কুরবানীর ইতিহাস ও পুরুষ্কার

কুরবানী আল্লাহ তায়ালার একটি বিধান। আদম (আ.) থেকে সকল নবীর যুগেই ছিল কুরবানী করার ব্যবস্থা । যেহেতু সকল নবীর যুগেই এর বিধান ছিল সেহেতু এর গুরুত্ব অপরিসীম। যেমন ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য কুরবানীর নিয়ম করে দিয়েছি; তিনি তাদেরকে জীবনোপকরণ স্বরূপ যে সকল চতুষ্পদ জন্তু দিয়েছেন, সেগুলোর উপর যেন তারা আল্লাহর নাম স্মরণ করে। (সূরা হাজ্জ : ৩৪)।
আল্লাহ তায়ালা তার প্রিয় বন্ধু ইবরাহীম (আ.)-কে বিভিন্ন পরীক্ষার সম্মুখিন করেছেন এবং ইবরাহীম (আ.) সকল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন কৃতকার্যের সাথে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর স্মরণ কর, যখন ইবরাহীমকে তার রবের কয়েকটি বাণী দিয়ে পরীক্ষা করলেন, অতঃপর সে তা পূর্ণ করল। তিনি বললেন, আমি তোমাকে নেতা বানাবো’। (সূরা বাকারাহ : ১২৪)।
কুরবানীর ইতিহাস
নিজের প্রাণপ্রিয় পুত্রকে কুরবানী করার মত কঠিন পরীক্ষার সম্মুখিন হয়েছিলেন ইবরাহীম (আ.)। সূরা সাফ্ফাতের ১০০ থেকে ১০৮ আয়াতে ইবরাহীম ও ইসমাঈল (আ.)-এর আত্মত্যাগ এবং আল্লাহর প্রতি সীমাহীন আনুগত্যের সেই বিরল ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে, ‘তিনি বললেন, হে আমার পরওয়ারদেগার! আমাকে এক সৎপুত্র দান কর। সুতরাং আমি তাকে এক সহনশীল পুত্রের সুসংবাদ দান করলাম। অত:পর সে যখন পিতার সাথে চলাফেরা করার বয়সে উপনীত হল, তখন ইবরাহীম তাকে বলল: বৎস! আমি স্বপ্নে দেখিযে, তোমাকে যবেহ করছি; এখন তোমার অভিমত কি দেখ। সে বলল: পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, তাই করুন। আল্লাহ চাহে তো আপনি আমাকে সবরকারী পাবেন। যখন পিতা-পুত্র উভয়েই আনুগত্য প্রকাশ করল এবং ইবরাহীম তাকে যবেহ করার জন্যে শায়িত করল। তখন আমি তাকে ডেকে বললাম: হে ইবরাহীম, তুমি তো স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখালে! আমি এভাবেই সৎকর্মীদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি। নিশ্চয় এটা এক সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আমি তার পরিবর্তে দিলাম যবেহ করার জন্যে এক মহান জন্তু। আমি তার জন্যে এ বিষয়টি পরবর্তীদের মধ্যে রেখে দিয়েছি।’
একমাত্র আল্লাহর নৈকট্য লাভের প্রত্যাশায় ইবরাহীম (আ.) প্রাণাধিক পুত্রকে কুরবানী করার মধ্য দিয়ে অসীম ধৈর্যশীলতার যে উত্তম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন পৃথিবীর ইতিহাসে সে এক বিরল ঘটনা। আত্মত্যাগ ও আত্মসমর্পণের মহান স্মৃতিকে চির জাগ্রত করার জন্য আজও আমরা সেই ইবরাহীমী সুন্নাতের অনুসরণে প্রতি বছর যিলহজ্জ মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখে পশু কুরবানী করে থাকি। এটি মুসলিম মিল্লাতের অন্যতম একটি ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। ক্বিয়ামত পর্যন্ত এই মহান আত্মত্যাগের ধারাবাহিকতা চলমান থাকবে ইনশাআল্লাহ।
ত্যাগের পুরুষ্কার
ত্যাগ ছাড়া কখনোই কল্যাণকর কিছুই অর্জন করা যায় না। আল্লাহ তায়ালার সামনে নি:শর্ত আত্মসমর্পনের কারনে তিনি ইবরাহীম (আ.) কে বিভিন্ন ভাবে সম্মানিত করেছেন। স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা ইবরাহীম (আ.) কে সালাম বা সম্মান প্রদান করেছেন। মহান আল্লাহর বানী, ‘ইবরাহীমের প্রতি সালাম বর্ষিত হোক।’ (সূরা সফ্ফাত : ১০৯)। এক সন্তানের উৎসর্গে আল্লাহ তায়ালা খুশি হয়ে সকল মুসলমানের জনক বানিয়ে দিলেন। মহান আল্লাহর বানী, ‘তোমরা তোমাদের পিতা ইবরাহীমের ধর্মে কায়েম থাক। তিনিই তোমাদের নাম মুসলমান রেখেছেন।’ (সূরা হাজ্জ : ৭৮)। হযরত ইবরাহীম (আ.) কে তার আত্মত্যাগের বিনিময়ে নেতৃত্তের পুরুষ্কারেও ভূষিত করা হয়েছে। কারন যোগ্য নেতৃত্তের প্রধান শর্তই হল ত্যাগের মানসিকতা। ত্যাগী নেতার মাধ্যমেই জাতি হয় উপকৃত। আর স্বার্থপর নেতার দ্বারা জনতা হয় লুন্ঠিত ও ক্ষতিগ্রস্ত। মহান আল্লাহর বানী, ‘আমি তোমাকে মানবজাতির নেতা করব।’ (সুরা বাকারা : ১২৪)। ইবরাহীম (আ.) তার সন্তানদেরকেও এই নেতৃত্তের অংশিদ্বার বানাতে চাইলেন। এখানেও ত্যাগ। শুধু নিজেই নেতৃত্ব চাননি। তিনি চেয়েছিলেন এ নেতৃত্বে অন্যরাও সুযোগ পাক। তিনি বললেন, ‘আমার বংশধর থেকেও (নেতা বানাও)! আল্লাহ তায়ালা বললেন, আমার (নেতৃত্ব প্রদানের) অঙ্গীকার অত্যাচারীদের পর্যন্ত পৌঁছাবে না।’ (সুরা বাকারা : ১২৪)। আল্লাহ তায়ালা এখানে এমন এক জাতির প্রতি ইংগিত করলেন যেই জাতি ন্যায়পরায়ন হবে। তার বিধান পালনের ক্ষেত্রে জীবনের পরওয়া করবেনা। পরিবার, সন্তান ও সম্পদের পরওয়া করবেনা। মান, সম্মান, ক্ষমতা, তিরস্কার, হয়রানি ও শাস্তি কোন কিছুর তোয়াক্কা করবেনা। কোন ক্ষমতাধর জালিমের সামনেও তার হুকুম পালনে থাকবে অটল অবিচল। যেমন ইব্রহীম (আ.)নমরুদের সামনেও ছিলেন আল্লাহর হুকুম পালনে অবিচল। মুসলিম জাতির পিতা ইবরাহীম (আ.) তাঁর প্রাণপ্রিয় পুত্র ইসমাঈল (আ.) কে আল্লাহর রাহে কুরবানী দেয়ার সুমহান দৃষ্টান্ত স্থাপন করে যেভাবে ঈমানী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে মানবজাতিকে ত্যাগের শিক্ষা দিয়ে গেছেন, সে আদর্শ ও প্রেরণায় আমরা আমাদের জীবনকে ত্যাগের আলোয় উজ্জীবিত করব, এটাই কুরবানীর মৌলিক চেতনা।
পশু কুরবানী মূলত নিজের নফস তথা কুপ্রবৃত্তিকে কুরবানী করার প্রতীক। তাই পশুর গলায় ছুরি চালানোর সঙ্গে সঙ্গে যাবতীয় পাপ-পঙ্কিলতা, কুফর, শিরক, হিংসা-বিদ্বেষ, ক্রোধ, রিয়া, পরচর্চা-পরনিন্দা, পরশ্রীকাতরতা, আত্মগর্ব, আত্মঅহংকার, কৃপণতা, ধনলিপ্সা, দুনিয়ার মায়া-মুহাববত কলুষতার মত যেসব জঘণ্য পশুসুলভ আচরণ আমরা লালন করছি তারও কেন্দ্রমূলে ছুরি চালাতে হবে। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে, প্রতিটি পদক্ষেপে প্রতিটি মুহূর্তে প্রভুর আনুগত্য, আজ্ঞাপালন ও তাক্বওয়ার দ্বিধাহীন শপথ গ্রহণ করতে হবে।

শেয়ার করুন

Leave a Comment