চরমপন্থা ইসলাম সমর্থন করে না

শাহ মাহমুদ হাসান

 

 

নিরাপদ জীবন লাভ প্রতিটি মানুষের জন্মগত অধিকার। ইসলাম সামাজিক নিরাপত্তা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিপর্যয় সৃষ্টিকারী, ব্যভিচারী, ধর্মদ্রোহী, অন্যায়ভাবে নরহত্যাকারী, রাষ্ট্রদ্রোহীসহ সব অপরাধীর জন্য কঠোর শাস্তি কার্যকর করার নির্দেশ দিয়েছে। ইরশাদ হয়েছে- ‘নিশ্চয়ই যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে বেড়ায়, তাদের হত্যা করা হবে বা ক্রুশবিদ্ধ করা হবে কিংবা বিপরীত দিক থেকে একটি হাত ও একটি পা কেটে দেওয়া হবে অথবা দেশ থেকে নির্বাসিত করা হবে। এটিই তাদের পার্থিব জীবনের শাস্তি। আর পরকালে তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।’ (সুরা মায়িদা : ৩৩)
মুসলমানের পরিচয় তুলে ধরতে গিয়ে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘প্রকৃত মুসলমান সেই ব্যক্তি, যার হাত ও মুখ থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ।’ (বুখারি : ১০) রাসুল (সা.) তাঁর উম্মতকে পরস্পরের প্রতি অস্ত্র তাক করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘মুসলমান মুসলমানের ভাই। সে তার ওপর না জুলুম করতে পারে, না তাকে অসহায় অবস্থায় পরিত্যাগ করতে পারে আর না তাকে হেয়প্রতিপন্ন করতে পারে। তিনি নিজের বুকের দিকে ইশারা করে বলেন, তাকওয়া এখানে, তাকওয়া এখানে, তাকওয়া এখানে। কেউ নিকৃষ্ট হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে সে তার মুসলিম ভাইকে তুচ্ছজ্ঞান করবে। প্রত্যেক মুসলমানের জীবন, ধনসম্পদ ও মানসম্মান প্রত্যেকের সম্মানের বস্তু। এর ওপর হস্তক্ষেপ করা হারাম। (মুসলিম : ৬৭০৬)
মানবসমাজে কোনো রকম অশান্তি সৃষ্টি, নাশকতা, নৈরাজ্য, বিশৃঙ্খলা, সংঘাত, হানাহানি, উগ্রতা, বর্বরতা, প্রতিহিংসাপরায়ণতা ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ইসলামে নিষিদ্ধ। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- ‘দুনিয়ায় শান্তি স্থাপনের পর এতে বিপর্যয় ঘটাবে না।’ (সুরা আরাফ : ৫৬)।
বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকে গণ্য করা হয়েছে হত্যার চেয়েও জঘন্য অপরাধ হিসেবে। ইরশাদ হচ্ছে, ‘আর ফিতনা হত্যার চেয়ে কঠিনতর।’ (সুরা বাকারা : ১৯১)।
ইসলাম হত্যাকাণ্ডকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। নিরপরাধ জনগণকে গুলি করে, বোমা মেরে, জবাই করে, অগ্নিসংযোগ করে হত্যা করা ইসলামের আদর্শ নয়। পবিত্র কোরআনে তাই একজন মানুষের হত্যাকে পুরো মানবজাতির হত্যা বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। ‘নরহত্যা বা দুনিয়ায় ধ্বংসাত্মক কাজ করা হেতু ছাড়া কেউ কাউকে হত্যা করলে সে যেন দুনিয়ার সব মানুষকে হত্যা করল; আর কেউ কারো প্রাণ রক্ষা করলে সে যেন দুনিয়ার সব মানুষের প্রাণ রক্ষা করল।’ (সুরা মায়িদা : ৩২)
রাসুল (সা.) হত্যার ভয়াবহতা সম্পর্কে বলেছেন, ‘হত্যার ভয়াবহতার কারণে কেয়ামত দিবসে সর্বপ্রথম খুনের বিচার করা হবে।’ (বুখারি : ৬৩৫৭)
ইসলামে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও চরমপন্থার কোনো স্থান নেই। রাসুল (সা.)-এর ওপর অনেক অত্যাচার, অবিচার হয়েছে, তবুও তিনি কোনো দিন কাউকে গালি দেননি, বদদোয়া করেননি, প্রতিশোধ নেননি, কাউকে আঘাত করেননি, কারো বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেননি, কারো কোনো ক্ষতিসাধন করেননি। তিনি কখনো কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে হত্যা করেননি। শত অত্যাচার ও নির্মম নির্যাতন সহ্য করেও তিনি কখনো কঠোরতা বা বাড়াবাড়ির পথে পা বাড়াননি।
আল্লাহ তাআলা রাসুল (সা.)-কে ‘রাহমাতুল্লিল আলামিন’ তথা সমগ্র বিশ্বের জন্য করুণার মূর্তপ্রতীক হিসেবে ঘোষণা করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্য রহমতস্বরূপই প্রেরণ করেছি।’ (সুরা আম্বিয়া : ১০৭)
যারা ইসলাম কায়েমের নামে সহিংসতার পথ বেছে নিচ্ছে, তারা ইসলামের ক্ষতি ছাড়া কোনো উপকার করছে না। বরং তারা ইসলামকে চিত্রিত করছে একটি অসহিষ্ণু, উগ্র ও চরমপন্থী ধর্ম হিসেবে। রাসুল (সা.) মদিনায় যখন একটি নতুন রাষ্ট্র স্থাপন করেছিলেন, তার ভিত্তি ছিল মদিনার সনদ। এই সনদের একটি ধারা, ‘প্রত্যেক ধর্মের লোকেরা স্বাধীনভাবে নিজ নিজ ধর্ম পালন করতে পারবে, কেউ কারো ধর্মে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।’ এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘ধর্মের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই।’ (সুরা বাকারা : ২৫৬)
ইসলাম মুসলমানদের একটি উদার- মধ্যপন্থী সম্প্র্রদায় হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। আল্লাহ বলেন, ‘এমনিভাবে আমি তোমাদের মধ্যপন্থী সম্প্রদায় করেছি।’ (সুরা বাকারা : ১৪৩)
ইসলাম এমন এক সর্বজনীন জীবন বিধান, যেখানে নেই কোনো সংকীর্ণতা বা সংঘাত; বরং এতে রয়েছে উদারতা, বিশালত্ব ও সমগ্র সৃষ্টির প্রতি অসীম মমত্ববোধ। ইসলাম শুধু মুসলমান নাগরিকদের জানমাল ও ইজ্জতের নিরাপত্তা বিধান করেনি, বরং অন্যান্য ধর্মাবলম্বী তথা খ্রিস্টান, হিন্দু, বৌদ্ধ প্রভৃতি সব নাগরিকের যথাযথ অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তা বিধান করেছে।
ইসলাম পরমতসহিষ্ণুতার শিক্ষা দেয়, পরধর্মের বা মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে নির্দেশ দেয় এবং পারস্পরিক সম্প্রীতির সঙ্গে সবার সহাবস্থান সুনিশ্চিত করে। অন্যের ধর্ম-মতাদর্শকে অবজ্ঞা ও অশ্রদ্ধা করতে ইসলামে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘তারা আল্লাহ তাআলার পরিবর্তে যাদের ডাকে, তাদের তোমরা গালি দিয়ো না, নইলে তারাও শত্রুতার কারণে না জেনে আল্লাহকেও গালি দেবে।’ (সুরা আনআম : ১০৮)
রাসুল (সা.) যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও মুসলমানদের কর্মপন্থা ঠিক করে দিতেন যে ‘শিশুদের হত্যা করবে না। গির্জায় যারা ধর্মীয় উপাসনায় জীবন উৎসর্গ করেছে, তাদের ক্ষতি করবে না। কখনো নারী ও বৃদ্ধদের হত্যা করবে না। কারো গাছপালা, ঘরবাড়ি কখনো ধ্বংস করবে না।’ (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা : ৩৩৮০৪)
যারা শান্তিপূর্ণভাবে মুসলিমদের সঙ্গে বসবাস করতে আগ্রহী, তাদের সঙ্গে মুসলমানদের কোনো সংঘাত নেই। ইসলাম তাদের প্রতি কোনো ধরনের বৈষম্য অনুমোদন করে না; বরং তাদের প্রতি ইনসাফ করার নির্দেশ দেয়। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ নিষেধ করেন না ওই লোকদের সঙ্গে সদাচার ও ইনসাফপূর্ণ ব্যবহার করতে, যারা তোমাদের সঙ্গে ধর্মকেন্দ্রিক যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদের আবাসভূমি থেকে তোমাদের বের করে দেয়নি। নিশ্চয়ই আল্লাহ ইনসাফকারীদের পছন্দ করেন।’ (সুরা

শেয়ার করুন

Leave a Comment