বিশ্বজুড়ে একসঙ্গে রোজা ও ঈদ পালন অসম্ভব

ইসলামী শরিয়াতে মাস গণনার জন্য চাঁদ দেখার যে নির্দেশনা এসেছে তা একটি নির্দিষ্ট ভূখন্ডের ঐ জনসমষ্টির জন্য প্রযোজ্য, যাদের উপর চাঁদ উদিত হয়েছে। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি রামাজান মাস পাবে, সে যেন রোজা রাখে।’ (বাকারাহ : ১৮৫) এখানে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে যে নির্দেশনাটি এসেছে তা হল, ‘যারা এ মাস পাবে’ অর্থাৎ সকলেই নয়, বরং তারাই যারা চাঁদ দেখতে পাবে। অতএব রামাজানের রোজা পালন ও ঈদ উদযাপন করার সাথে ব্যক্তি সমষ্টির চাঁদ দেখা শর্ত। যেমন রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা চাঁদ দেখে রোজা রাখ এবং চাঁদ দেখে ইফতার কর। তবে যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকে তাহলে মাসের হিসাব ত্রিশ দিনে পূর্ণ করে নাও।’ (বুখারী: ১৮১০) হাদীসে বর্ণিত এই নির্দেশনাটিও সমগ্র বিশ্বের জন্য নয় বরং নির্দিষ্ট ভুখন্ডের জন্যই প্রযোজ্য।
একই দিনে রোজা ও ঈদ প্রসঙ্গ
একই দিনে রোজা ও ঈদ পালনের প্রমান হিসেবে যে হাদীসটিকে বেশ গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করা হয় সেটি হচ্ছে, ‘রাসূল (সা.) মধ্যাহ্নের পর কয়েকজন মরুবাসী বেদুঈনের কাছে শাওয়ালের চাঁদ দেখার সংবাদ পাওয়া মাত্র সাহাবীদেরকে রোজা ভঙ্গ করতে বললেন ও পরদিন ঈদের নামায আদায়ের নির্দেশ দিলেন।’ (আবু দাউদ : ১১৫৭) কিন্তু এই হাদিসটি সারাবিশ্বে একদিনে রোজা ও ঈদ পালনের বৈধতা কোনভাবেই প্রমান করেনা। কেননা রাসূল (সা.) যাদের কাছে সংবাদ পেয়েছিলেন তারা দূরবর্তী কোন স্থান থেকে আগমন করেন নি; বরং মদীনার পার্শ্ববর্তী কোন স্থান থেকেই এসেছিলেন। বড়জোড় ২৫/৩০ মাইল দূরের এলাকায় তারা চাঁদ দেখে থাকবেন। আর কাছাকাছি এলাকা সমূহের এক জায়গার চাঁদ দেখাতো অন্য জায়গার জন্য গ্রহণযোগ্য!
অতএব এই হাদীসের বাস্তবতা হলো যে, মদীনার আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকার কারণেই রাসূল (সা.) ও সাহাবীরা চাঁদ দেখতে পাননি। কিন্তু পার্শ্ববর্তী মরুভূমির মানুষ আকাশ পরিষ্কার থাকায় তা দেখতে পেয়েছিল। তাই তাদের সংবাদ রাসূল (সা.) আমলে নিয়ে রোজা ভেঙ্গে ছিলেন।
অতএব, আলোচ্য হাদীসটি নিকটবর্তী এলাকার চাঁদের ব্যপারে প্রযোজ্য। দূরবর্তী এলাকার চাঁদের ব্যপারে নয়। এ বিষয়ে ইবনে কুদামা বলেন, ‘যদি দুই শহরের মধ্যে দুরত্ব কম থাকে তখন চাদের উদয়স্থলও অভিন্ন হবে। যেমন বাগদাদ ও বসরা শহরের দুরত্ব কম থাকায় এক শহরে চাঁদ দেখা অন্য শহরের জন্য প্রযোজ্য হবে। কিন্ত হেজায, ইরাক ও দামেশকের মত এক দেশ থেকে অন্য দেশের দুরত্ব বেশি হলে প্রত্যেক দেশের চাঁদের হুকুম হবে ভিন্ন ভিন্ন। এক অঞ্চলের চাঁদ দেখা অন্য অঞ্চলের জন্য প্রযোজ্য হবে না।’ (শরহে কাবির, ৩/৭)

জ্যোতির্বিজ্ঞানের তত্ত্ব
আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিশ্লেষণ হলো, কোন অঞ্চলের উদিত চাঁদ তার আশেপাশের ৫৬০ মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চল সমূহে দেখা সম্ভব এবং উক্ত দূরত্বের অধিবাসীগণ ঐ চাঁদের হিসাব অনুযায়ী রোজা ও ঈদ পালন করতে পারে। এবং সূর্যাস্তের পর একটি নতুন চাঁদ তার উদয়স্থলে দৃশ্যমান থাকে প্রায় ২০/২৫ মিনিট। সুতরাং পার্শ্ববর্তী কোন এলাকার সময়ের পার্থক্য যদি ৩০ মিনিট হয় তাহলে সেখানে একদিন পরেও চাঁদ দেখা যেতে পারে। (সূত্র: www.moonsighting.com)
সাহাবায় কেরামের আমল
সাহাবায় কেরামের যুগে দূরবর্তী অঞ্চলের চাঁদের খবর পাওয়ার কথা চিন্তাই করা যেত না। কিন্তু সাহাবাদের যুগেই ঘটনাচক্রে সংঘটিত হয়েছে এমন একটি ঘটনা যার মাধ্যমে এ বিষয়টির সুরাহা সম্ভব।
বিশিষ্ট তাবেয়ী কুরাইব (রাহ.) গিয়ে ছিলেন দামেশকে। দামেশক মদীনা থেকে প্রায় ১৯২৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। সেখানে শুক্রবার রাতে রমযানের চাঁদ দেখা গেল এবং শুক্রবার থেকে রোযা শুরু হল। কুরাইব (রাহ.) রমজান মাসের শেষের দিকে মদীনায় পৌঁছলেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আববাস (রা.) কুরাইব (রাহ.) কে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমরা কবে চাঁদ দেখেছ?’ কুরাইব (রাহ.) বললেন, ‘শুক্রবার রাতে।’ ইবনে আববাস (রা.) জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি কি নিজেই দেখেছ?’ তিনি বললেন, ‘হাঁ, আমিও দেখেছি, অন্যরাও দেখেছে। সবাই রোযা রেখেছে। আমীরুল মুমিনীন মুয়াবিয়া (রা.) ও রোযা রেখেছেন।’ ইবনে আববাস (রা.) বললেন, ‘কিন্তু আমরা তো শনিবার রাতে চাঁদ দেখেছি। অতএব আমরা আমাদের হিসাবমত ৩০ রোযা পুরা করব, তবে যদি ২৯ তারিখ দিবাগত রাতে চাঁদ দেখি সেটা ভিন্ন বিষয়।’ কুরাইব (রাহ.) জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনি কি মুয়াবিয়া (রা.) এর চাঁদ দেখা ও রোযা রাখাকে যথেষ্ট মনে করেন না?’ ইবনে আববাস (রা.) বললেন ‘না, রাসূল (সা.) আমাদের কে এমন আদেশই করেছেন।’ (মুসলিম: ১০৮৭)
এখানে লক্ষ্যণীয় যে, স্থান পরিবর্তন হবার কারণে কুরাইব (রাহ.) এর মত একজন বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য ব্যক্তির সাক্ষ্য থাকার পরেও শামের দেখা চাঁদের উপর ইবনে আববাস (রা.) আমল করলেন না। কারণ হিসেবে তিন উল্লেখ করেছেন, ‘রাসূল (সা.) আমাদের কে এ আদেশই করেছেন’। আর রাসূল (সা.) নির্দেশ ছিলো, ‘স্থানীয় ভাবে চাঁদ না দেখে রোজা ও ইফতার নয়’ এই মূলনীতির অনুসরণ করা।
সুতরাং ইবনে আববাস (রা.) এর মাযহাব ছিল যে, রোজা ও ঈদ পালনের জন্য নিজ-নিজ এলাকায় উদিত চাঁদের উপর নির্ভর করা। তিনি দূরবর্তী অঞ্চলের চাঁদ দেখা ধর্তব্য মনে করতেন না। আর এ বিষয়ে অন্য কোনো সাহাবী তাঁর সাথে দ্বিমত পোষণ করেছেন এমন একটি প্রমানও কেউ দেখাতে পারবে না। সাহবায় কেরাম থেকে নিয়ে সুদীর্ঘ ১৩০০ বছর ধরে চলে আসা চাঁদের প্রচলিত বিধানকে আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় পরিবর্তন আনার অর্থ কি দাড়ায়? এই সুদীর্ঘ কাল ধরে তারা প্রযুক্তি জ্ঞানের অভাবে সঠিক সময়ে রোজা ও ঈদ পালনে উম্মত ব্যার্থতার পরিচয় দিয়েছে?
অবৈজ্ঞানিক মতবাদ
যদি পৃথিবীতে চাঁদের দেখা মিললেই রোজা ও ঈদ শুরু করতে হয় তাহলে চাঁদের সর্বপশ্চিমের উদয়স্থল আমেরিকার আলাস্কা অঙ্গ রাজ্যকে মানদন্ড ধরে রোজা ও ঈদ পালন করা উচিত। কারণ সেখানেই তো চাঁদ প্রথম দৃশ্যমান হয়। শরীআতে এমন কোন ইঙ্গিত কি রয়েছে যে, সউদী আরবের চাঁদই সারা বিশ্বের জন্য মানদন্ড হবে? এটি বিজ্ঞান সম্মত নয়। প্রথম দৃশ্যমান চাঁদ অনুযায়ী সর্বত্র রোজ ও ঈদ পালন করা কোন ভাবেই সম্ভব নয়। যেমন: আমেরিকায় চাঁদ উঠেছে কি না তা জানতে বাংলাদেশের মুসলমানদের অপেক্ষা করতে হবে অন্ততঃ ১২ ঘণ্টা। অর্থাৎ পরদিন ভোর ৬ টায় জানা যাবে চাঁদের খবর। নিউজিল্যান্ডের সাথে আমেরিকার আলাস্কা অঙ্গ রাজ্যের সময়ের পার্থক্য প্রায় ২৪ ঘণ্টা। তাহলে আমেরিকার চাঁদ ওঠার খবর নিউজিল্যান্ডবাসী জানতে পারবে পরদিন রাতে। তাহলে তাদের ঐ দিনের রোজার উপায় কি হবে?
মূলতঃ যতটুকু অঞ্চল জুড়ে একই দিনে চাঁদ দেখা সম্ভব ঠিক ততটুকু অঞ্চলের মানুষের মধ্যেই চাঁদ দেখার বিধান সীমাবদ্ধ থাকবে, এটিই শরিয়াতের বিধান। অতএব, সারা পৃথিবীতে এক যোগে রোজা পালন ও ঈদ উদযাপন করার মতাদর্শ কাল্পনিক, অবাস্তব ও অবৈজ্ঞানিক।
পশ্চিম আফ্রিকার মালি প্রবাসী

বিশ্বজুড়ে একই দিনে ঈদ অসম্ভব

শাহ মাহমূদ হাসান

ইসলামী শরিয়তে মাস গণনার জন্য চাঁদ দেখার যে নির্দেশনা এসেছে, তা নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের জনসমষ্টির জন্য প্রযোজ্য, যাদের ওপর চাঁদ উদিত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি রমজান মাস পায়, সে যেন রোজা রাখে।

’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৮৫)। এখানে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে যে নির্দেশনা এসেছে তা হলো, ‘যারা এ মাস পাবে’, অর্থাৎ সবাই নয়, বরং তারাই রোজা রাখবে, যারা চাঁদ দেখতে পাবে। সুতরাং রমজানের রোজা পালন ও ঈদ উদ্‌যাপন করার সঙ্গে ব্যক্তিসমষ্টির চাঁদ দেখা শর্ত। বিষয়টি আরো স্পষ্টভাবে এসেছে হাদিস শরিফে। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা চাঁদ দেখে রোজা রাখো এবং চাঁদ দেখে ইফতার করো। তবে যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকে, তাহলে মাসের হিসাব ৩০ দিনে পূর্ণ করে নাও। ’ (বুখারি, হাদিস : ১৮১০) এ হাদিসে বর্ণিত নির্দেশনা গোটা বিশ্বের জন্য নয়, বরং নির্দিষ্ট ভুখণ্ডের জন্য প্রযোজ্য।

একই দিনে রোজা ও ঈদ অসম্ভব

একই দিনে রোজা ও ঈদ পালনের ‘প্রমাণ’ হিসেবে যে হাদিস গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করা হয়, সেটির মর্ম অনেকে উপলব্ধি করতে পারেনি। ওই হাদিসে এসেছে, ‘রাসুল (সা.) মধ্যাহ্নের পর কয়েকজন মরুবাসী বেদুইনের কাছে শাওয়ালের চাঁদ দেখার সংবাদ পাওয়ামাত্র সাহাবিদের রোজা ভঙ্গ করতে বলেন ও পরদিন ঈদের নামাজ আদায়ের নির্দেশ দেন। ’ (আবু দাউদ, হাদিস : ১১৫৭) কিন্তু এ হাদিস সারা বিশ্বে একদিনে রোজা ও ঈদ পালনের বৈধতা কোনোভাবেই প্রমাণ করে না। কেননা রাসুল (সা.) যাঁদের কাছে চাঁদ দেখার সংবাদ পেয়েছিলেন, তাঁরা দূরবর্তী কোনো স্থান থেকে আগমন করেননি। তাঁরা মদিনার পার্শ্ববর্তী কোনো স্থান থেকেই এসেছিলেন। আর কাছাকাছি এলাকায় এক জায়গার চাঁদ দেখা অন্য জায়গার জন্য গ্রহণযোগ্য।

সুতরাং এই হাদিসের বাস্তবতা হলো, মদিনার আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকার কারণে রাসুল (সা.) ও সাহাবিরা চাঁদ দেখতে পাননি। কিন্তু পার্শ্ববর্তী মরুভূমির মানুষ আকাশ পরিষ্কার থাকায় তা দেখতে পেয়েছিল। তাই তাদের সংবাদ রাসুল (সা.) আমলে নিয়ে রোজা ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

কাজেই বোঝা গেল, আলোচ্য হাদিস নিকটবর্তী এলাকার চাঁদের ব্যাপারে প্রযোজ্য। দূরবর্তী এলাকার চাঁদের ব্যাপারে নয়। এ বিষয়ে ইবনে কুদামা (রহ.) লিখেছেন, ‘যদি দুই শহরের মধ্যে দূরত্ব কম থাকে, তখন চাঁদের উদয়স্থলও অভিন্ন হবে। যেমন—বাগদাদ ও বসরা শহরের দূরত্ব কম থাকায় এক শহরে চাঁদ দেখা অন্য শহরের জন্য প্রযোজ্য। কিন্তু হেজাজ, ইরাক ও দামেস্কের মতো এক দেশ থেকে অন্য দেশের দূরত্ব বেশি হলে প্রতিটি দেশের চাঁদের বিধান হবে ভিন্ন ভিন্ন। এক অঞ্চলের চাঁদ দেখা অন্য অঞ্চলের জন্য প্রযোজ্য নয়। ’ (শরহে কাবির : ৩/৭)

জ্যোতির্বিজ্ঞানের আলোকে একই দিনে ঈদতত্ত্ব

আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিশ্লেষণ হলো, কোনো অঞ্চলের উদিত চাঁদ তার আশপাশের ৫৬০ মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে দেখা সম্ভব। এমন দূরত্বের অধিবাসীরা ওই চাঁদের হিসাব অনুযায়ী রোজা ও ঈদ পালন করতে পারে। জ্যোতির্বিজ্ঞান বলছে, সূর্যাস্তের পর একটি নতুন চাঁদ তার উদয়স্থলে দৃশ্যমান থাকে ২০ থেকে ২৫ মিনিট। সুতরাং পার্শ্ববর্তী কোনো এলাকার সময়ের পার্থক্য যদি ৩০ মিনিট হয়, তাহলে সেখানে এক দিন পরও চাঁদ দেখা যেতে পারে। (সূত্র : www.moonsighting.com)

সাহাবায়ে কেরামের যুগে ঈদ উদ্‌যাপন

সাহাবায়ে কেরামের যুগে দূরবর্তী অঞ্চলের চাঁদের খবর পাওয়ার কথা চিন্তাই করা যেত না। কিন্তু সাহাবাদের যুগেই ঘটনাচক্রে সংঘটিত হয়েছে এমন একটি ঘটনার মাধ্যমে এ বিষয়টির সুরাহা সম্ভব। বিশিষ্ট তাবেয়ি কুরাইব (রহ.) গিয়েছিলেন দামেস্কে। দামেস্ক মদিনা থেকে প্রায় এক হাজার ৯২৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। সেখানে শুক্রবার রাতে রমজানের চাঁদ দেখা যায়। শুক্রবার থেকে রোজা শুরু হয়। কুরাইব (রহ.) রমজান মাসের শেষের দিকে মদিনায় পৌঁছলেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে অব্বাস (রা.) কুরাইব (রহ.)-কে জিজ্ঞেস করেন, ‘তোমরা কবে চাঁদ দেখেছ?’ কুরাইব (রহ.) বললেন, ‘শুক্রবার রাতে। ’ ইবনে আব্বাস (রা.) জিজ্ঞেস করেন, ‘তুমি কি নিজেই দেখেছ?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, আমিও দেখেছি, অন্যরাও দেখেছে। সবাই রোজা রেখেছে। আমিরুল মুমিনিন মুয়াবিয়া (রা.)ও রোজা রেখেছেন। ’ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘কিন্তু আমরা তো শনিবার রাতে চাঁদ দেখেছি। সুতরাং আমরা আমাদের হিসাবমতো ৩০ রোজা পুরা করব, তবে যদি ২৯ তারিখ দিবাগত রাতে চাঁদ দেখি, সেটা ভিন্ন বিষয়। ’ কুরাইব (রহ.) জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনি কি মুয়াবিয়া (রা.)-এর চাঁদ দেখা ও রোজা রাখাকে যথেষ্ট মনে করেন না?’ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘না, রাসুল (সা.) আমাদের এমন আদেশই করেছেন। ’ (মুসলিম, হাদিস : ১০৮৭)

এখানে লক্ষণীয় যে স্থান পরিবর্তন হওয়ার কারণে কুরাইব (রহ.)-এর মতো একজন বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য ব্যক্তির সাক্ষ্য থাকার পরও সিরিয়ায় দেখা চাঁদের ওপর ইবনে আব্বাস (রা.) আমল করেননি। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘রাসুল (সা.) আমাদের এ আদেশই করেছেন। ’ আর রাসুল (সা.)-এর নির্দেশ ছিল, ‘স্থানীয়ভাবে চাঁদ না দেখে রোজা ও ইফতার নয়’—এই মূলনীতির অনুসরণ করা। সুতরাং ইবনে আব্বাস (রা.)-এর মাজহাব হলো, রোজা ও ঈদ পালনের জন্য নিজ নিজ এলাকায় উদিত চাঁদের ওপর নির্ভর করা। এ বিষয়ে অন্য কোনো সাহাবি তাঁর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করার প্রমাণও খুঁজে পাওয়া যায় না। সাহাবায়ে কেরাম থেকে নিয়ে সুদীর্ঘ ১৩০০ বছর ধরে চলে আসা চাঁদের প্রচলিত বিধানকে আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় চ্যালেঞ্জ করা শুধু অজ্ঞতাই নয়, ধৃষ্টতাও? বর্তমানে যাঁরা সারা বিশ্বে একই দিনে ঈদ উদ্‌যাপনের পক্ষে কাজ করছেন, তারা কি বলতে চান যে এই সুদীর্ঘকাল মুসলমানরা সঠিক সময়ে রোজা ও ঈদ পালনে ব্যর্থ হয়েছে? নিজের মতামত অন্যের ওপর চাপানোর জন্য সবাইকে অজ্ঞ ভাবা সুস্থ মানুষের কাজ নয়।

একই দিনে ঈদতত্ত্ব অবৈজ্ঞানিক মতবাদ

যদি পৃথিবীতে চাঁদের দেখা মিললেই রোজা ও ঈদ শুরু করতে হয়, তাহলে চাঁদের সর্বপশ্চিমের উদয়স্থল আমেরিকার আলাস্কা অঙ্গরাজ্যকে মানদণ্ড ধরে রোজা ও ঈদ পালন করা উচিত। কারণ সেখানেই চাঁদ প্রথম দৃশ্যমান হয়। ইসলামী শরিয়তে এমন কোনো ইঙ্গিত কি আছে যে সৌদি আরবের চাঁদই সারা বিশ্বের জন্য মানদণ্ড হবে? পাশাপাশি এটি বিজ্ঞানসম্মত নয়। কেননা প্রথম দৃশ্যমান চাঁদ অনুযায়ী সর্বত্র রোজা ও ঈদ পালন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। যেমন—আমেরিকায় চাঁদ উঠেছে কি না, তা জানতে বাংলাদেশের মুসলমানদের অপেক্ষা করতে হবে অন্তত ১২ ঘণ্টা। অর্থাৎ পরদিন ভোর ৬টায় জানা যাবে চাঁদের খবর। নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে আমেরিকার আলাস্কা অঙ্গরাজ্যের সময়ের পার্থক্য প্রায় ২৪ ঘণ্টা। তাহলে আমেরিকার চাঁদ ওঠার খবর নিউজিল্যান্ডবাসী জানতে পারবে পরদিন রাতে। তাহলে তাদের ওই দিনের রোজার উপায় কী!

আসলে যতটুকু অঞ্চলজুড়ে একই দিনে চাঁদ দেখা সম্ভব, ঠিক ততটুকু অঞ্চলের মানুষের মধ্যেই চাঁদ দেখার বিধান সীমাবদ্ধ থাকবে—এটিই শরিয়তের বিধান। সুতরাং সারা পৃথিবীতে একযোগে রোজা পালন ও ঈদ উদ্‌যাপন করার মতাদর্শ কোরআন-সুন্নাহবিরোধী, কাল্পনিক, অবাস্তব ও অবৈজ্ঞানিক।

১৪৬১ সালে সৌদি আরবে সারা বিশ্বের মাজহাবের ওলামায়ে কেরাম বসেছিলেন। ওই বৈঠকে একই দিনে সারা বিশ্বে রোজা করা বা ঈদ করা সম্ভব নয় বলে তাঁরা ফতোয়া দিয়েছেন। গত ১১ অক্টোবর ২০১৪ ময়মনসিংহে এ বিষয়ে একটি বাহাস (বিতর্ক) অনুষ্ঠান হয়। সেখানেও চাঁদ দেখে রোজা ও ঈদ রাখার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়—ওই বিতর্কে সবাই এ মর্মে একমত হন যে সারা বিশ্বে একই দিনে রোজা বা ঈদ করা সম্ভব নয়। (দৈনিক ইনকিলাব : ১২ অক্টোবর ২০১৪)

 

শেয়ার করুন

Leave a Comment