ইসলামে সময়ের গুরুত্ব

শাহ মাহমুদ হাসান


মানব সভ্যতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যে জাতি সময়ানুবর্তী, যারা অহেতুক সময় নষ্ট করে না, জীবনের প্রতিটি ক্ষণকে কাজে লাগায়, তারা উন্নতি ও সমৃদ্ধির উচ্চ শিখড়ে আরোহন করে। পক্ষান্তরে যে জাতি অচল, স্থবির ও গতিহীন সে জাতিকে অকল্যাণ, অধপতন ও নিম্নগামিতা পেয়ে বসে। কারণ আলসেমি ও অকমর্ণ্যতায় সংক্রমিত হয়ে কেউ কখনো উন্নতি ও সফলতা লাভ করতে পারে না।
সময় মূলত আমাদের জীবন বা হায়াত। সময় বা হায়াত একটি বড় নেয়ামত। হায়াত যতক্ষণ আছে সব কিছুর মূল্য আমার কাছে আছে। হায়াত আছে বলেই আমি আমার বলে দাবী করি। যেমন- আমার বাড়ি, আমার গাড়ি, আমার সম্পদ, আমার সন্তান ইত্যদি। যখন হায়াত থাকবেনা তখন আমার বলতেও কিছু থাকবেনা।
আমরা কোন বস্তুর গুরুত্ব বুঝাতে আল্লাহ তায়ালার শপথ করি। আর আল্লাহ তায়ালা যখন কোন জিনিসের গুরুত্ব বুঝাতে চান তখন উক্ত বস্তুর শপথ করেন। সময়ের গুরুত্ব বুঝাতেই আল্লাহ তায়ালা সময়ের কসম করেছেন, ‘কসম সময়ের, নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে, তারা ছাড়া যারা ঈমানদার, সৎ কর্মশীল, পরস্পরকে সত্যনিষ্ঠার নির্দেশ প্রদানকারী এবং ধৈর্য ধারণকারী ও অবিচল।’ (সূরা আসর : ১-৩)। আলোচ্য সূরার মাঝে চারটি কর্মের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, কারণ সময়ের গুরুত্ব কর্মের কারণেই হয়ে থাকে। কর্মের মধ্যে ভাল-মন্দ উভয় ধরণের বৈশিষ্ট রয়েছে এবং আল্লাহ তায়ালার নিকট থেকে রয়েছে এর জন্য পূর্ণ প্রতিফলের ব্যবস্থাও।
ইসলাম মানুষকে সময়ের ব্যাপারে সচেতন হতে নির্দেশ দেয়। মনে করিয়ে দেয়া হয় যে, এই পার্থিব জীবন নিতান্তই ক্ষণস্থায়ী। হায়াতের পরিধি কতটুকু এবং কখন আসবে মৃত্যুর পরোয়ানা তা জানা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। ইরশাদ হচ্ছে, ‘প্রত্যেক সম্প্রদায়ের একটি প্রতিশ্রুত সময় রয়েছে। যখন তাদের সময় এসে যাবে, তখন তারা না এক মুহুর্ত পিছে যেতে পারবে, আর না এগিয়ে আসতে পারবে।’ (সূরা আরাফ : ৩৪)। হাদীসে এসছে, ‘দুনিয়ায় তুমি একজন মুসাফির কিংবা পথচারী হয়ে থাকো’ এজন্য ইবনে উমর বলতেন: ‘তুমি যখন সন্ধায় উপনীত হও, তখন সকালের অপেক্ষা করোনা। তুমি সুস্থতার সময় রোগের জন্য প্রস্তুতি গ্রহন করো আর তোমার জীবিত থাকা অবস্থায় মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকো।’ (বুখারি : ৬০৫৩)।
ক্ষণস্থায়ীও স্বল্পকালীন জীবনের মাধ্যমে অনন্ত অসীম পরকালের জন্য পাথেয় সংগ্রহ করাই মানব জীবনের মূল লক্ষ্য। এক্ষেত্রে মানুষের সবচেয়ে বড় মূলধন সময় ও স্বাস্থ্য। প্রত্যেক মানুষকেই আল্লাহ তায়ালা এই দুটি পুঁজি দিয়ে পাঠিয়েছেন পৃথিবীতে। মানুষ এই পুঁজির সঠিক ব্যবহারতো করেইনা বরং এর অপব্যবহার ও অপচয় করে চরম ক্ষতিগ্রস্থ হয়। নাবী কারীম (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘দুটি নেয়ামতের ব্যাপারে দিুনিয়ার বহু লোক ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে; তাহলো দৌহিক স্বাস্থ্য ও অবসর সময়।’ (বুখারি : ৬০৪৯)।
এজন্য যারা বুদ্ধিমান তারা তাদের সময় অপচয় হওয়ার করণে দারুণভাবে অনুশোচিত হয়। আর যারা নির্বোধ তারা নির্দিধায় সময় নষ্ট করতে থাকে। সময় থাকতে তারা এ নিয়ে ভাবেনা এবং অনুশোচিতও হয়না। তাই আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘সেদিন মানুষ স্মরণ করবে, কিন্তু এই স্মরণ তার কি কাজে আসবে? সে বলবে: হায়! এ জীবনের জন্যে আমি যদি কিছু অগ্রে প্রেরণ করতাম!’ (সূরা ফাজর : ২৪-২৫)। ‘সেখানে তারা আর্ত চিৎকার করে বলবে, হে আমাদের পালনকর্তা, বের করুন আমাদেরকে, আমরা সৎকাজ করব, পূর্বে যা করতাম, তা করব না। আমি কি তোমাদেরকে এতটা বয়স দেইনি, যাতে যা চিন্তা করার বিষয় চিন্তা করতে পারতে? উপরন্তু তোমাদের কাছে সতর্ককারীও আগমন করেছিল। অতএব শাস্তি আস্বাদন কর।’ (সূরা ফতির : ৩৭)।
শেষ বিচারের দিনে মানুষকে তার জীবন-যৌবন, সম্পদ ও জ্ঞান কিভাবে ব্যয় করেছে, সে সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে। ‘কিয়ামতের দিবসে কোন মানুষ নিজের স্থান থেকে এক বিন্দুও সরতে পারবে না, যতক্ষণ না তার কাছ থেকে চারটি প্রশ্নের উত্তর নেওয়া হবে। সে তার তার জীবনকাল কিভাবে অতিবাহিত করেছে? তার জ্ঞান কি কাজে ব্যবহার করেছে? তার ধন-সম্পদ কোথা থেকে উপার্জন করেছে এবং কোথায় ব্যয় করেছে? আর তার যৌবনকে কিভাবে কাটিয়েছে।’ (তরেমিজি : ২৪১৭)।
পার্থিব জীবনের প্রতি ক্ষণই যাতে নেক কাজে ব্যয় হয় সে জন্য সচেষ্ট থাকা প্রত্যেক মুসলমানের আবশ্য কর্তব্য। শিশুকাল, কৈশোর ও যৌবনকাল পেরিয়ে মানুষ বার্ধক্যে উপনীত হয়। যৌবনকালের আমল সবচেয়ে বেশি কবুল হয়। যৌবনকালে যে সঠিক পথে থাকবে, সেই ব্যক্তি আল্লাহর আরশের ছায়ায় অবস্থান করবে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘কঠিন হাশরের উত্তপ্ত দিনে যেদিন আল্লাহর আরশের ছায়া ছাড়া আর কোন ছায়া থাকবেনা তার আরশের নীচে সাত শ্রেণীর ব্যক্তিকে আশ্রয় দান করবেন।’ ছায়াপ্রাপ্তদের মধ্যে অন্যতম দুই শ্রেণীর ব্যক্তিরা হল, ‘সেই যুবক-যুবতী, যে আল্লাহর অনুশাসন মেনে তাঁর ইবাদত বন্দেগিতে জীবন কাটায় এবং অবৈধ প্রেম বা কুপ্রস্তাব প্রত্যাখ্যান কারী সেই যুবক যে বলে আমি আল্লাহ তায়ালাকে বেশি ভয় করি ( সাময়িক যৌন সুখ উপভোগ করার চেয়ে)।’ (বোখারি : ৬২৯)।
ইসলাম যেখানে যৌবনকালকে এতটা গুরুত্ব দিয়েছে, সেখানে এদেশের কিছু অপশক্তি যুবসমাজকে নেশা, যৌনতা, সন্ত্রাস ইত্যাদি অপকর্মের দিকে ধাবিত করছে। মুসলিম সমাজকে এ ব্যপারে সজাগ ও সচেতন থাকতে হবে।

শেয়ার করুন

Leave a Comment