রাসুল (সা.) এর প্রতি ভালবাসা

ইমানের পুর্ব শর্ত হলো রাসূলকে সব কিছু থেকে বেশী মুহাব্বাত করা। রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন ‘ঐ স্বত্তার শপথ যার হাতে আমার জীবন, তোমাদের কেউ ততক্ষণ মোমিন হতে পারবেনা যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার মাত-পিতা, তার ছেলে-মেয়ে এবং সকল মানুষের থেকে অধিক প্রিয় হব। (মুসলিম)। রাসূল (সা.) আরো বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমাকে ভালোবাসল, সে জান্নাতে আমার সঙ্গে অবস্থান করবে।’ (তিরমিজি)।
সাহাবায় কেরাম দেখিয়েছিলেন রাসূল (সা.)-কে কিভাবে ভালবাসতে হয়, আশেকে রাসূল কি ভাবে হতে হয়। হযরত তালহা (রা.) উহুদ যুদ্ধে রাসূল (সা.)-কে পাহাড়া দিতে গিয়ে নিজেকে ঢাল হিসেবে পেশ করে আশির অধিক তীর তার দেহে ধারণ করে নবী প্রেমের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। হযরত খুবাইব (রা.) শূলির উপরে থেকে প্রতিকী অর্থেও তার স্থলে রাসূলকে শুলে চড়ানোর প্রস্তাব প্রত্যাক্ষান করেছিলেন। এবং বলেছিলেন শূলে চড়ানো তো অনেক দূরের কথা, রাসূলের গায়ে একটা ফুলের আচড়ও আমি সহ্য করতে পারবোনা।
রাসূলের প্রতি ভালবাসা প্রকাশে পিছিয়ে নেই বৃক্ষরাজী এবং পশুপাখিও। প্রেম-বিরহে শুধু মানুষ নয় শুকনো খেজুর কাঠও ক্রন্দন করেছিল। ইসলামের শুরুতে মসজিদে নববীতে রাসূল (সা.) খেজুর বৃক্ষের এক শুকনো কান্ডের সাথে দাঁড়িয়ে খোৎবা পেশ করতেন। বিষয়টি সাহাবায়ে কেরামাদের ভাল লাগছিল না। তাঁরা আবেদন করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনার জন্য একটি মিম্বর হলে ভাল হয় না? যাতে আপনি উপবেশন করে খোৎবা পেশ করবেন। হুযুর আবেদন মঞ্জুর করলেন। মিন্বর তৈরি হলে মসজিদে আনা হলো। পরবর্তী জুমাতে রাসূল (সা.) যখন মিম্বরে উপবেশন পূর্বক খোৎবা দিতে আরম্ভ করলেন। খেজুর বৃক্ষের সেই কান্ডের অনুভূতি সৃষ্টি হল, আজ রাসূল তাকে বাদ দিয়ে মিম্বরের শোভা বর্ধন করেছেন। তাই শুকনো কাঠের কান্ডটি শিশুদের ন্যায় ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে ক্রন্দন করতে লাগল। রাসূল (সা.) তার পাশে গেলেন এবং তার উপর নিজের হাত মোবারক বুলিয়ে দিলেন। তৎক্ষনাৎ কান্ডটির কান্না থেমে যায়। (বোখারি)।
জনৈক সাহাবী রাসূল (সা.)-এর খিদমতে এসে আরয করলেন, ইয়া রসূলাল্লাহ! আমাদের কাছে একটি উট আছে, সে কঠোর ভাবে আক্রমণ করে এবং কারো সাধ্য নেই যে, সেটাকে লাগাম পরাবে । এ কথা শুনে নবী করীম (সা.) উটের ঘরের সামনে গিয়ে হাজির হলেন। আর দরজা খোলা মাত্রই নবী করীম (সা.)-কে দেখে দুরন্ত উট মুহূর্তের মধ্যে শান্ত হয়ে গেল আর অবনত মস্তকে এগিয়ে এসে তাঁর চরণ যুগলে সেজদা করল আর মাথা মাটিতে ফেলে রাখল। রাসূল (সা.) নিজ হাত মোবারক উটের মাথার উপর বুলিয়ে দিলেন আর রশি গলায় পরিয়ে মালিকের হাতে সোপর্দ করলেন। (মেশকাত)।
অমুসলিম হয়েও যদি কেউ রাসূল (সা.)-এর প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে, তাকে ভালবাসে তার জন্যও রয়েছে পুরস্কারে ব্যবস্থা। যেমন আবু লাহাব ছিলেন রাসূলের চাচা এবং ইসলামের ঘোরতর শত্রু। তিনি রাসূলের জন্মের সুসংবাদ পেয়েছিলেন তার দাসী সুয়াইবিয়ার মাধ্যমে। এতে তিনি খুশি হয়ে শাহাদাত আঙুল দ্বারা ইংগিত করে সুয়াইবিয়াকে মুক্ত করে দেন। অত:পর আবু লাহাবের মৃত্যুর পর হযরত আব্বাস (রা.) তাকে খুব খারাপ অবস্থায় স্বপ্নে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার সঙ্গে কীরূপ আচরণ করা হচ্ছে? উত্তরে আবু লাহাব বললেন, আমার মৃত্যুর পর শান্তিতে থাকার সুযোগ আমার হয়নি, তবে মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মে খুশি হয়ে আমার দাসী সুয়াইবিয়াকে মুক্ত করার কারণে প্রতি সোমবার শাহাদাত আঙুল থেকে বের হওয়া সুমিষ্ট পানি পান করে আমি একটু স্বস্থি পাই। (বোখারি)।
তবে রাসূল (সা.)-এর প্রতি মোমিনের ভালবাসা হতে হবে কোরান-হাদীসের নির্দেশিত পণ্থায়। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাসতে চাও, তাহলে আমাকে অনুসরণ কর, যাতে আল্লাহও তোমাদিগকে ভালবাসেন এবং তোমাদিগকে তোমাদের পাপ মার্জনা করে দেন।’ (সূরা ইমরান : ৩১)। ‘রসূল তোমাদেরকে যে নির্দেশ দেন, তা গ্রহণ কর এবং যা নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাক।’ (সূরা হাশর : ৭)। এ ব্যাপারে রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে আমার সুন্নতের অনুসরণ করল সে আমাকে ভালবাসল, আর যে আমাকে ভালবাসল সে আমার আমার সাথে জান্নাতে বসবাস করবে।’ (তিরমিজি)। অর্থাৎ রাসূল (সা.)-এর প্রতি ভালবাসার বহি:প্রকাশ ঘটাতে হলে ও আশেকে রাসূল বলে দাবী করতে হলে, তা হতে হবে তার পূর্ণ অনুসরণের মাধ্যমে, তার সুন্নত অনুযায়ী জীবন-যাপনের মাধ্যমে এবং কোরান-হাদীসের সকল হুকুম-আহকাম বাস্তবায়নের মাধ্যমে।
আবার আবেগের আতিশয্যে এবং ভালবাসার নামে দ্বীন ইসলামের মধ্যে নতুন কিছু (বেদাত) প্রচলন করলে তার ফলাফলও হবে ভয়াবহ। এব্যপারে রাসূল (সা.)-এর সতর্ক বানী হলো, ‘কোনো ব্যক্তি যদি আমাদের এই দ্বীনের ভেতর এমন কিছুর সৃষ্টি করে, যা তার অন্তর্ভুক্ত নয়, তবে তা প্রত্যাখ্যাত।’ (বুখারি)। ‘সবচেয়ে নিকৃষ্ট কাজ হলো বিদআত-নতুন কিছু সৃষ্টি করা। আর প্রতিটি বিদআত হলো ভ্রষ্টতা।’ (মুসলিম)।
আশেকে রাসূল হওয়ার জন্য দেয়াল লিখন, ব্যানার, সাইনবোর্ড ইত্যাদীর দরকার হয়না বরং সুন্নতের অনুসারী হতে হয়। রাসূলের অনুসরণ-অনুকরণ ছাড়া আশেকে রাসূল হওয়ার দাবী করলে তাতে আর যাই হোক নজাত মিলবেনা। হযরত আবু তালিব ছিলেন একজন বড় মাপের আশেকে রাসূল। কিন্তু তার এশক বা ভালবাসাটা কোরান-হাদীস মোতাবেক না হওয়ায় তিনিও নাজাত পাননি।

 

শেয়ার করুন

Leave a Comment