আত্মত্যাগের কোরবানি

আল্লাহ তায়ালা তার প্রিয় বন্ধু ইবরাহীম (আ:) কে বিভিন্ন পরীক্ষায় অবতীর্ণ করেছেন আর ইবরাহীম (আ:) সকল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। আল্লাহ প্রদত্ত কঠিনতম পরীক্ষা-প্রাণাধিক পুত্রকে কোরবানি করার মধ্য দিয়ে ধৈর্যশীলতার যে উত্তম নমুনা পেশ করেছেন; পৃথিবীর ইতিহাসে তা এক বিরল ঘটনা। তাই তো আমাদের জন্য কোরবানির বিধান আরোপের পেছনে রয়েছে বেশ কিছু লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।
শর্তহীন আনুগত্য
আল্লাহ তায়ালা তার বান্দাহকে যে কোনো আদেশ দেয়ার ইখতিয়ার রাখেন এবং বান্দাহ তা পালন করতে বাধ্য। তাই তার আনুগত্য হবে শর্তহীন। আল্লাহর আদেশ সহজ হোক আর কঠিন হোক তা পালন করার মন-মানসিকতা থাকতে হবে। আল্লাহর হুকুম মানার বিষয়ে কোন মায়া-মমতা ও নিজেস্ব অভিরুচি প্রতিবন্ধকতা তৈরী করতে পারবে না। নফসের আনুগত্য ত্যাগ করে আল্লাহর একান্ত অনুগত হওয়াই কোরবানির উদ্দেশ্য। যেমন ইবরাহীম (আ:) এর আনুগত্য ছিল শর্তহীন। যখন তার প্রীয়তমা স্ত্রী ও সদ্যজাত সন্তানকে বিরাণ এক উপত্যকায় রেখে আসার হুকুম হল তার মনে এরকম কোন প্রশ্নের উদয় হয়নি যে, আমার পরিবার কি খাবে? কোথায় থাকবে? তাদের নিরাপত্তার কি হবে? বরং বিনা প্রশ্নে বিনা দ্বিধায় আল্লাহ তায়ালার হুকুম বাস্তবায়ন করেছেন। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হবার পূর্বে আল্লাহ তায়ালার আরো আজ্ঞাবহ ও অনুগত বান্দা হবার আকঙ্খাও ব্যাক্ত করেছিলেন। বলেছিলেন, ‘পরওয়ারদেগার! আমাদের উভয়কে তোমার আজ্ঞাবহ কর এবং আমাদের বংশধর থেকেও একটি অনুগত দল সৃষ্টি কর। (সূরা বাকারা : ১২৮)।
আবার পিতার প্রতি ছেলেকে কোরবানি করার নির্দেশের সামনে পিতা ইব্রাহীম (আ:) যেমনি কোন প্রশ্ন তুলেননি, তেমনি সন্তান ইসমাইল ও স¤পূর্ণ রূপে আনুগত্যের মস্তক অবনত করে দিয়েছেন। যেহুতু হুকুম আল্লাহ তায়ালার সুতরাং এখানে আপত্তি করার কোন অধিকার কারো নেই। কেননা সব কিছুর মালিকতো তিনিই। এই জীবনের মালিকও তিনি। ইব্রাহীম (আ.) নিজেই করেছিলেন এমন উক্তি, ‘নিশ্চয়ই আমার নামায, আমার কোরবানি, আমার জীবন, আমার মরণ সবই বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য নিবেদিত।’ (সূরা আনআম : ১৬২)।
আল্লাহর নৈকট্য অর্জন
তাকওয়া অর্জন ছাড়া আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায় না। একজন মুসলিমের অন্যতম চাওয়া হলো আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য অর্জন। পশুর রক্ত প্রবাহিত করার মাধ্যমে কোরবানি দাতা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নৈকট্য অর্জন করেন। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আল্লাহর নিকট পৌঁছায় না তাদের গোশত এবং রক্ত, বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া। (সূরা হাজ: ৩৭)। রসুল্লাল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘কোরবানির দিনে কোন আদম সন্তানের কোরবানির পশুর রক্ত প্রবাহিত করার থেকে মহান আল্লাহর নিকট অধিক পছন্দনীয় কোন আমল নেই। কিয়ামত দিবসে কোরবানির পশু শিং, খুর, লোম প্রভৃতি নিয়ে উপস্থিত হবে। এবং তার রক্ত জমিনে পড়ার পূর্বেই আল্লাহর নির্ধারিত মর্যাদার স্থানে পতিত হয়। অতএব, তোমরা প্রফুল্ল চিত্তে কোরবানি কর।’ (ইবনে মাজাহ : ৩১২৬)।
আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করা
প্রত্যেক ইবাদাতই আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ বহন করে। কোরবানির মাধ্যমেও প্রকাশ করা হয় আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘এভাবে তিনি এ চতু®পদ জন্তুগুলোকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন যাতে তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর এজন্য যে, তিনি তোমাদের পথ প্রদর্শন করেছেন; সুতরাং তাঁরই আজ্ঞাধীন থাক এবং বিনয়ীগণকে সুসংবাদ দাও। (সূরা হাজ : ৩৪)।
ত্যাগের পরীক্ষা
পৃথিবীতে ত্যাগী মানুষের বড্ড অভাব আদি কাল থেকেই। ত্যাগের স্থান দখল করে রেখেছে স্বার্থপরতা ও পরশ্রীকাতরাতা। কোরবানি হলো একটি ত্যগের পরীক্ষা। আল্লাহর বিধান পালনে জান-মালের ত্যাগ স্বীকার করার যোগ্যতা তৈরী হয়। কোরবানির ঈদকে শুধু গোশত খাওয়ার অনুষ্ঠানে পরিণত না করে বরং নিজেদের মধ্যকার পশুসুলভ আচরণ তথা লোভ ও স্বার্থপরতা ত্যাগ করার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার একটি প্রস্তুতি মূলক আয়োজন। কারণ মমিনকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য বিভিন্ন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়। ইরশাদ হচ্ছে, ‘আমি তোমাদেরকে অবশ্যই ভয়, দারির্দ্য, স¤পদ ও জীবনের ক্ষয়ক্ষতি করার মাধ্যমে পরীক্ষা করবো।’ (সূরা বাকারাহ: ১৫৫)।
সামাজিক ও পারিবারিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা
কোরবানির মাধ্যমে সামাজিক ও পারিবারিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা করার বিশেষ সুযোগ সৃষ্টি হয়। সমাজে আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠার জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার প্রেরণা তৈরী হয়। এক সংগে ঈদের নামায আদায় করা ও কোরবানির গোসত গরীব-দু:খী ও আত্মিয়-স্বজন ও প্রতিবেশির মাঝে বন্টনের মাধ্যমে তৈরী হয় সহযোগীতা, সহমর্মীতা, সহবস্থান ও সামাজিক ঐক্যবদ্ধতার মানসিকতা। আর ইসলাম বিচ্ছিন্নতাকে প্রশ্রয় দেয়না বরং নির্দেশ দেয় ঐক্যবদ্ধতার। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমারা আল্লাহর রজ্জুকে ঐক্যবদ্ধভাবে আঁকড়ে ধর এবং পর¯পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।’ (সূরা আলে ইমরান : ১০৩)। প্রতি বছর এই মহান শিক্ষার কথাই যেন কোরবানি মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় ।
দারিদ্র বিমোচন
কোরবানিতে গরীব মানুষের অনেক উপকার হয়। যারা বছরে একবারও গোশত খেতে পারে না, তারাও গোশত খাবার সুযোগ পায়। ক্ষুধা ও দারিদ্র বিমোচনে এর গুরুত্ব অপরিসীম। দরিদ্র মানুষের কর্ম সংস্থানেরও ব্যাবস্থা করা যায়। কোরবানির পশুর চাহিদা মেটাতে ব্যক্তিগত ও বানিজ্যিকভাবে পশু পালনের সুযোগ সৃষ্টি হয়। কোরবানির চামড়ার টাকা গরীবের মাঝে বণ্টন করার মাধ্যমে গরীব-দু:খী মানুষের নিত্য দিনের মৌলিক প্রয়োজন মেটানো সম্ভব। অপরদিকে কোরবানির পশু চামড়া অর্থনীতিতে একটি বিরাট ভূমিকা পালন করে থাকে।

শেয়ার করুন

Leave a Comment