স্বাধীনতা সুরক্ষায় করনীয়

মহান আল্লাহ একমাত্র মানুষকেই স্বাধীন সত্তা হিসেবে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। আর তার স্বাধীন বিচরণ ক্ষেত্র হিসেবে সৃষ্টি করেছেন বিশাল পৃথিবী। পরাধীনতা মানব জীবনের সবচেয়ে বড় বঞ্চনার নাম। স্বাধীনতা ছাড়া ইসলাম প্রতিষ্ঠা ও পালন কোনোটাই যথার্থভাবে সম্ভব নয়। সে কারনেই হজরত মুসা (আ.) জন্মভূমি মিশর ছেড়ে একটি স্বাধীন ভূখন্ডের অনুসন্ধানে নীল দরিয়া পাড়ি দিয়েছিলেন। হজরত মুহাম্মদ (সা.) প্রীয় মাতৃভূমি মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় গিয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।
আমরা মূলত দুইবার স্বাধীন হয়েছি, একবার ১৯৪৭ সালে বৃটিশদের থেকে। এরপর যখন পাকিস্তানীদের দ্বারা আবার বঞ্চনার স্বীকার হলাম, ১৯৭১ সালে মাত্র নয় মাস যুদ্ধ করে পেয়েছি পূর্ণাঙ্গভাবে চুড়ান্ত স্বাধীনতা। অথচ পৃথিবীতে এমন অনেক জাতি আছে যারা যুগের পর যুগ যুদ্ধ করে পরাধিনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হতে পরছেনা। মানুষের কোন প্রচেষ্টাই সফলতার মুখ দেখেনা যতক্ষণনা আল্লাহর ইচ্ছা তার সাথে সংযুক্ত হয়। অতএব আমি যদি বুদ্ধিমান হয়ে থাকি তাহলে বিজয় বা স্বাধীনতা এই ধরণের নেয়ামতের ক্ষেত্রে আমাদের স্বতুস্ফূর্ত উচ্চারণ হবে এগুলো আল্লাহরই দান।
মূসা (আ.)-এর বিজয়ের ইতিহাস প্রসংগে কোরানে ইরশাদ হয়েছে, ‘যখন মূসা স্বজাতিকে বললেনঃ তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ কর যখন তিনি তোমাদেরকে ফেরাউনের সম্প্রদায়ের কবল থেকে মুক্তি দেন। তারা তোমাদেরকে অত্যন্ত নিকৃষ্ট ধরনের শাস্তি দিত, তোমাদের ছেলেদেরকে হত্যা করত এবং তোমাদের মেয়েদেরকে জীবিত রাখত। এবং এতে তোমাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে বিরাট পরীক্ষা হয়েছিল। যখন তোমাদের পালনকর্তা ঘোষণা করলেন যে, যদি কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর, তবে তোমাদেরকে আরও দেব এবং যদি অকৃতজ্ঞ হও তবে নিশ্চয়ই আমার শাস্তি হবে কঠোর।’ (সূরা ইবরাহিম : ৬-৭)

এখানে মুক্তি ও বিজয় লাভের পর হযরত মূসা (আ.) স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে যে এ বিজয় বা মুক্তি মহান আল্লাহর দান এবং এর জন্য উচিৎ তার প্রতি কৃতজ্ঞতা আদায় করা। অন্যথায় এ স্বাধিনতা দীর্ঘস্থায়ী হবেনা বরং পরাধিনতার শাস্তি অবধারিত। আর এ জন্য হযরত মূসা (আ.) বিজয় দিবসে কৃতজ্ঞতা স্বরূপ রোজা পালন করে ছিলেন।
আবার হযরত মুহাম্মাদ (সা.) মক্কা বিজয়ের শুকরিয়া আদায় করেছেন ৮ রাকাত নামায আদায়ের মাধ্যমে। এবং মক্কা বিজয়ের ঐতিহাসিক ভাষণে তার অভিব্যক্তি ছিল এমন, ‘সকল প্রশংসা মহান আল্লাহর যিনি তার প্রতিশ্রুতিকে (বিজয়) সত্যে পরিণত করেছেন এবং আপন বান্দাকে বিজয়ী করেছেন। এবং একাই শত্রু পক্ষকে পরাজিত করেছেন।’ (বুখারী : ১৭০৩)। এখানে নিজেদের পরিকল্পনাকে নয় নিজেদের বাহিনীকেও নয় বরং তিনি পুরো কৃতিত্ব দিচ্ছেন মহান আল্লাহকে।
বিজয়ের দিনে ইসলামের শিক্ষা হল বিনীত হওয়া, উদ্ধত না হওয়া, অহংকারী না হওয়া, জালিম না হওয়া এবং আচারণে সীমালংঘনকারী না হওয়া। বিজয়ের দিনে ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও প্রতিশোধ না নেওয়া এবং সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা। মক্কা বিজয়ের পর রাসূল (সা.) তাই করেছিলেন।
মক্কা বিজয় হল। আবু জাহেল নিহত হয়েছে বদর যুদ্ধে। তার ছেলে ইকরামা বিন আবি জাহল সে জীবনের ভয়ে পালিয়ে বেরাচ্ছে। তার স্ত্রী এসে রাসূল (সা.)-এর কাছে এসে মুসলমান হয়ে নিজের স্বামি ইকরামার জন্য নিরাপত্তা চাইলেন। রাসূল (সা.) তাকে পূর্ণ নিরাপত্তার আশ্বাস দিলেন। ইকরামা খবর পেয়ে রাসূলের দরবারে আসতেছেন। এদিকে রাসূল (সা.) ইকরামার আগমনের কথা টের পেয়ে উপস্থিত সাহাবাদেরে উদ্দেশ্যে বল্লেন, ‘ইকরামা আসতেছে মুসলমান হবার জন্য। তোমরা তার পিতা কে গালি দিবে না। মৃত ব্যক্তিকে গালি দিলে তা তাদের জীবিত স্বজরা কষ্ট পায়। অথচ মৃত ব্যক্তির কাছে গালিটা পৌঁছেনা।’ (কানযুল আমল : ৩৩৬২৫)।
মানুষের জীবনের যত সফলতা আসে তা সবই আল্লাহ তায়ালার দান। অথচ বিপদ কেটে গেলেই মানুষ তা বেমালুম ভুলে যায়। ইরশাদ হচ্ছে, ‘মানুষকে যখন দুঃখ-কষ্ট স্পর্শ করে, তখন সে আমাকে ডাকতে শুরু করে, এরপর আমি যখন তাকে আমার পক্ষ থেকে নেয়ামত দান করি, তখন সে বলে, এটা তো আমি পূর্বের জানা মতেই প্রাপ্ত হয়েছি। অথচ এটা এক পরীক্ষা, কিন্তু তাদের অধিকাংশই বোঝে না।’ (সূরা যুমার : ৪৯)।
বিপদে পড়লে মানুষ কায়মনো বাক্যে আল্লাহ পাককে ডাকে কিন্তু বিপদ কেটে যাবার পর সে নিজের কৌশল নিজের মেধা, নিজের শক্তি-সামর্থ, নিজের দল, নিজের জন সমর্থনকে বড় করে দেখে। এখন এই সুখের উপকরণটাই যেন আল্লাহ ও বান্দার মাঝে এক ধরনের প্রচীর তুলে দেয়। এখানে আল্লাহর কোন অনুগ্রহ বা সাহয্য সে খুজে পায়না। যদি মানুষেরা স্বাধীনতা লাভের পরে আল্লাহ পাককে ভুলে যায়, তার হুকুম পালনে অনিহা প্রকাশ করে; তাহলে বাহ্যিক স্বাধীনতা থাকলেও জান-মালের কোন নিরাপত্তা থাকবেনা। মহামারী, দুভিক্ষ ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় তাদের পিছু ছাড়বে না। একথাই যেন ধ্বনিত হয়েছে নিম্নোক্ত আয়াতে, ‘আল্লাহ দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন একটি জনপদের, যা ছিল নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত, তথায় প্রত্যেক জায়গা থেকে আসত প্রচুর জীবনোপকরণ। অতঃপর তারা আল্লাহর নেয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল। তখন আল্লাহ তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের কারণে স্বাদ আস্বাদন করালেন, ক্ষুধা ও ভীতির।’ (সূরা নাহল : ১১২)।

 

শেয়ার করুন

Leave a Comment