গৃহকর্মীদের প্রতি সদয় হোন

মানুষ পরস্পরের উপর নির্ভরশীল একটি সামাজিক জীব। সমাজবদ্ধ হয়ে বাস করলেও সামাজিক অবস্থান সবার একই রূপ নয়। কেউ ধনী, কেউ গরীব, কেউ উঁচু বংশের, কেউ নীচু বংশের, কেউ দক্ষ, কেউ অদক্ষ। আবার এক একজন এক এক বিষয়ে পারদর্শী। ফলে বিভিন্ন পেশায় তারা নিয়োজিত। ইসলাম সকল বৈধ পেশাকে উৎসাহিত করে এবং সকল পেশার মানুষকে সমান সম্মান করে। সম্পদ, বংশ ও পেশার কারণে মানুষের মর্যাদা নিরূপিত হয় না। মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা নিরূপিত হয় নৈতিকতা, নিষ্ঠা ও তাক্বওয়ার ভিত্তিতে (সুরা হুজুরাত: ১৩)। কাজেই যে কোন পেশার লোক সম্মানের পাত্র। সমাজ জীবনে তথা দৈনন্দিন জীবনে আমরা বিভিন্ন পেশার মানুষের মুখাপেক্ষী হই। তাই প্রত্যেক পেশাজীবির অধিকারের প্রতি আমাদের সমান যত্নবান হওয়া এবং সমান সম্মান প্রদর্শন করা উচিৎ। হোক সে দিনমজুর, হোক সে গৃহকর্মী। এখনতো গৃহকর্মীদের মানুষই মনে করা হয়না। সাপ্তাহিক কোন ছুটি নেই তাদের। তাদের ঘুমের জায়গা হল রান্নাঘরের মেঝেতে; এমনকি স্টোররুমেও রাত কাটায় অনেকে। লিফট ব্যবহার তাদের জন্য নিষিদ্ধ। তাদের জন্য আলাদা রান্না হয়। পর্যাপ্ত খাবার সরবারহ করা হয়না। ফার্নিচারে বসার অনুমতি নেই তাদের। বাচ্চা বসে সোফায়, বুয়া বসে মেঝেতে। পরিবারের সদস্যরা যেভাবে এই গৃহকর্মীদের সঙ্গে ব্যবহার করে তা দেখেই বাচ্চারা শিখে কিভাবে এদের সঙ্গে ব্যবহার করতে হয়। বাচ্চারাও গৃহকর্মীদেরকে নাম ধরে ডাকে এবং তুমি বা তুই বলে সম্বোধন করে। মূলত বয়ষ্ক কাজের লোক আথবা কর্মচারীকে নাম ধরে ডাকা ও তাদের তুই তুকারি বলার মাঝে কোন গ্রাভিটি নেই বরং এটা চরম অভদ্রতা, এক ধরনের অসভ্যতাও বটে৷ পরিবার ও কোন কোন প্রতিষ্ঠান শুরু থেকেই অন্যের প্রতি অবজ্ঞা ও অসম্মানবোধের জন্ম দেয় তাদের সদস্যদের মাঝে। যার পরিণতি আজ আমাদের সামনে স্পষ্ট। আজ আমরা মিডিয়ার কল্যানে জানতে পারছি নারী শিশু ও গৃহকর্মীদের উপর নিষ্ঠুর নির্মম নির্যাতনের কথা। নির্যাতনকারীদের তালিকায় রয়েছে প্রায় সব শ্রেণী পেশার মানুষ। রয়েছে আমলা, বিচারপতি, ও বড় বড় প্রভাবশালীরা। রয়েছে জাতীয় দলের নামী দামী খেলোয়ারাও।
অথচ রাসূলুল্লাহ (সা:) শ্রমিক ও কাজের লোকের সঙ্গে সম্মান জনক ব্যবহার করতেন।তাদের সঙ্গে আহার গ্রহণ করতেন। তাদের বোঝা লাঘবে সরাসরি সহযোগিতা করতেন। রাসূল (সা:) এর সামনে হযরত আবু যর (রা:) তার গোলামকে কটু কথা বল্লেন এবং তার মায়ের ব্যাপারেও কুটক্তি করলেন৷ এটা দেখে রাসূলে আকরাম (সা:) আবু যর (রা:) কে কঠোর ভাবে হুশিয়ার করলেন৷ বল্লেন তোমার মধ্যে এখনো জাহিলিয়াত রয়েছে৷ এই লোকগুলি তোমাদের ভাই৷ আল্লাহ তাদেরকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন৷ অতএব যে ব্যক্তিদের অধীনে তার ভাই রেয়েছে তারা যা খাবে অধিনস্তদের তাই খাওয়াবে এবং তারা যেই মানের পোশাক পরিধান করবে অধিনস্তদের সেই মানের পোশাক পরিধান করাবে। সাধ্যাতীত কাজের জন্য তাকে বাধ্য করা যাবে না। আর কাজ যদি তাকে দিয়েই করাতে হয় তবে মালিক তাকে সাহায্য করবে (সহীহ বুখারী, ৩০)।
শ্রমিকদের সঙ্গে কখনোই কঠোর ব্যবহার করেণনি। শ্রমিকদের সঙ্গে তার ব্যবহার কেমন ছিল তা হযরত আনাস (রা) এর মন্তব্য থেকে বোঝা যায়। আনাস (রা) বলেন: আমি সুদীর্ঘ দশ বছর রাসূলে আকরাম (সা) এর খেদমতে নিয়োজিত থেকেছি। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ে তিনি কখনো আমার প্রতি এতটুকু উহ শব্দও উচ্চারণ করেননি; কিংবা আমার কোন কাজের জন্যে বলেননি যে “কেন তুমি এটা করলে?“ অথবা কোনো কর্তব্য পালন না করে থাকলেও বলেননি: “কেন তুমি এটা করনি?“ (সহীহ বুখারী, ৫৬৯১)
আজ নারী, শিশু ও গৃহকর্মীরা চরম নির্যাতিত ও নিগৃহিত। তাদের উপর পরিচালিত বরবরতা ও নিষ্ঠুরতা অবর্ণনীয়। ইসলাম সবসময় মানুষকে দয়া ও উদারতার শিক্ষা দেয়। রাসূল (সা:) এরশাদ করেছেন, তোমরা দুনিয়াবাসীদের উপর দয়া কর আসমানের বাসিন্দা তোমাদের উপর দয়া করবেন।(জামে তিরমিযী, ১৯২৪)
কোনধরণের জুলুম নির্যাতনকে ইসলাম কখনোই প্রশ্রয় দেয়নি।আল্লাহ তাআলা কোনো মানুষের প্রতি জুলুম করেন না; বরং তিনি কোনো প্রকার জুলুম প্রত্যাশাও করেন না। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, আর আল্লাহ বান্দাদের উপর কোন যুলম করতে চান না। (সূরা আল-মুমিন: ৩১)
আমাদের নিজেদের স্বার্থেই সকল জুলুমবাজ নির্যতনকরীদের কঠোর ও দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি নিশ্চিৎ করা জরুরী যাতে আর কোন কুলাংগার কারো উপর নির্যতন চালাতে সাহস না পায়৷ অন্যথায় আল্লাহ তায়ালার গজব আমাদের জন্য অবধারিত।কেননা পূর্ববর্তী জাতিগুলো কেবল তাদের জুলুম ও অত্যাচারী আচরণের কারণেই ধ্বংস হয়েছে। যেমন আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, “আর অবশ্যই আমি তোমাদের পূর্বে বহু প্রজন্মকে ধ্বংস করেছি, যখন তারা যুলম করেছে। (সূরা ইউনুস : ১৩)
নারী, শিশু ও গৃহকর্মী নির্যাতন বন্ধে পারিবারিক ভাবেও শিশু কিশোরদের মাঝে নৈতিক মূল্যবোধ তৈরী করা প্রয়োজন৷ যাতে নতুন প্রজন্মের হাতে অন্তত নারী, শিশু ও গৃহকর্মীরা নিরাপদ থাকে৷ নৈতিক মুল্যবোধ ছাড়া নারী, শিশু ও গৃহকর্মীদের সুরক্ষা সম্ভব নয়৷ এক্ষেত্রে পারিবারিক শিক্ষাটা খুবই গুরুত্বপুর্ণ৷ কারন পরিসংক্ষাণে দেখা গিয়েছে যে যেই সকল শিশুরা তাদের পরিবারে নারী নির্যাতন ও গৃহকর্মী নির্যাতন হতে দেখেছে তাদের ৮০% শিশুরাই বড় হয়ে এ জাতীয় নির্যাতনে অংশ নেয়৷
তাইতো রাসূল (সা:) অন্তিম মুহূর্তেও শ্রমিকদের ও অধীনস্থদের প্রতি তাঁর সহমর্মিতা প্রকাশ করতে ভুলেননি। তিনি বলেছেন, “তোমরা সব সময় তোমাদের নামাজের প্রতি দৃষ্টি রাখবে ও তোমাদের অধীনস্থদের প্রতি সহমর্মিতা ও সহনশীলতা বজায় রাখবে“।

শেয়ার করুন

Leave a Comment