নরনারী পরষ্পরের পরিপূরক

শাহ মাহমুদ হাসান

 

ইসলামের দৃষ্টিতে নারী-পুরুষ একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয় বরং সহযোগী, একে অন্যকে ছাড়া পরিপূর্ণ নয় বরং তাদের অপূর্ণতা নিরসনে একজনকে আরেকজনের পরিপূরক করে সৃষ্টি করা হয়েছে। নারী ও পুরুষ মানব সভ্যতার দুটি অপরিহার্য অঙ্গ। নারীকে উপেক্ষা করে মানবতার জন্য যে কর্মসূচী তৈরী হবে তা হবে অসম্পূর্ণ। নারী-পুরুষের কাউকে বাদ দিয়ে মানব সভ্যতা গঠিত হতে পারে না। আমরা এমন কোনো সমাজের কথা কল্পনাই করতে পারি না যা কেবল পুরুষ নিয়ে গঠিত, যেখানে নারীর প্রয়োজন অনুভূত নয়। পুরুষ মানব সমাজের একটি অংশের প্রতিনিধিত্ব করলে আরেকটি অংশের প্রতিনিধিত্ব করে নারী। কবি যথার্তই বলেছেন, বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি, চির কল্যানকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর। নারী ও পুরুষ একে অন্যের মুখাপেক্ষী। এ সম্পর্কের ভিত্তি, দর কষাকষি বা প্রতিদ্বন্দিতার নয়; এ সম্পর্ক হলো প্রেমময় ভালোবাসার। এখানে নির্যাতন, অবজ্ঞা, অবহেলা ও অপমানের কোনো সুযোগ নেই। নারী পুরুষ মিলে যে নীড় বাঁধে সেখানে প্রত্যেকেরই আলাদা আলাদা গুরুত্ব ও ভূমিকা রয়েছে। এ প্রসংগে আল্লাহ তায়ালার বানী, “তারা তোমাদের পরিচ্ছদ এবং তোমরা তাদের পরিচ্ছদ” (সূরা বাকারা : ১৮৭)।
অথচ বর্তমান সমাজের কোন ক্ষেত্রই নারীর জন্য নিরাপদ নয়। ঘরে-বাইরে, শিক্ষাঙ্গনে-কর্মস্থলে সর্বত্রই নারীদেরকে বিভিন্ন প্রকার শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়। এক শ্রেণীর পুরুষ সবসময় নারীকে অসম্মান ও তাদের প্রতি অশোভন আচরণ করে থাকে। শহর-গ্রামে যত্রতত্র বিচিত্র পন্থায় নারী নিগ্রহের ঘটনা ঘটেই চলছে। তাদের গালাগালি করে মারপিট করে, শ্বাসরুদ্ধ করে, বিষ প্রয়োগ করে, এসিড নিক্ষেপ করে, গুলি করে, যৌন নির্যাতন করে, অপবাদ আরোপ করে, আপত্তিকর দৃশ্য ইন্টারনেটে আপলোড করে ও গণ ধর্ষণের পর হত্যা করে নারীদের উপর চালানো হয় সহিংসতা ও নির্যাতন। মুসলিম অধ্যুষিত এদেশেও নারীর প্রতি মানুষ কতটা, পাশবিক ও পৈশাচিক হতে পারে টাঙ্গাইলের কালিহাতির লোমহর্ষক ঘটনা তার বড় প্রমান।
বর্তমানে পারিবারিক ভাবে নারী নির্যাতনের ঘটনা ভয়াবহ আকার নিয়েছে। নির্যাতনের কারণে অনেকে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছে। কেউ কেউ আত্মহত্যার পথও বেছে নিচ্ছে। যৌতুকের জন্য নারীর ওপর শ্বশুরালয়ের সবাই মিলে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালানো যেন একটা সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। শ্বশুর শাশুরীর প্ররোচনা অনেক সময় নারী নির্যাতনকে আরো উস্কে দেয়। মূলত স্বামীর বাড়িতে নারীরা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার বেশি হয়। এ ছাড়াও স্ত্রীর জন্য পৃথক বসসবাসের ব্যাবস্থা না করা, লোভ-লালসা, সম্পদের মোহ, স্বার্থপরতা, পারস্পরিক অবিশ্বাস, অবাধ মেলামেশা ও পরকীয়া ইত্যাদি নারী নির্যাতনের আন্যতম কারণ।
সমাজে নারী ও পুরুষের যে ন্যায্য অধিকার ও গুরুত্ব রয়েছে, উভয়ে মিলে তারা যে অভিন্ন সত্তা, এ মানবিকতাবোধকে পুরুষেরা গভীরভাবে উপলব্ধি করলে নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটবে। নিজের সন্তানের প্রতি যেমন মমত্ববোধ রয়েছে, ঠিক তেমনিভাবে অন্যের সন্তানের (জামাতা, পুত্রবধূর) প্রতিও মমত্ববোধ এবং ভালোবাসাকে জাগ্রত করতে হবে, তাহলে পৃথিবীতে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। সেই সঙ্গে মা-বোনদেরও নিজ নিজ মানবিক মর্যাদা, অধিকার, দায়িত্ব ও কর্তব্যের প্রতি সজাগ থাকা উচিত। আল্লাহ তায়ালার নারী পুরুষের সম্পর্ক বলেন, “আর মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী একে অপরের বন্ধু”(সূরা তাওবাহ : ৭১)।
পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, বিশ্বাস ও ইসলামেরজ্ঞান ছাড়া নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সম্ভব নয়। পারস্পরিক অধিকারের প্রশ্নে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা হল, “পুরুষদের যেমন স্ত্রীদের ওপর অধিকার রয়েছে, তেমনিভাবে স্ত্রীদেরও পুরুষদের ওপর নিয়মানুযায়ী অধিকার আছে” (সূরা আল-বাকারা : ২২৮)।
ইসলামের বিধান যথাযথ কার্যকর হলে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারী নির্যাতন চিরতরে বন্ধ হবে এবং মানবজীবনে শান্তি ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠিত হবে। এক সময় এ নির্যাতিত শ্রেণীটির বেঁচে থাকার অধিকার পর্যন্ত ছিল না। “আর যখন জীবন্ত প্রোত্থিত কন্যাকে জিজ্ঞাসা করা হবে, কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?” (সূরা তাকভীর : ৮, ৯)।
আল্লাহ তায়ালা নারীদের প্রতি কোমল ব্যবহারের নির্দেশনা দিয়েছেন “নারীদের সাথে সদ্ভাবে জীবন-যাপন কর। অতঃপর যদি তাদেরকে অপছন্দ কর, তবে হয়ত তোমরা এমন এক জিনিসকে অপছন্দ করছ, যাতে আল্লাহ অনেক কল্যাণ রেখেছে ” ( সূরা নিসা : ১৯ )
রাসূল সা: নারীকে কতটা গুরুত্ব দিতেন তার প্রমান নিম্নোক্ত বাণী, “তোমাদের মাঝে সেই ব্যাক্তি উত্তম যে তার স্ত্রীদের কাছে উত্তম আমিও আমার স্ত্রীদের কাছে উত্তম (তিরমিজি : ৩৮৯৫)
নারী নির্যাতন নীচু মানষিকতা সম্পন্ন লোকদের আচারণ। এটি চরম অভদ্রতা ও অসভ্যতার বহি:প্রকাশ ও অসুস্থ্য মানসিকতার ইংগিত। নারীকে অবজ্ঞা, অবহেলা ও অপমান করার মাঝে কোন পৌরষত্ব নেই। এটি কাপুরষোচিত ঘৃনিত কাজ। নারী নির্যাতনকারীদের প্রতি কারো কোন সহানূভুতি থাকা উচিৎ নয়। ওরা সমাজের ঘৃণিত ও অভিশপ্ত সম্প্রদায়। ওদের সমাজ থেকে বয়কট করা উচিত। এবং দ্রুত বিচারের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিৎ করা অত্যন্ত জরুরি, যাতে আর কোন বখাটে পুরুষ নারীদের প্রতি সহিংসতা চালাতে সাহস না পায়।

শেয়ার করুন

Leave a Comment