আদর্শ নাগরিকের দায়িত্ব ও কর্তব্য

একটি জাতির দায়িত্ব কী হবে সে সম্পর্কে কোরআনে রয়েছে স্পষ্ট নির্দেশনা। আল্লাহ বলেন, ‘তারা এমন লোক, যাদের আমি পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত করলে তারা নামাজ কায়েম করবে, জাকাত প্রদান করবে এবং সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করবে।’ (সূরা হজ : ৪১)। এখানে আল্লাহ স্বাধীন মুসলিম জনগোষ্ঠীর দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা তুলে ধরেছেন। কোনো ভূখ-ে মুসলমাদের বিজয় ও স্বাধীনতা অর্জিত হলে তারা সামাজিক জীবনে দুর্নীতি-দুষ্কৃৃতি, নাশকতা ও অরাজকতা সৃষ্টির পরিবর্তে নামাজ কায়েম করবে,  জাকাত প্রদান করবে, প্রশাসনিক ক্ষমতার মাধ্যমে সমাজে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার স্বার্থে সৎকাজের নির্দেশ প্রদান করার পাশাপাশি অসৎকাজের মূলোৎপাটন করবেÑ এ দায়িত্বগুলো পালন করলেই তাদের জন্য আসমান থেকে নেমে আসবে কল্যাণ ও বরকতের বারিধারা।

স্বদেশপ্রেম
সব নবী ও রাসুল নিজের দেশ এবং জাতিকে ভালোবেসেছেন। স্বদেশ ও স্বজাতির প্রতি প্রেম ও মমত্ববোধ হচ্ছে নবীদের আদর্শ। পবিত্র মক্কার প্রতি ছিল আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর অপরিসীম ভালোবাসা। চরম নির্যাতন ও নিপীড়নের মুখে মদিনায় হিজরত করার সময় জন্মভূমি মক্কার পানে তাকিয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে তিনি বলে ছিলেন, ‘হে মক্কা! প্রিয় জন্মভূমি আমার! তোমার শহর কতই না সুন্দর! যদি তোমার নিষ্ঠুর অধিবাসীরা আমাকে বের করে না দিত, আমি কখনোই তোমাকে ছেড়ে যেতাম না।’ (তিরমিজি : ৩৯৫২)। এ অভিব্যক্তির মাঝে মাতৃভূমির প্রতি তাঁর প্রগাঢ় ভালোবাসা প্রকাশ পেয়েছে। ইবরাহিম (আ.) এর দোয়ার মাঝেও ফুটে উঠেছে স্বজাতির প্রতি অকৃতিম মমত্ববোধ ও ভালোবাসা। কোরআনের ভাষায়Ñ ‘যখন ইবরাহিম (আ.) বললেন, হে প্রতিপালক! এ ভূমিকে তুমি শান্তিময় করো এবং এর অধিবাসীদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও কেয়ামতে বিশ্বাস করে, তাদের তরতাজা ফলমূল দ্বারা রিজিক দান করো। (সূরা বাকারা : ১২৬)। এখানে দেশ ও জাতির প্রতি ইবরাহিম (আ.) এর অগাধ ভালোবাসা ও কল্যাণকামিতা ফুটে উঠেছে। দেশ ও জাতির প্রতি এ প্রেম-ভালোবাসার চেতনা লালন করা ঈমানের দাবি।

পরিবেশ সুরক্ষা
দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ ও জলবায়ু সুরক্ষায় সব নাগরিককে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.) অহেতুক গাছপালা কাটা, বনাঞ্চল উজাড় করা ও প্রবহমান পানিতে মলমূত্র ত্যাগ করতে নিষেধ করেছেন। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার্থে তিনি বনায়নের প্রতি গুরুত্বারোপ করে বলেছেন, ‘কোনো মুসলিম যে কোনো গাছই রোপণ করুক না কেন, তা থেকে মানুষ, পশু ও পাখিরা যা কিছু খায়, কেয়ামত পর্যন্ত তা তার জন্য সদকা হিসেবে অব্যাহত থাকে।’ (মুসলিম : ৪০৫৩)। তিনি বনাঞ্চল বাড়াতে এমনও বলেছেন যে, ‘কেয়ামত হয়ে যাচ্ছে এ অবস্থায়ও হাতে রক্ষিত গাছের চারাটি রোপণ করে দাও!’

দেশ প্রতিরক্ষা
দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা প্রতিটি নাগরিকের ঈমানি দায়িত্ব। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও অখ-তা হুমকির সম্মুখীন হলে ঐক্যবদ্ধভাবে জীবন বাজি রেখে শত্রুর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে দেশ পতিরক্ষায় সর্বশক্তি প্রয়োগ করা প্রতিটি মুসলমানের জরুরি কর্তব্য। জাতীয় অখ-তা রক্ষায় দেশের সীমান্ত পাহারা দেওয়ার ফজিলত সম্পর্কে রাসুল (সা.) বলেন, ‘দুটি চোখকে কোনো দিন জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না, যে চোখ আল্লাহর ভয়ে কেঁদেছে, আর যে চোখ আল্লাহর পথে রাত জেগে সীমান্ত পাহারা দিয়েছে।’ (তিরমিজি : ১৬৩৯)। 

রাষ্ট্রের আনুগত্য
একটি রাষ্ট্রের নাগরিকের প্রধান দায়িত্বই হচ্ছে রাষ্ট্রে প্রতি আনুগত্য স্বীকার করা, দেশের সংবিধান ও প্রচলিত আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা এবং রাষ্ট্রিয় বিধিবিধান মেন চলা। রাসুল (সা.) এরশাদ করেন, ‘শ্রবণ করা, অনুসরণ করা, মেনে চলা সুদিন ও দুর্দিনে সব অবস্থায়তেই নাগরিকদের জরুরি কর্তব্য।’ (মুসলিম : ৩৪১৯)। সবধরনের নাশকতামূলক কর্মকা- ও রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপ থেকে দূরে থাকা ও তা প্রশ্রয় না দেওয়া, সন্ত্রাস, দুর্নীতি স্বজনপ্রীতি, নিয়োগ বাণিজ্য, খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল ইত্যাদি প্রতিরোধে প্রশাসনকে সহযোগিতা করাও নাগরিকদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। নাগরিকের ওপর আরোপিত কর, জাকাত ও উশর প্রদান করে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখাও একজন আদর্শ নাগরিকের পবিত্র দায়িত্ব। 

নাগরিকদের জাবদিহিতা
রাসুলে আকরাম (সা.) নাগরিকদের নিজ নিজ দায়িত্ব বণ্টন করে দিয়েছেন এবং দায়িত্বশীলকে সে দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনে উদ্বুদ্ধ করে বলেছেন, ‘তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। তোমাদের প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। রাষ্ট্রপ্রধান একজন দায়িত্বশীল, তাকে দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। স্বামী তার পরিবার-পরিজনের দায়িত্বশীল। স্ত্রী তার স্বামীর গৃহের সন্তানদের দায়িত্বশীল। সুতরাং তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (বোখারি : ২২৭৮)। দেশের নাগরিকদের উচিত ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার মাধ্যমে একটি সুখী, সমৃদ্ধিশালী ও কল্যাণ রাষ্ট্র গঠনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা। 

শেয়ার করুন

Leave a Comment