন্য বরাদ্দ, ‘(কাফেররা!) তোমরা কিছুদিন খেয়ে নাও এবং ভোগ-বিলাস করে নাও। তোমরা তো অপরাধী।’ (সূরা মুরসালাত : ৪৬)।

শেয়ার করুন

Leave a Comment