হজের বিধিবিধান

হজের মধ্যে রয়েছে দৈহিক, আর্থিক ও আধ্যাত্মিক বন্দেগীর সম্মেলিত প্রয়াস। ইবাদতের এমন বিশালত্ব, ত্যাগ ও আনুগত্বের দৃষ্টান্ত হজ ছাড়া অন্য কোনো ইবাদতে নেই। এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় জমায়েত ও মহা সম্মেলন। বিশ্বের সব মুসলমান যে পরস্পর ভাই ভাই, ভাষা, অঞ্চল ও বর্ণের কারণে তাদের মধ্যে নেই কোনো ভেদাভেদ, হজ তার বাস্তব নমুনা। এখানে নেই কোন বর্ণবৈষম্য বা বর্ণবাদী কার্জকালাপও। হজ ইসলামের পঞ্চ স্থম্ভের একটি। হজের বিধান অস্বিকার করলে কাফির হয়ে যায়। হজ পালন না করলে ফাসিক বলে গন্য হয়। হজ পালনে গাফিলদের জন্য রয়েছে কঠিন হুশিয়ারী, ‘যে ব্যক্তি হজ করার সামর্থ্য রাখে, কেন প্রতিবন্ধকতা যেমন জালিম শাসক ও দুরারোগ্য ব্যাধি না থাকা সত্তেও হজ করে না সে ইহুদি হয়ে মৃত্যুবরণ করল কি খ্রিস্টান হয়ে তার কোনো পরোয়া আল্লাহর নেই।’ (মুসনাদুল জামে : ৫২৫৭)।
হজের বিধান
হজ একটি কঠিন ইবাদাত যা সকলের পক্ষে পালন করা সম্ভব নয়, তাই শারিরীক ও অর্থনৈতিক ভাবে সক্ষম ও সামর্থবানদের প্রতিই হজের বিধানকে ফরজ করা হয়েছে। কোরআন মজিদে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর এ ঘরের হজের বিধান মানুষের উপর আল্লাহর প্রাপ্য; যে লোকের সামর্থ রয়েছে এ পর্যন্ত পৌছার।’ (সূরা আলে ইমরান : ৯৭)।
হজের ইহরাম
হজের মূল কার্যক্রম শুরু হয় সেলাইযুক্ত কাপড়, টুপি ইত্যাদি খুলে সাদা দুই টুকরো কাপড় পরিধান করে দুই রাকাত নামাজ আদায়ের পর হজ বা ওমরার নিয়ত করে তালবিয়া (লাব্বাইকাল্লা-হুম্মা লাব্বাইকা, লাব্বাইকা লা শারীকা লাকা লাব্বাইক। ইন্নাল-হামদা ওয়ান-নি‘মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারীকা লাক) পাঠের মাধ্যমে। হজের এহরাম বাঁধার জন্য রয়েছে নির্দিষ্ট স্থান। যেগুলোকে বলা হয় মিকাত। এই মিকাত অতিক্রমের পূর্বেই ইহরামের কাপড় পরিধান করতে হয়। বাংলাদেশী হাজীদের মিকাত হলো কারনুল মানাযিল। মক্কার হারাম এলাকার ভেতরে অবস্থানরত অবস্থায় এহরাম বাঁধার জন্য হারাম এলাকার বাইরে আয়েশা মসজিদে বা অনুরুপ কোথাও যেতে হয়।
হজের ফরজ সমূহ
১. ইহরাম বাঁধা, ২. আরাফার ময়দানে অবস্থান করা ও ৩. তাওয়াফে জিয়ারত করা।
হজের ওয়াজিব সমূহ
১. সাফা ও মারওয়ার মাঝে সাঈ করা, ২. মুযজদালিফায় নির্দিষ্ট সময় অবস্থান করা, ৩. নির্দিষ্ট দিনে জামারাতে কঙ্কর নিপে করা, ৪. কোরবানি করা, ৫. মাথামুন্ডন করা বা চুল ছোট করা ও ৬. তাওয়াফে বিদা বা বিদায়ী তাওয়াফ করা। (তুহফাতুল ফুকাহা ১/৩৮১)।
ওমরার ফরজ সমূহ
১. ইহরাম বাঁধা, ২. বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করা ও ৩. সাফা ও মারওয়ার মাঝে সাঈ করা। ওমরার ওয়াজিব হচ্ছে মাথামুন্ডন করা বা চুল ছোট করা।
হজের ধারাবাহিক বিধান
হজের প্রথম দিন: মিনায় রওনা হওয়ার উত্তম সময় হলো ৮ জিলহজ সূর্যোদয়ের পর। রওনা হওয়ার আগে দুই রাকাত নামাজ পড়ে নেওয়া সুন্নত। ৮ জিলহজ জোহর থেকে ৯ জিলহজ ফজর পর্যন্ত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মিনাতে পড়া সুন্নত। আর ৮ জিলহজ দিবাগত রাত মিনায় অবস্থান করা সুন্নত।
হজের দ্বিতীয় দিন: ৯ জিলহজের দিনে আরাফায় অবস্থান করা ফরজ আর মুজদালিফায় । সুতরাং ৯ তারিখ সূর্যোদয়ের পর পরই মিনা থেকে আরাফার উদ্দেশে রওনা দেওয়া উত্তম। (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা : ১৪৭৬৬)। এবং আরাফায় উকুফের সময় ৯ জিলহজ সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত। সূর্যাস্তের আগে আরাফা ত্যাগ করা জায়েজ নয়। আরাফার মাঠে মসজিদে নামিরার জামাতে অংশগ্রহণ করতে পারলে জোহর ও আসর একত্রে ইমামের পেছনে আদায় করে নিতে হয়। কিন্তু মসজিদে নামিরার জামাতে অংশগ্রহণ করা সম্ভব না হলে জোহরের সময় জোহর এবং আসরের সময় আসর পড়া উত্তম। (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা : ১৪২৩৫)। ৯ জিলহজ ফজর থেকে ১৩ জিলহজ আসর পর্যন্ত প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর তাকবিরে তাশরিক পড়া সকল মুসলমানদের ও হাজীদের ওপরও ওয়াজিব। ৯ যিলহজ দিবাগত রাতে মুযদালিফায় অবস্থান করা সুন্নত। তাই আরাফার ময়দান থেকে সূর্যাস্তের পর পর মাগরিবের নামাজ না পড়েই মুযদালিফার উদ্দেশে রওনা হতে হয়। মুযদালিফায় একত্রে মাগরিব ও এশার নামাজ এশার ওয়াক্তে মুযদালিফায় গিয়ে একত্রে পড়া ওয়াজিব।
হজের ৩য় দিন: উকুফে মুযদালিফার সময় ১০ জিলহজ সুবহি সাদিক থেকে চারদিক খুব ফর্সা হওয়া পর্যন্ত। (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা : ১৫৫৬৫)। ১০ তারিখ হাজীদের অনেকগুলো বিধান সম্পন্ন করতে হয়। যথা ১. জামরা আকাবার কঙ্কর মারা, ২. কোরবানি করা, ৩. মাথার চুল কাটা, ৪. তাওয়াফে জিয়ারত করা ও ৫. হজের সাঈ করা। হজের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলে মদীনায় রাসূলের রাওজা মোবারক যেয়ারত করা হাজীদের জীবনের এক বড় স্বপ্ন পূরণ। হজের পূর্বে পর্যাপ্ত সময় হাতে থাকলে এ কাজটি আগেও সেরে নেওয়া যেতে পারে।
হজের ৪থ ও ৫ম দিন: ১১ ও ১২ জিলহজ মিনার জামারায় নির্দিষ্ট কঙ্কর নিক্ষেপ করা।
হাজীদের ক্ষমা ও পুরুস্কার:
নবী করীম (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি হজ আদায় করলো এমন অবস্থায় যে, কোন প্রকার কাম, প্রবৃত্তি চর্চা বা গুনাহর কাজে লিপ্ত থাকেনি, সে এমনভাবে হজ শেষে ফেরত আসবে যেমন নবজাতক শিশু মায়ের পেট থেকে নিষ্পাপ অবস্থায় ভূমিষ্ঠ হয়।’ (বুখারি : ১৪৪৯)। আরেকটি হাদীসে তিনি ইরশাদ করেছেন ‘মাবরুর হজের প্রতিদান হচ্ছে একমাত্র জান্নাত।’ (বুখারি : ১৬৮৩)। মূলত: মাবরুর হজ হচ্ছে ঐ হজ, যা আদায় করার সময় হাজী সকল প্রকার গুনাহ বা নিলর্জ্জ কাজ থেকে বিরত থাকে। দুনিয়ার কোন স্বার্থ হসিল ও সুনাম-সুখ্যাতী তার লক্ষ্য থাকে না। সেলফির মত অনর্থক, অহেতুক ও অবান্তর কোন কার্যকালাপেও থাকে না তার অংশগ্রহন। এ ধরনের মাবরুর হজ আদায় করতে পারলেই আল্লাহ তায়ালা হাজীর জীবনের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন এবং তাকে জান্নাতের মহান পুরুস্কারে ভুষিত করবেন।
মালি প্রবাসী

শেয়ার করুন

Leave a Comment