সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ে বিপন্ন সভ্যতা

শাহ মাহমুদ হাসান

 

সংস্কৃতি বাংলা শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে সভ্যতাজনিত উৎকর্ষ, কৃষ্টি, কালচার। সংস্কৃতির আরবি প্রতিশব্দ তাহজিব। তাহজিবের অর্থ হলো ব্যক্তির কর্ম, খাওয়া-দাওয়া, আচার-আচরণ, স্বভাব-চরিত্র, পোশাক- পরিচ্ছদ, আনন্দ-উৎসব, দৈনন্দিন অভ্যাস, আচার অনুষ্ঠান ও সার্বিক জীবনযাপনের বিশুদ্ধিকরণের প্র্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মানুষের কাজকর্ম, আচার-ব্যবহার, রুচিবোধ এবং চরিত্র সুন্দর ও মার্জিত হয়। সাধারণত সংস্কৃতি বলতে আমরা বুঝি মার্জিত রুচি বা অভ্যাসজাত উৎকর্ষ। দেহ, মন, হৃদয় ও আত্মার উৎকর্ষ সাধনই সংস্কৃতির উদ্দেশ্য। সংস্কৃতির মূল কথা নিজেকে সুন্দর করা, সভ্য করা। সভ্যতা, শালীনতা ও সৌন্দর্যবোধ সংস্কৃতির মূল আশ্রয়।
বর্তমানে সংস্কৃতির নামে চলছে যত অপসাংস্কৃতিক কার্যকলাপ, যা চলছে বিভিন্ন উপায়ে। যেমন- সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন, রেডিও, টেলিভিশন, স্যাটেলাইট চ্যানেল, চলচ্চিত্র, বিজ্ঞাপন, সঙ্গীত, বিউটি পার্লার, ইলেকট্রনিক মিডিয়া, ইন্টারনেট ইত্যাদি অপসংস্কৃতি ছড়ানোর অন্যতম মাধ্যম। অপসংস্কৃতির মরণ ছোবল আমাদের সম্ভাবনাময়ী যুব সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়ে অপরাধপ্রবণ করে তুলেছে। চলচ্চিত্রে বিয়ার খাওয়ার দৃশ্যসহ নানা আপত্তিকর দৃশ্য দেখে আমাদের তরুণরা নেশা, মাদক এবং অবাধ যৌনাচারে প্ররোচিত হচ্ছে। উচ্ছৃঙ্খল হচ্ছে যুবসমাজ, বাড়ছে পাপাচার-অনাচার আর যৌন সন্ত্রাস।
অপসাংস্কৃতিক প্রচারণার মাধ্যমে শেখানো হচ্ছে অবৈধভাবে প্রেম করার কৌশল, আর তাতে যুব থেকে বৃদ্ধদের মন-মস্তিষ্কে ব্যভিচারের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করা হয়।
যারা অপসংস্কৃতির যোগানদাতা তাদের সম্পর্কে কোরআনে এসেছে, ‘একশ্রেণীর লোক আছে যারা মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে গোমরাহ করার উদ্দেশে অবান্তর কথাবার্তা সংগ্রহ করে অন্ধভাবে এবং তাকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে। তাদের জন্য রয়েছে অবমাননাকর শাস্তি।’ (সূরা লোকমান : ৬)।
যারা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের নামে অশ্লীলতা উপভোগ করে তাদেরও জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে। ‘চোখের লুকোচুরি এবং অন্তরের গোপন বিষয় তিনি জানেন।’ (সূরা গাফির : ১৯)। ‘নিশ্চয় কান, চক্ষু ও অন্তঃকরণ এদের প্রত্যেকটিই জিজ্ঞাসিত হবে।’ (সূরা ইসরা : ৩৬)।
আমাদের সমাজে অপসংস্কৃতির প্রভাব কতটা প্রকট হয়ে উঠেছে তা তরুণ সমাজের বেশভূষা, পোশাক-আশাক ও আচার-আচরণ দেখলেই বোঝা যায়। তারা নাচ-গান, অশ্লীল ও নীল ছবি দর্শনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। এতে বাড়ছে যৌন সন্ত্রাস। প্রতিনিয়ত পারিবারিক কলহ, তালাক, পরকীয়া, সম্ভ্রমহানি ও ধর্ষণের সচিত্র বর্ণনা পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে, যা আমাদের এক অবশ্যম্ভাবী ধ্বংসের ইঙ্গিত দিচ্ছে। অপসংস্কৃতির কারণে সভ্যতায় ধস নেমেছে ইউরোপ- আমেরিকাতে অনেক আগেই। বিয়েপ্রথা ভেঙে গিয়ে এক বিষাক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। সেখানে পুরুষ পুরুষকে, নারী নারীকে বিয়ে করছে, যা পশুত্বকেও হার মানায়।
মুসলমানের ইবাদত ও সংস্কৃতি এ দুইটিকে আলাদা করা যায় না। উভয়ের মধ্যেই প্রকাশ পায় আল্লাহ তায়ালার কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার গভীর প্রেরণা ও প্রচেষ্টা। মোমেনের নৈতিকতা, মূল্যবোধ, আচার-আচরণ, পোশাক-পরিচ্ছদ ও রুচিবোধের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় আল্লাহর প্রতি তার আনুগত্য। সে অন্যের কল্যাণে নিবেদিত হয় স্বার্থপরতার চেতনায় নয়, বরং আল্লাহর কাছে প্রিয়তর হওয়ার পবিত্র চেতনায়। এর মাধ্যমে যে সুন্দর জীবনচিত্র ফুটে উঠে তা-ই ইসলামের নন্দিত সংস্কৃতি। ইসলাম সংস্কৃতি বা বিনোদনের সীমারেখা নির্ধারণ করে দিয়েছে। সংস্কৃতি বা বিনোদন যেন কখনও অকল্যাণ ও অশ্লীলতার বাহন না হয় সেটা নিশ্চিত করার নির্দেশনা দিয়েছে ইসলাম।

শেয়ার করুন

Leave a Comment