সুদ একটি অভিশাপের নাম

শাহ মাহমুদ হাসান

 

সুদ হচ্ছে অর্থনৈতিক শোষণ ও বৈষম্যের হাতিয়ার। সুদ শ্রেণি বৈষম্যের এমন এক মারণাস্ত্র, যা সব ধরনের নৈতিকতা ও মানবিকতাকে ধ্বংস করে দেয়। সুদী ব্যবস্থার কারণে অন্তরে জন্ম নেয় কৃপণতা, নির্দয়তা, অর্থলিপ্সা প্রভৃতি। সুদ হচ্ছে মানবতা ও নৈতিকতাবিরোধী আয়ের অন্যতম মাধ্যম, যা মানুষের জীবনে বড় ধরনের বিপর্যয় ও সর্বনাশ ডেকে আনে। অনেক সময় সুদের কশাঘাতে জর্জরিত মানুষটিকে সুদের ঘানি টানতে টানতে বাস্তুভিটা হারা হয়ে নিঃস্ব হতে হয়। আর এতে তৈরি হয় সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট। বেড়ে যায় চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, রাহাজানির মতো সামাজিক অপরাধ। সুদের মাঝে শোষণ, বঞ্চনা ও অপরাধ প্রবণতার যাবতীয় উপকরণ থাকার কারণে আল্লাহ তায়ালা সুদকে করেছেন অবৈধ। তিনি এরশাদ করেন, ‘তিনি ক্রয়-বিক্রয়কে করেছেন বৈধ আর সুদকে করেছেন হারাম।’ (সূরা বাকারা : ২৭৫)। 
সুদ একটি অমানবিক ও নির্দয় ব্যবস্থা। সুদভিত্তিক অর্থব্যবস্থার কারণেই মানুষের মাঝে প্রকট হচ্ছে ধনী-গরিবের শ্রেণিভেদ। একদিকে মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে সম্পদ জমা হয়, অন্যদিকে সমাজের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী দিন দিন নিঃস্ব থেকে নিঃস্বতর হয়ে পড়ছে। সম্প্রীতি, পারস্পরিক আস্থা, সহানুভূতি প্রভৃতি মানবিক মূল্যবোধ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। তাই আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তিনি সুদকে ধ্বংস করে দেন এবং দান-সদকাকে বৃদ্ধি করে দেন।’ (সূরা বাকারা : ২৭৬)। এ ধ্বংস ও পতন হতে পারে বিভিন্নভাবে। যেমন আসমানি-জমিনি বালা-মুসিবত, প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাধ্যমে সুদের অর্থ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। আবার আসতে পারে কোনো দুরারোগ্য ব্যাধি, যা সুদখোরকে তিলে তিলে নিঃশেষ করে দিতে পারে। 
সুদ যে অর্থনীতিতে কোনো ধরনের সমৃদ্ধি আনে না সে ব্যাপারে কোরআনের ঘোষণা হচ্ছে, ‘আর তোমরা যে সুদ দিয়ে থাক, মানুষের সম্পদ বৃদ্ধি পাওয়ার জন্য তা আল্লাহর কাছে বৃদ্ধি পায় না। পক্ষান্তরে, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় পবিত্র অন্তরে যারা দিয়ে থাকে, অতএব, তারাই দ্বিগুণ লাভ করে।’ (সূরা রুম : ৩৯)।
সুদী ব্যবস্থা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধের শামিল। আল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধে নেমে পরাজয় ও পতন ছাড়া কিছুই আশা করা যায় না। এরশাদ হচ্ছে, ‘হে মুমিনরা! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যা অবশিষ্ট আছে, তা পরিত্যাগ কর, যদি তোমরা মোমিন হও। আর যদি তোমরা সুদ পরিত্যাগ না কর তবে আল্লাহ ও রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা শুনে নাও।’ (সূরা বাকারা : ২৭৯)। সুতরাং সুদের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখে আল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া চরম নির্বুদ্ধিতা বৈ কিছুই নয়। 
কোরআন-হাদিসে বারবার সুদের ভয়াবহ শাস্তির হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে যাতে মানুষ এ ঘৃণিত অপরাধ থেকে বিরত থাকে। মুসতাদরাক হাকেমের বর্ণনায় এসেছে, ‘যখন কোনো জাতির মধ্যে ব্যভিচার ও সুদ ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ে, তখন আল্লাহ পাক সে জাতিকে ধ্বংস করার নির্দেশ দেন।’ বোখারি শরিফের বর্ণনায় এসেছে, সুদখোরকে মৃত্যুর পর রক্তের নদীতে সাঁতরানোর শাস্তি দেওয়া হবে। সে সাঁতরাবে আর তাকে পাথর ছুড়ে নদীর মাঝখানে পৌঁছে দেওয়া হবে। ইবনে মাজাহ শরিফের বর্ণনায় এসেছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মেরাজের রাতে এমন কিছু লোক দেখতে পেলাম, যাদের পেটগুলো বিশাল ঘরের মতো সামনের দিকে বের হয়ে আছে এবং তা ছিল অসংখ্য সাপ ও বিচ্ছুতে পরিপূর্ণ। যেগুলো পেটের বাইরে থেকে দেখা যাচ্ছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে জিবরাইল! এরা কারা? তিনি উত্তরে বললেন, এরা সুদখোরের দল।’
সুদ একটি জঘন্য ও নিকৃষ্ট অপরাধ যা সব পাপাচারের ভয়াবহতাকে হার মানায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, জেনে-শুনে এক দিরহাম পরিমাণ সুদ খাওয়া আল্লাহর নিকট ৩৬ জন নারীর সঙ্গে ব্যভিচারের চাইতে অধিক গোনাহের কাজ।’ (মুসদাদে আহমাদ : ২১৯৫৭)। তিনি আরও বলেছেন, ‘সুদের সত্তরটি স্তর রয়েছে। এর সর্বনিম্নটি হলো নিজের মায়ের সঙ্গে ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার সমপর্যায়ের গোনাহ।’ (ইবনে মাজাহ : ২২৭৪)। সুদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাই অভিশপ্ত জীবনের গ্লানি বয়ে বেড়ায়। রাসুল (সা.) যাদের প্রতি অভিশাপ দিয়েছেন তাদের মধ্যে রয়েছে সুদ গ্রহীতা ও সুদ দাতা। (বোখারি : ৪৫৯৬)। প্রত্যক্ষভাবে সুদ দেওয়া-নেওয়া থেকে বেঁচে থাকলেই সুদের শাস্তি ও অভিশাপ থেকে বাঁচা যাবে না বরং সুদভিত্তিক সব কার্যক্রম থেকে নিজেদের বিরত রাখতে হবে। রাসুল (সা.) সুদখোর, সুদদাতা, সুদের হিসাব রক্ষক এবং সাক্ষীদের ওপর অভিশাপ করেছেন এবং বলেছেন, তারা সবাই সমান অপরাধী। (মুসলিম : ৪১৭৭)। সুদ মানুষকে দুনিয়া ও আখেরাতে ব্যর্থ, হতভাগ্য ও নিকৃষ্ট মানুষে পরিণত করে। তাই যে কোনো মূল্যে সুদের ভয়াবহ অভিশাপ ও শাস্তি থেকে আমাদের আত্মরক্ষার পথ বের করে পরকালীন চীরস্থায়ী জীবনের ধ্বংসের পথ পরিহার করতে হবে।

শেয়ার করুন

Leave a Comment