প্রযুক্তি হোক ইসলাম প্রচারের হাতিয়ার

মানব জাতির শ্রেষ্ঠত্ব নির্ভর করে দাওয়াতের কাজে অংশ গ্রহনের উপর। ইরশাদ হচ্ছে, ‘তোমরাই হলে সর্বোত্তম জাতি, মানবজাতির কল্যানের জন্যেই তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দান করবে ও অন্যায় কাজে বাধা দেবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে।’ (সূরা ইমরান : ১১০)।
আধুনিক যুগে দাওয়াতী কাজ করতে হলে একজন দাঈ বা ইসলাম প্রচারককে যুগোপযোগী দাওয়াতী পরিকল্পনা গ্রহণ করে তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। আল্লাহ তায়ালা চান যেন যুগের চাহিদা অনুযায়ী সুকৌশলে মানুষকে তার পথে দাওয়াত দেওয়া হয়। এজন্য তিনি নবী-রাসূলগণকে যুগ চ্যালেঞ্জ সক্ষম জ্ঞান-বিজ্ঞানে পারদর্শী ও প্রজ্ঞাসম্পন্ন করে প্রেরণ করেছিলেন। আল্লাহ তায়ালা যখনই কোন জাতির কাছে নবী পাঠিয়েছেন, তিনি তাঁকে তাদের যুগোপযোগী করে, তাদের ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছেন। যেন তাদের আচার-আচরণ, কথাবার্তা, সামাজিক প্রথা, ঐতিহ্য অনুধাবন ও মূল্যায়ন করে তাদেরকে দ্বীনের প্রতি দাওয়াত দিতে সক্ষম হন। এই ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘আমি প্রত্যেক পয়গম্বরকেই তাদের স্বজাতির ভাষাভাষী করেই প্রেরণ করেছি, যাতে তাদেরকে পরিষ্কার বুঝাতে পারে।’ (সূরা ইবরাহীম : ৪)।
যুগের চাহিদাকে অবজ্ঞা বা অস্বিকার করা ইসলামের শিক্ষা নয়। এই যেমন যুগের চাহিদায় সাড়া দিয়ে প্রিয়জনের কাছে থাকতে আমরা ঠিকই মোবাইল ব্যবহার করছি, এর সুবিধা ভোগ করছি; এক্ষেত্রে কারো অনিহা নেই। তবে দাওয়াতী কাজে প্রযুক্তি বা ইন্টারনেট ব্যবহারে অনেকের রয়েছে যত আপত্তি। ইন্টারনেটে আপত্তিজনক অনেক কিছু থাকলেও এর ব্যবহারকারী বিপুল জনগোষ্ঠিকে দাওয়াতের আওতায় আনাটা কি এখন সময়ের দাবী নয়? অশ্লীলতার আবর্তে হারিয়ে যাওয়া জনগোষ্ঠিকে আপত্তিকর অবস্থান থেকে উদ্ধার কল্পে একটি বিশেষ দলের প্রয়োজনীতা ও তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে কুরআনে হাকিমের দিক নির্দেশনা হল, ‘আর তোমাদের মধ্যে এমন একটা দল থাকা উচিত যারা আহবান জানাবে সৎকর্মের প্রতি, নির্দেশ দেবে ভাল কাজের এবং বারণ করবে অন্যায় কাজ থেকে, আর তারাই হলো সফলকাম।’ (সূরা ইমরান : ১০৪)।
দাওয়াত কখন কি পদ্ধতি হবে তাও পরিস্থিতির আলোকে হিকমত দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। দাওয়াতের পদ্ধতি বা মাধ্যমকে যুগোপযোগী করাও ইসলামের একটি মূলনীতি। দাওয়াতের পদ্ধতি সম্পর্কে মহান আল্লাহর বানী, ‘তুমি মানুষকে আপন প্রতিপালকের পথে ডাক, কৌশল ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে এবং তাদের সঙ্গে আলোচনা কর উত্তম পন্থায়।’ (সূরা নাহাল : ১২৫)। এজন্যই রাসূল (সা.) দাওয়াতের ক্ষেত্রে তাঁর যুগের সবচেয়ে আধুনিক পদ্ধতিগুলো বেছে নিয়েছিলেন। যেমন কুরাইশদের প্রথা ছিল গুরুত্বপূর্ণ কোন সংবাদ দিতে উলঙ্গ হয়ে সাফা পাহাড়ে উঠে চিৎকার করা। যাকে বলা হত ‘নাযীরুল উরইয়ান’ বা হতবিহ্বল ভীতি প্রদর্শনকারী। রাসূল (সা.) ও এই পদ্ধতিতে লোকজনকে সাফা পাহাড়ের পাদদেশে জড়ো করে দাওয়াতের কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। তবে তিনি জাহেলী যুগের প্রথানুসারে বিবস্ত্র হতেন না। এতে প্রমানিত হয় যে, তিনি ইসলামী মূল্যবোধের আলোকে উক্ত প্রচার ব্যবস্থাটিকে পরিমার্জিত ও উন্নত করেছিলেন। এ ছাড়া পশুর চামড়ায় লিখিত ঈমানের দাওয়াত সম্বলিত চিঠি প্রেরণ করেছেন সমসাময়িক অনেক রাজা-বাদশাদের উদ্দেশে। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র প্রধানদের কাছে তার ব্যক্তিগত প্রতিনিধিদের পাঠিয়ে চালিয়েছেন কূটনীতিক তৎপরতা। তিনি তার যুগের সকল আধুনিক পদ্ধতির যথাযথ ব্যবহার করে আমাদের সামনে স্থাপন করে গেছেন দাওয়াতের কৌশল ও আদর্শ। যা সকল যুগের ইসলাম প্রচারকদের জন্য অনুসরণীয় আদর্শ।
এ জন্য একজন দাঈকে ইসলামী জ্ঞানের পাশাপশি প্রযুক্তির জ্ঞানেও পারদর্শী হতে হবে। আর ইসলামের দাওয়াত দিতে হবে বিজ্ঞানসম্মতভাবে ও শৈল্পিক উপস্থাপনায়, যাতে মানুষ ইসলামী জীবন ব্যবস্থার দিকে আকৃষ্ট হয়।
বর্তমান পৃথিবীর কোন মানুষের নিকট ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাতে হাতের স্মার্ট ফোন, নোটপেড, লেপটপ বা কম্পিউটারই যুগোপযোগী মাধ্যম হতে পারে। ইন্টারনেটর কল্যানে ফেইসবুক, টুইটার, ব্লগ, ইউটিউব, ই-মেইলের সহযোগিতায় পৌঁছা যায় অনেক দূরের মানুষটির কাছেও। সংক্ষিপ্ত, গুছালো, মার্জিত ও দরদি একটি লেখা, একটি স্টেটাস, ইউটিউবে আপলোড করা একটি বয়ান, মেইলে পাঠানো একটি বার্তাই পৃথিবীর যে কোনো দেশের যে কাউকে দিতে পারে আলোকিত জীবনের সন্ধান। তাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুক, টুইটার, ব্লগ, ইউটিউব প্রভৃতিকে ইসলাম প্রচারের মাধ্যমে পরিণত করে মুসলমানদের একটি দক্ষ জনবলের অগ্রণী ভুমিকা পালন করা সময়ের দাবী। শুধু সময় কাটানোর জন্যই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ব্যবহার মুমিনের কাজ হতে পারে না বরং সেখানেও থাকতে হবে কল্যানকর মহৎ কোন উদ্দেশ্য। সেই মহৎ উদ্দেশ্যের মাঝে একটি শ্রেষ্ঠ কাজ হলো দাওয়াতী কার্যক্রম পরিচালনা করা। কারণ মানুষ পৃথিবীতে যত কাজে সময় ব্যয় করে দাওয়াতের কাজে ব্যয়িত সময়গুলিই তার মধ্যে শ্রেষ্ঠতম, মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘আর তার চেয়ে কার কথা উত্তম, যে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেয়, সৎকর্ম করে এবং বলে, আবশ্যই আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত?’ (সূরা ফুসসিলাত : ৩৩)।
যুগসন্ধিক্ষণে দাড়িয়ে দাওয়াতের মতো ইসলামের একটি অপরিহার্য বিধানকে নির্দিষ্ট কিছু পদ্ধতি ও প্রক্রিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে রাখা সময়ের দাবী নয়। বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষতার এ যুগে ইসলাম প্রচারে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ছাড়া কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌছা সম্ভব নয়। প্রযুক্তির মাধ্যমেই সম্ভব ইসলামের সুমহান বানীকে পৃথিবীর সকল দেশের সকল মানুষের কাছে দ্রুততম সময়ে পৌঁছে দেয়া। তেমনি সম্ভব ইসলাম বিরুধীদের সকল অপপ্রচার ও অপবাদের জবাব দেয়া।

 

শেয়ার করুন

Leave a Comment