ইসলামে মাজহাব মানার বিধান

হযরত রাসূল সা: বিদায় হজ্জের দিকনির্দেশনা মূলক ভাষণে বলেছেন: “আমি তোমাদের জন্য দুটি বস্তু রেখ গেলাম। তোমরা যতদিন এ দুটি আকড়ে থাকবে, ততদিন পথভ্রষ্ট হবে না। একটি আল্লাহর কিতাব ও অপরটি রাসূল সা: এর হাদীস।” এখন প্রশ্ন হল, কুরআন-হাদীস থাকতে মাযহাব কেন অনুসরণ করব? আমাদের জানা দরকার যে, মাযহাব কি এবং মাযহাবকে কুরআন-হাদীস সমর্থন করে কিনা?
কুরআন-হাদীসে যে সকল জটিল ও অস্পষ্ট বিধান রয়েছে সেগুলো চিন্তা ও গবেষণার মাধ্যমে সমাধানকারী দলটির নাম মুজতাহিদ। যারা ইজতিহাদের মাধ্যমে বিভিন্ন মূলনীতির আলোকে কুরআন-হাদীসের কিছু পরস্পরবিরধী মাসআলার মাঝে সমন্বয় সাধন করেছেন। নতুন উদ্ভূত সমাস্যার শরয়ী মূলনীতির আলোকে সমাধান বের করেছেন। আর তাদের উদ্ভাবিত মূলনীতির আলোকে বের হওয়া মাসআলার নাম মাযহাব। সুতরাং মাযহাব কোন নতুন ধর্ম, মতবাদ বা কোরআন সুন্নাহ বহির্ভূত ব্যক্তি বিশেষের নিজস্ব মতের নাম নয়, বরং মাযহাব হল কোরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কেয়াসের ভিত্তিতে বিভিন্ন শরয়ী সমস্যার সমাধান এবং কোরআন-হাদীসের জটিল ও অস্পষ্ট বিধান সমূহের ব্যাখ্যা।
মূলত কুরআন-হাদীসের পাশাপাশি ইজতিহাদের উৎপত্তি রাসূল (সা:) এর যুগে এবং তার প্রত্ত্বক্ষ তত্ত্বাবধনেই হয়েছে। রাসূল (সা:) যখন মুয়াজ বিন জাবাল (রা:) কে ইয়ামানে পাঠাতে মনস্ত করলেন তখন মুয়াজ (রা:) কে জিজ্ঞেস করলেন: “যখন তোমার কাছে বিচারের ভার ন্যস্ত হবে তখন তুমি কিভাবে ফায়সাল করবে? তখন তিনি বললেন, আমি ফায়সালা করব কিতাবুল্লাহ দ্বারা। রাসূল (সা:) বললেন, যদি কিতাবুল্লার মাঝে না পাও? তিনি বললেন, তাহলে রাসূলুল্লাহ (সা:) এর সুন্নাত দ্বারা ফায়সালা করব। রাসূল (সা:) বললেন, যদি রাসূলুল্লাহ এর সুন্নাতে না পাও? তখন তিনি বললেন, তাহলে আমি ইজতিহাদ তথা উদ্ভাবন করার চেষ্টা করব। তখন রাসূল (সা:) তাঁর বুকে চাপড় মেরে বললেন, যাবতীয় প্রশংসা ঐ আল্লাহর যিনি তাঁর রাসূলের প্রতিনিধিকে সেই তাওফিক দিয়েছেন যে ব্যাপারে তাঁর রাসূল সন্তুষ্ট।” ( আবু দাউদ : ৩৫৯৪)
আর মাযহাব তথা মুজতাহিদদের গবেষনালব্ধ মাসআলা অনুসরণের জন্য কুরআন জোর তাগিদ দিয়েছে। “অতএব তোমরা যদি না জান তবে যারা জ্ঞানী তাদেরকে জিজ্ঞেস কর।” সূরা আম্বিয়া) : ৭)
মাযহাবের রয়েছে বিভিন্ন স্তর। যাদের ইজতেহাদ করার ক্ষমতা আছে তাদের জন্য অন্য কারো মাযহাব অনুসরণ করার প্রয়োজন নেই। আর যাদের ইজতেহাদ করার ক্ষমতা নেই তাদের জন্যই মাযহাব বা তাকলীদ।
সাহাবাদের মাঝেও একদল ছিলেন মুজতাহিদ, আর বিশাল এক জামাত ছিলেন যারা ইজতিহাদের ক্ষমতা রাখতেন না। তারা মুজতাহিদদের অনুসরণ করতেন। যেমন ইয়ামেনের লোকজন মুয়াজ (রা:) কে অনুসরণ করতেন। তেমনি তাবেয়ীদের একই অবস্থা ছিল। একদল মুজতাহিদ, আরেকদল মুকাল্লিদ তথা অনুসারী। মুহাদ্দিসীনদের মাঝেও দুই দল ছিলেন, একদল ছিলেন যারা ইজতিহাদের ক্ষমতা রাখতেন, আরেকদল ছিলেন যারা ইজতিহাদের ক্ষমতা রাখতেন না। কেউ কেউ নিজেই মাসআলা বের করেছেন, কেউ কেউ অন্য কোন ইমামের অনুসরণ করেছেন। যেমন ইমাম বুখারী (রহ:) মুজতাহিদ ছিলেন, তাই তার কারো অনুসরণের দরকার হয়নি। তবে কেউ কেই তাকে শাফেয়ী মাযহাবী বলে মত ব্যক্ত করেছেন। ( তাবাকাতুশ শাফেয়িয়্যাহ :২/২) এমনিভাবে ইমাম মুসলিম (রহ:) ছিলেন শাফেয়ী মাযহাবের অনুসারী। (আল হিত্তাহ : ১৮৬)
একটি মাযহাবই কি মানতে হবে?
একাধিক মাযহাব অনুসরণের অনুমোদন থাকলে সবাই নিজের রিপু পূজারী হয়ে যেত। যেই বিধান যখন ইচ্ছে পালন করত, যেই বিধান যখন ইচ্ছে ছেড়ে দিত। এর মাধ্যমে মূলত দ্বীন পালন হতনা, বরং নিজের প্রবৃত্তির পূজা হত। তাই চতুর্থ শতাব্দীর উলামায়ে কিরাম একটি মাযহাবের অনুসরণকে বাধ্যতামূলক বলে এই প্রবৃত্তি পূজার পথকে বন্ধ করে দিয়েছেন। যা সেই যুগের ওলামায়ে কিরামের সর্বসম্মত সীদ্ধান্ত ছিল। আর একবার উম্মতের মাঝে ইজমা হয়ে গেলে তা পরবর্তীদের মানা আবশ্যক হয়ে যায়। হিজরি চতুর্থ শতাব্দীর পর শুধুমাত্র হানাফী, মালিকী, শাফিয়ী ও হাম্বলী উক্ত চার মাযহাবেই তাক্বলীদ বা অনুসরন সীমাবদ্ধ হয়েছে। কেননা, চার মাযহাব ছাড়া অন্যান্য মুজতাহিদদের মাযহাব তেমন সংরক্ষিত হয়নি। ফলে আস্তে আস্তে সেসব মাযহাব বিলুপ্ত হয়ে পড়ে। (আহসানুল ফতোয়া: ১/৪৪১)
ইজমাকেও রাসূল (সা:) সুপ্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। “নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতকে কোন ধরণের ভ্রষ্টতায় ঐক্যবদ্ধ করবেন না। আল্লাহর কুদরতী হাত রয়েছে মুসলমানদের জামাআতের উপর। যারা মুসলমানদের পথের বিপরীত রাস্তা গ্রহণ করবে তারা জাহান্নামে যাবে।” (তিরমিযী : ৪০৫)
এপ্রসংগে ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ:) বলেছেন: “মুসলিম উম্মাহর “ইজমা” উপেক্ষা করে মায্হাব চতুষ্টয়ের বিপরীতে কোন মায্হাব রচনা বা গ্রহণ বৈধ হবে না।” (ফাত্ওয়া ইবনে তাইমিয়া: ২/৪৪৬)
আল্লামা ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী মক্কী (রহ:) বলেছেন: “আমাদের যুগের বিশেষজ্ঞদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আবু হানীফা, শাফেয়ী, মালেক ও আহমদ বিন হাম্বল এ চার ইমাম ব্যতীত অন্য কারও অনুসরণ জায়িয নয়।” (ফাত্হুল মুবীন : ১৯৬)
সুতরাং মাযহাব মানার অর্থই হল কোরআন-হাদীস মানা। ইমামদের দেখান মূলনীতি অনুযায়ী কোরআন-হাদীসের উপর আমল করাই মাযহাব মানার উদ্দেশ্য। এমন নয় যে, ইমামগণ একেকটা নতুন নিয়ম-কানুন দাড় করিয়েছেন আর সে গুলোর অনুসরণ করা হয়। বরং সঠিক ভাবে ইসলাম মানার জন্যই তাদের মাতামত গুলো কে সহায়ক হিসেবে নেয়া হয়।

শেয়ার করুন

Leave a Comment