মেরাজের প্রাপ্তি ও শিক্ষা

নবুয়াতের প্রমান স্বরূপ নবীদের থেকে অলৌকিক কিছু প্রকাশ পেলে তাকে মোজেযা বলে। আমাদের প্রিয় নবীর (সা.) ছিল অসংখ্য মোজেযা। তার মধ্যে মেরাজ গমন একটি বিস্ময়কর মোজেজা। এ জন্যই মেরাজের ঘটনা বর্ণনা করার আয়াতের শুরুতেই আল্লাহ তায়ালা ‘সুবহানআল্লাহ’ শব্দটি ব্যবহার করে মেরাজের ঘটনা বর্ণনা করেছেন। ‘সুবহানআল্লাহ’ শব্দটি আশ্চর্যজনক ঘটনার সময়ই ব্যবহার করা হয়। মেরাজ যে সশরীরে হয়েছিল তা বুঝাতে আব্দুন শব্দ ব্যহার করেছেন। আর আবদ বা বান্দা বলা হয় রুহ ও দেহের সমষ্টিকে। এ শব্দটিও রসূল (সা.) এর মেরাজ সশরীরে হবার প্রমান বহণ করে।

মেরাজের সংজ্ঞা : মেরাজ আরবি শব্দ। যার শাব্দিক অর্থ সিঁড়ি বা ঊর্ধ্বে আরোহণ। ইসলামি পরিভাষায় মুহাম্মদ (সা.) এর সশরীরে কাবা শরিফ থেকে বায়তুল মুকাদ্দাসে উপনীত হয়ে সেখান থেকে সপ্তাকাশ হয়ে আরশে আজিম পৌঁছে আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করাকে মেরাজ বলে।
মেরাজের সময় ও প্রেক্ষাপট : মেরাজ সংঘটিত হওয়ার সময়কালের ব্যাপারে কয়েকটি মতামত রয়েছে। ইমাম নববি ও কুরতুবির মতে, মেরাজের ঘটনা রাসুল (সা.) এর নবুয়তপ্রাপ্তির ৫ বছর পর ঘটেছে। ইমাম হরবির মতে, ইসরা ও মেরাজের ঘটনা রবিউসসানি মাসের ২৭ তারিখ রাতে হিজরতের এক বছর আগে ঘটেছিল। বেশিরভাগের মত হলো, রাসুল (সা.) ৫২ বছর বয়সে অর্থাৎ নবুয়তের দশম বছর রজব মাসের ২৬ তারিখ দিনগত রাতে রোজ সোমবার মেরাজের আশ্চর্যতম ঘটনাটি সংঘটিত হয়। এ বছরেই হুজুর (সা.) এর চাচা আবু তালেব ও স্ত্রী হজরত খাদিজা (রা.) ইন্তেকাল করেন। সেই সুযোগে তার ওপর কোরাইশ কাফেরদের নির্যাতনের মাত্রাও বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। এ জন্য এই বছরকে আমুল হুজন বা দুঃখের বছর বলা হয়। রাসুল (সা.) কে সান্ত¡না দান ও দাওয়াতি কাজে উদ্বুদ্ধকরণ নিমিত্তে আল্লাহ তাঁর হাবিবকে মেরাজে ডেকে নিয়েছিলেন।
মেরাজের উদ্দেশ্য : মেরাজের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, ‘পরম পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাত্রি বেলায় ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্তÑ যার চারদিকে আমি পর্যাপ্ত বরকত দান করেছি, যাতে আমি তাঁকে আমার কুদরতের কিছু নিদর্শন প্রত্যক্ষ করাই।’ (সূরা বানি ইসরাইল : ১)।
মেরাজের প্রপ্তি : মেরাজের ঘটনা থেকে মোমিন খুঁজে পায় সঠিক পথের দিশা, লাভ করে দ্বীনের ওপর টিকে থাকার অবিচলতা। মেরাজের ঘটনাকে বলিষ্ঠ প্রত্যয় নিয়ে সত্য বলে বিশ্বাস ও ঘোষণার পরই হজরত আবু বকর (রা.) সিদ্দিক উপাধীতে ভূষিত হন। মেরাজে মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় বন্ধু মুহাম্মদ (সা.) কে স্বীয় সান্নিধ্যে ডেকে নিয়ে উম্মতে মুহাম্মদিকে পুরস্কারস্বরূপ তিনটি বিশেষ উপহার প্রদান করেন, যা অন্য কোনো নবীকে দেওয়া হয়নি। যথাÑ (১) পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, যা ফজিলতের দিক দিয়ে ৫০ ওয়াক্তের সমান। (২) সূরা বাকারার শেষোক্ত দুটি আয়াত, যেখানে এই উম্মতের প্রতি আল্লাহর বিশেষ রহমত ও অনুগ্রহের কথা বলা হয়েছে। এবং (৩) উম্মতে মুহাম্মদির মধ্যে শিরককারী ব্যতীত সবাইকে ক্ষমা করার সুসংবাদ।
মেরাজের শিক্ষা : রাসুল (সা.) মেরাজ থেকে ফিরে আসার পর সূরা বনি ইসরাইলের মাধ্যমে ১৪টি শিক্ষামূলক কর্মসূচি উম্মতের সামনে পেশ করেনÑ
১. আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক কোরো না, তাহলে তুমি নিন্দিত ও অসহায় হয়ে পড়বে। আর তোমরা শুধু আল্লাহরই বন্দেগি করো।
২. মা-বাবার সঙ্গে উত্তম ব্যবহার করো। তাদের একজন বা উভয়ে বৃদ্ধ অবস্থায় যদি তোমাদের সামনে উপনীত হয় তাহলে তাদের সঙ্গে উহ্ শব্দটিও বলো না। তাদের ধমক দিও না; বরং তাদের সঙ্গে শিষ্টাচারপূর্ণ কথা বলো। আর তাদের সামনে ভালোবাসার সঙ্গে বিনয়ী থেক আর বলো ‘হে আমার প্রতিপালক, তাদের উভয়ের প্রতি রহম করো, যেমন শৈশবে তারা দয়ামায়া দিয়ে আমাদের লালন-পালন করেছেন।’
৩. তোমাদের কৃতকর্মের জন্য আল্লাহর কাছে তওবা কর, তাহলে আল্লাহ তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চই আল্লাহ তোমাদের মনের খবর জানেন।
৪. আত্মীয়স্বজনকে তাদের হক দান কর আর অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরদের হক আদায় কর।
৫. অপব্যয় করো না, নিশ্চয়ই অপব্যয়কারী শয়তানের ভাই, আর শয়তান স্বীয় প্রতিপালকের প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ।
৬. হকদারদের হক আদায়ে অপারগ হলে তাদের সঙ্গে নম্রভাবে কথা বলো।
৭. একেবারে ব্যয়কুণ্ঠ হয়ো না আবার একেবারে মুক্তহস্তও হয়ো না। তাহলে তুমি তিরস্কৃত, নিঃস্ব হয়ে বসে থাকবে।
৮. দারিদ্র্যের ভয়ে তোমাদের সন্তানদের হত্যা করো না। কারণ তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমিই জীবনোপকরণ দিয়ে থাকি। নিশ্চয়ই তাদের হত্যা করা মহাপাপ।
৯. জেনা-ব্যভিচারের কাছেও যেও না। নিশ্চই এটি নিকৃষ্ট কাজ ও মন্দ পথ।
১০. কোনো জীবনকে অন্যায়ভাবে বধ করো না। কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হলে তার উত্তরাধিকারীকে আমি এই অধিকার দিয়েছি, তবে সে যেন প্রতিশোধের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি না করে।
১১. এতিমের সম্পদের ধারেকাছেও যেও না। সম্পদের ব্যাপারে তার বয়োপ্রাপ্তি পর্যন্ত অপেক্ষা করো আর অঙ্গীকার পূর্ণ করো। নিশ্চয়ই অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
১২. ওজনে কখনও কম দিও না। সঠিকভাবে দাঁড়িপাল্লায় ওজন করবে। এটা উত্তম; এর পরিণাম শুভ।
১৩. যেসব বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই সেগুলোর পেছনে লেগ না। নিশ্চয়ই চোখ, কান, অন্তঃকরণÑ এদের প্রত্যেকটিই জিজ্ঞাসিত হবে।
১৪. পৃথিবীতে দম্ভভরে চলো না। নিশ্চয় তুমি তো ভূপৃষ্ঠকে কখনও বিদীর্ণ করতে পারবে না এবং উচ্চতায় তুমি কখনও পর্বত প্রমাণ হতে পারবে না। এগুলো সবই মন্দ ও ঘৃণিত কাজ।
এসব শিক্ষার কথা সূরা বনি ইসরাইলে সবিস্তারে বর্ণিত আছে। (দ্র. আয়াত-২৩-৩৮)।

শেয়ার করুন

Leave a Comment