কারবালার শিক্ষা

মুহাররম ও আশুরা শোনার সাথে সাথে আমাদের মানসপটে ভেসে ওঠে কারবালার এক মর্মান্তিক, করুণ, নিষ্ঠুর, হৃদয়বিদারক, বিষাদময় ও ইসলামের ইতিহাসের এক কলংকজনক শোকাবহ ঘটনা। হযরত ইমাম হোসেন (রা.) এবং তার অনুসারীরা ইসলামের আদর্শকে সমুন্নত রাখতে গিয়ে, সত্য ও ন্যায়ের স্বপক্ষে অবস্থান করতে গিয়ে কারবালা প্রন্তরে ইয়াজিদ বাহিনীর হাতে নৃশংস ভাবে শাহাদাত বরণ করেণ। তার এ আত্মদান আমাদেরকে সকল অন্যায় ও অত্যচারের বিরুদ্ধে সোচ্ছার হতে অনুপ্রেরনা জোগায়। তিনি আমদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন কিভাবে জুলুমের মোকবিলা করতে হয়। জালিমের সংগে আতাত নয় প্রয়োজনে নিজের জীবন দিয়ে হলেও অন্যায় ও জুলুমের প্রতিবাদ কেরতে হবে। তিনি কোরানের হুকুম কে জীবন দিয়ে বাস্তবায়ন করেছেন। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেণ: ‘‘মুমিনদের মধ্যে কতক আল্লাহর সাথে কৃত ওয়াদা পূর্ণ করেছে। তাদের কেউ কেউ মৃত্যুবরণ করেছে এবং কেউ কেউ প্রতীক্ষা করছে। তারা তাদের সংকল্প মোটেই পরিবর্তন করেনি” (সূরা আহযাব: ২৩)।
১০ মহররম বা আশুরার দিন সৃষ্টির সূচনা লগ্ন থেকেই মহিমান্বিত ছিল। এই দিনে পৃথিবীর আরো অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। মহান আল্লাহ তায়ালা এই পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং এ দিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে। হযরত আদম আ: কে সৃষ্টি করা হয়। হযরত নূহ আ: মহাপ্লাবন থেকে মুক্তি পান। হযরত ইব্রহিম আ: নমরুদের অগ্নিকুন্ড থেকে মুক্তি পেয়েছেন। হযরত ইয়াকুব ও ইউসুফ আ: দীর্ঘ বিচ্ছেদেরপর মিলিত হন। হযরত ইউনুস আ: মাছের পেট থেকে মুক্ত হন। হযরত মূসা আ: স্বৈরশাসক ফেরাউনের কবল থেকে মুক্তি লাভ করে লোহিত সাগর পার হন আর ফেরাউন তার দলবলসহ লোহিত সাগরে নিমজ্জিত হয়। হযরত ঈসা আ: কে এই দিনেই ইয়াহুদদের চক্রান্ত থেকে মুক্ত করে চতুর্থ আসমানে উঠিয়ে নেয়া হয়। এ রকম অসংখ্য ঘটনায় তাৎপর্যমন্ডিত এ দিন। এই বিশেষ দিবসে হযরত হুসাইন (রা.) এর শাহাদাতের মাধ্যমে তাগুত ও জুলমের পরাজয় যে অনিবার্য এবং সত্য ও ইনসাফের বীজয় যে সুনিশ্চিৎ সেটা ঐতিহাসিক ভাবে প্রমানিত হয়েছে।
আশুরার বিশেষ ফজিলত:
কারবালার ইতিহাস স্মরণে আশুরা পালনের নামে যে সকল মাতম, মর্সিয়া, তাযিয়া মিছিল, শরীর রক্তাক্ত করাসহ যা কিছু করা হয় এর সাথে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই। এগুলো নি:সন্দেহে বিদআত। আশুরার জন্য শরীয়ত অনুমোদিত বিশেষ আমল হল রোজা পালন। এ ছাড়া আশুরার অন্য কোন আমল নেই। রাসূল (সাঃ) বলেন: “আমি আল্লাহ তাআলার কাছে আশাবাদী যে, আশুরার রোযার বিনিময় তিনি পূর্বের এক বছরের গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন।” (ইবনে মাজাহ : ১৭৩৮ )
আশুরা ও কারবালার শিক্ষা :
১. মিথ্যার সাথে আপোস না করা ও সত্যের পতাকাকে সমুন্নত রাখা। হযরত হোসাইন (রা.) ও আহলে বাইত এর কারবালার প্রান্তরে শাহাদাতের ঐতিহাসিক পটভূমির প্রথম শিক্ষা হচ্ছে একজন মু’মিন ও মর্দে মুজাহিদ কখনও অন্যায়ের সাথে আপোস করে না।
২. সর্বদা জুলুমের প্রতিবাদ করা। কোন রক্তচক্ষুর ধার না ধারা। মহানবী সা. বলেছেন: ‘‘অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে সত্য কথা বলা উত্তম জিহাদ’’ এ মহান আদর্শই হযরত হোসাইন (রা.) মুসলমানদের জন্য রেখে গেছেন।
৩. মিথ্যা ও জুলমের বিরুদ্ধে সংগ্রামের কালজয়ী চেতনা ধারণ করা।
প্রকৃতপক্ষে কারবালায় শাহাদাতের ঘটনা মুসলমানদের মধ্যে ইসলামের পূর্ণ জাগরণের কালজয়ী চেতনাকে চির জাগ্রত করে রেখেছে। তাই উপমহাদেশে স্বাধীনতা সংগ্রমের অন্যতম নেতা মাওলানা মোহাম্মদ আলী জাওহার (র.) বড় সুন্দর ভাষায় বর্ণনা করেছেন:
(কতলে হুসাইন আসলে মে মরগে এযিদ থা, ইসলাম জিন্দা হুতা হায় হার কারবালাকে বাদ।)
‘‘হোসাইনের শাহাদাত মূলত ইয়াযিদের মৃত্যু, ইসলাম পুনর্জীবিত হয় প্রতি কারবালার শেষে।’’
৪. জীবন ও সম্পদ দিয়ে আল্লাহর রাহে সংগ্রাম, ত্যাগ ও কুরবানীর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন।
কারবালার প্রান্তরে ইমাম হোসাইনের (রা.) শাহাদাতের ইতিহাস মুসলিম মিল্লাতের সামনে আল্লাহর রাহে জীবন সম্পদ সবকিছু বিলিয়ে সংগ্রামী প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত হওয়ার মহান শিক্ষাকেই জাগ্রত করেছে। আল্লাহর পথে ত্যাগ ও কুরবানীর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করে গেছেন। তাই তো কবি নজরুল ইসলাম যথার্থই বলেছেন ‘‘ফিরে এলো আজ সেই মহর্রম মাহিনা, ত্যাগ চাই মর্সিয়া ক্রন্দন চাহি না।’’
৫. জয়-পরাজয় দৃষ্টিভঙ্গির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত:
৬১ হি. ১০ মহররম কারবালায় ইমাম হোসাইন (রা.) মুসলিম উম্মার সামনে জয় পরাজয়ের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দেখিয়েছেন যে শহীদ হওয়া জীবনের পরাজয় নয়। জালিম সাম্রাজ্য যত শক্তিশালী হোক না কেন, তার পতন হবেই। যার প্রমান ইয়াজিদের রাজত্ব, যা চিরস্থায়ী হয়নি এবং এই পরিবার আর কোনদিন শাসন ক্ষমতা লাভ করতে পারেনি। কারবালার হত্যাযজ্ঞে যারা অংশ গ্রহণ করেছিল তারাও দুই বছরের মধ্যে ধ্বংস হয়ে গেছে।
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেণ: “যারা ঈমান এনেছে, দেশ ত্যাগ করেছে এবং আল্লাহর রাহে নিজেদের জান ও মাল দিয়ে জেহাদ করেছে, তাদের বড় মর্যাদা রয়েছে আল্লাহর কাছে আর তারাই সফলকাম।” (সূরা তাওবা: ২০)
৬. জীবনের থেকে এমন কি হুসাইন (রা.) ও আহলে বায়তের জীবন থেকেও ইসলামী আদর্শ ও মূল্যবোধের মর্যাদা অনেক বেশী। সেই আদর্শ যদি হুমকির সম্মুখীন হয় তাহলে সমগ্র মুসলিম উম্মাহকে ইসলামের স্বপক্ষে ঝাপিয়ে পরতে হবে এটাই কারবালার মূল চেতনা।

শেয়ার করুন

Leave a Comment