ইসলামে ফিকাহ শাস্ত্রের ভূমিকা

শাহ মাহমুদ হাসান

 

ফিকাহ শব্দটি আরবী। ফিকাহ শব্দের আভিধানিক অর্থ: বুদ্ধিবৃত্তি, প্রজ্ঞা, গভীর জ্ঞান, গবেষণা, সূক্ষাদর্শিতা, জানা, বুঝা, উপলব্ধি করা, অনুধাবন করা ইত্যাদি। যেমন কোরআনে এসেছে, “তাদের অন্তর রয়েছে, তবে তাদ্বারা তারা উপলব্ধি করেনা।” (সূরা আরাফ : ১৭৯)।
পারিভাষায় ইসলামী আইনের সমষ্টিকে ফিকাহ বলে। কুরআন-হাদীসে উল্লেখিত হুকুম-আহকাম এবং পরবর্তীতে উদ্ভূত নানাবিধ সমস্যার কুরআন-সুন্নাহ্ভিত্তিক সমাধানের সুসংকলিত রূপকেই ফিকহ বলা হয়।
এক কথায়, ফিকাহ শাস্ত্র পাঠে মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়াদি সম্পর্কে শারীয়াতের বিধানসমূহ অবগত হওয়া যায়। এর দ্বারা হালাল, হারাম, পাক, নাপাক ইত্যাদি শারীয়াতের হুকুম-আহকাম জানা যায়। ফিকাহ হল কুরআন-হাদীসের সারনির্যাস। ফিকাহ কোরআন-হাদীস বিরুধী কোন নীতিমালার নাম নয়। কোরআন-হাদীসে বিভিন্ন জায়গায় ফিকাহ শাস্ত্র সম্পর্কে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন, “তিনি যাকে ইচ্ছা বিশেষ জ্ঞান দান করেন এবং যাকে বিশেষ জ্ঞান দান করা হয়, সে প্রভুত কল্যাণকর বস্তু প্রাপ্ত হয়।” (সূরা বাকারা : ২৬৯)। “তাদের প্রত্যেক দলের একটি অংশ কেন বের হলো না, যাতে দ্বীনের জ্ঞান লাভ করে এবং সংবাদ দান করে স্বজাতিকে, যখন তারা তাদের কাছে প্রত্যাবর্তন করবে, যেন তারা বাঁচতে পারে।” (সূরা তাওবা : ১২২)। “যদি তোমাদের জানা না থাকে তবে জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞেস কর।” (সূরা নাহল : ৪৩)। এ সকল আয়াত দ্বারা ফিকাহ শাস্ত্র বুঝান হয়েছে।
রাসূল (সা.) ইবন আব্বাস (রা.) জন্য ফকিহ হবার দুআ করেছিলেন যে, “আল্লাহ তুমি তাকে দ্বীনের ব্যাপারে তাকে ফিকহের জ্ঞান দান কর।” (বুখারী : ১৪৩)। রাসূল (সা.) বলেছেন, “মহান আল্লাহ যার কল্যাণ ইচ্ছা করেন, তিনি তাকে দীন ইসলাম তথা ইসলামী শারীয়াত সম্বন্ধে ফিকহের জ্ঞান দান করেন।” (বুখারী : ৭১)। “একজন ফকীহ শয়তানের উপর হাজার আবিদ অপেক্ষা উত্তম।” (ইবনে মাজাহ : ২২২)। “প্রত্যেক বস্তুর স্তম্ভ আছে আর দ্বীন ইসলামের স্তম্ভ হল ফিকাহ।” (দারা কুতনী : ২৯৪)।
কুরআন-হাদীসের সকল নির্দেশনা মৌলিক ভাবে দুই ভাগে বিভক্ত:
১. এমন নির্দেশনা যা অনুধাবনে ইজতিহাদী পর্যায়ের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা অপরিহার্য নয়। এই নির্দেশনাগুলো মূলত বিশ্বাস ও চেতনা এবং চরিত্র ও নৈতিকতার সঙ্গে সম্পৃক্ত, যা মানুষকে আখিরাতের চেতনায় উজ্জীবিত করে এবং ঈমান ও আকিদায় সমৃদ্ধ করে। পাশাপাশি তা উন্নত মানবিক বোধ জাগ্রত করে এবং উত্তম হৃদয়-বৃত্তির অধিকারী করে। সর্বোপরি তা দান করে জীবন-যাপনের আদর্শ নীতিমালা।
২. এমন নির্দেশনা যা অনুধাবনে ইজতিহাদী পর্যায়ের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা অপরিহার্য। এই শ্রেণীর নির্দেশনাগুলো মূলত “আহকাম” বিষয়ক। “আহকাম” অর্থ হালাল-হারাম, জায়েয-না জায়েয এবং কর্তব্য ও কর্মপদ্ধতি বিষয়ক বিধান। আহকাম বিষয়ক অধিকাংশ নির্দেশনা সরাসরি কুরআন-সুন্নাহ থেকে বোঝার জন্য ইজতিহাদী পর্যায়ের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা অপরিহার্য। তাই তা অনুসরণের শরীয়তসম্মত পন্থা হচ্ছে:
ক. যিনি ইজতিহাদের যোগ্যতার অধিকারী তিনি ইজতিহাদের ভিত্তিতে আমল করবেন।
খ. যার ইজতিহাদের যোগ্যতা নেই তিনি মুজতাহিদের তাকলীদ বা অনুসরণ করবেন।
ইজতিহাদের যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও ইজতিহাদের প্রচেষ্টা কিংবা ইজতিহাদের যোগ্যতাহীন লোকের অনুসরণ, দুটোই শরীয়তের দৃষ্টিতে প্রত্যাখ্যাত।
উল্লেখ্য, ইজতিহাদের প্রবর্তন হয়েছে নিম্নোক্ত হাদীসটির মাধ্যমে। হযরত রাসূল (সা.) এরশাদ করেছেন, “যখন কোন ফকিহ বা বিচারক কোন বিষয়ে ইজতিহাদ করে এবং তা সঠিক হয়, তবে সে দ্বিগুন সওয়াব পাবে। আর সে যদি ইজতিহাদে ভুল করে, তবুও সে একগুন সওয়াব পাবে।” (বুখারী: ৬৯১৯)।
তবে সকলের পক্ষে ইজতিহাদ করা সম্ভবপর নয়। ইজতিহাদের জন্য যে যোগ্যতাগুলো অপরিহার্য তা হল, কুরআন-হাদীস থেকে মাসআলা বের করার জন্য আরবী ভাষা জানার পাশাপাশি কুরআনের শানে নূযুল, হাদীসের শানে উরুদ, মুহকাম, মুতাশাবিহাত, আম-খাস, মুজমাল, মুফাসসাল, ছরী-কিনায়া, নাসিখ মানসুখ, রিজালশাস্ত্র, জারাহ তাদীলের জ্ঞান।
ফিকাহ শাস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা:
যুগের সাথে সাথে নিত্য নতুন সমস্যার উদ্ভব হয়। যেমন: মানব ক্লোনিং, শেয়ার ব্যবসা ইত্যাদি। ইসলাম যেহেতু পূর্ণাংগ জীবনব্যবস্থা তাই উদ্ভুত নতুন সমস্যার সমাধান কুরআন-হাদীসে পাওয়া না গেলে তখন ইজতিহাদের মাধ্যমে সমাধান করার জন্য ফিকাহ সংকলন অপরিহার্য হয়ে পরে।
ক. কুরআনে কোন কোন বিষয়ে কেবলমাত্র মূলনীতিসমূহ বর্ণনা করা হয়েছে কিন্তু তার বিস্তারিত কোন ব্যাখ্যা দেওয়া হয় নাই। বিস্তারিত ব্যাখ্যা ছাড়া কখনও তা আমাদের পক্ষে উপলব্ধি করা এবং প্রাত্যহিক জীবনে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। তাই এর জন্য ফিকহ সংকলনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।
খ. কুরআন-হাদীসে একাধিক অর্থবোধক শব্দাবলী রয়েছে যা সামঞ্জস্য বিধানের দাবী রাখে। অন্যথায় কুরআন-হাদীসের উপর আমল করা দুষ্কর হয়ে যাবে। যেমন আল্লাহ বলেন, “আর তালাকপ্রাপ্তা নারী নিজেকে অপেক্ষায় রাখবে তিন কুরু পর্যন্ত।” (সূরা বাকারা : ২২৮)। এখানে কুরুহ শব্দের দ্বারা দুটি অর্থ ইঙ্গিত করা হয়, যার একটি হল পবিত্রতা ও অপরটি হল অপবিত্রতা। এখানে কোন অর্থে তা ব্যবহৃত হবে তার সমাধানের জন্য ফিকহশাস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।
গ. মাঝে মধ্যে পরস্পর বিরোধী হাদীসের মধ্যকার সঠিক সমাধানের জন্য ফিকহের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এক হাদীসে বলা হয়েছে, “সূরা ফাতিহা ছাড়া নামায হয় না।” আবার অন্য এক হাদীসে বলা হয়েছে, “ইমামের কিরাত হল মুক্তাদীর কিরাত।” এখন জামাআতের সাথে সালাত আদয় করলে কিরাত তিলওয়াত করতে হবে কিনা তার সমাধানের জন্য ফিকাহচর্চ্চা করতে হবে।
ইসলামী শরীয়াতে ফিকাহ শাস্ত্র একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিয়ামত পর্যন্ত সমসাময়িক যুগের সৃষ্ট বিভিন্ন পরিস্থিতি, হুকুম-আহকাম, আইন-কানুন ও বিধি-নিষেধ উদ্ভাবন, প্রবর্তন ও সমাধানের কোরআন-হাদীস সমর্থিত বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থার নাম ফিকাহ শাস্ত্র।

শেয়ার করুন

Leave a Comment