বিজয় আল্লাহর নেয়ামত

শাহ মাহমুদ হাসান।।

মহান আল্লাহ একমাত্র মানুষকেই স্বাধীন সত্তা হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। মানুষের স্বাধীন বিচরণ ক্ষেত্র হিসেবে সৃষ্টি করেছেন বিশাল পৃথিবী। আর পরাধীনতা মানবজীবনের সবচেয়ে বড় বঞ্চনার নাম। স্বাধীনতা ছাড়া ইসলাম প্রতিষ্ঠা ও পালন কোনোটাই যথার্থভাবে সম্ভব নয়। নবীদের প্রধান দায়িত্ব ও মিশন ছিল আল্লাহর দ্বীনের বিজয় অর্জন করে স্বাধীনভাবে আল্লাহর ইবাদত করার পরিবেশ সৃষ্টি করা। কোরআনের ভাষায়Ñ ‘মহান আল্লাহ তাঁর রাসুলকে হেদায়েত ও সত্য ধর্ম ইসলামসহ পাঠিয়েছেন। যাতে এই দ্বীন ইসলামকে অন্য সব ধর্মের ওপর বিজয়ী করতে পারেন।’ (সূরা ফাতাহ : ২৮)। 

দ্বীন ইসলামকে বিজয়ী করার সংগ্রামে নবীরা জীবন বাজি রেখেছেন। মুসা (আ.) কে ফেরাউনের কবল থেকে বনি ইসরাইলকে মুক্ত করে স্বাধীন ভূখ-ে স্বাধীনভাবে আল্লাহর দাসত্ব করার দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছিলেন। কোরআনের ভায়ায়Ñ ‘মুসা বলল, হে ফেরাউন! আমি বিশ্ব পালনকর্তার পক্ষ থেকে আগত রাসুল। অল্লাহর পক্ষ থেকে যে সত্য এসেছে, তার ব্যতিক্রম কিছু না বলার ব্যাপারে আমি সুদৃঢ়। আমি তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট প্রমাণ নিয়ে এসেছি। সুতরাং তুমি বনি ইসরাইলকে মুক্ত করে আমার সঙ্গে পাঠিয়ে দাও।’ (সূরা আরাফ : ১০৪-১০৫) 
সে কারণেই মুসা (আ.) জন্মভূমি মিশর ছেড়ে একটি স্বাধীন ভূখ-ের সন্ধানে লহিত সাগর পাড়ি দিয়েছিলেন। মুসা (আ.) এর বিজয়ের ইতিহাস প্রসঙ্গে কোরআনে এরশাদ হয়েছেÑ ‘যখন মুসা (আ.) স্বজাতিকে বললেন, তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ করো, যখন তিনি তোমাদের ফেরাউনের সম্প্রদায়ের কবল থেকে স্বাধীন করেছেন। তারা তোমাদের অত্যন্ত নিকৃষ্ট ধরনের শাস্তি দিত, তোমাদের ছেলেদেরকে হত্যা করত এবং তোমাদের মেয়েদের জীবিত রাখত এবং এতে তোমাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে বিরাট পরীক্ষা হয়েছিল। যখন তোমাদের পালনকর্তা ঘোষণা করলেন, যদি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো, তবে তোমাদের আরও দেব এবং যদি অকৃতজ্ঞ হও তবে নিশ্চয়ই আমার শাস্তি হবে কঠোর।’ (সূরা ইবরাহিম : ৬-৭)। এখানে মুক্তি ও বিজয় লাভের পর মুসা (আ.) কে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে, এ বিজয় বা মুক্তি মহান আল্লাহর দান এবং এর জন্য উচিত তার প্রতি কৃতজ্ঞতা আদায় করা। আর এজন্য মুসা (আ.) বিজয় দিবসে (১০ মহররম) কৃতজ্ঞতাস্বরূপ রোজা পালন করেছিলেন। 
সঠিকভাবে এবং স্বাধীনভাবে আল্লাহর গোলামি করতে হলে মানুষের জন্য দরকার একটি স্বাধীন ভূখ-ের। এজন্য বিশ্বনবী (সা.) প্রিয় মাতৃভূমি মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় গিয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। মক্কা বিজয়ের ঐতিহাসিক ভাষণে তার অভিব্যক্তি ছিল এমনÑ ‘সব প্রশংসা মহান আল্লাহর, যিনি তাঁর প্রতিশ্রুতিকে (বিজয়) সত্যে পরিণত করেছেন এবং আপন বান্দাকে বিজয়ী করেছেন এবং শত্রুপক্ষকে করেছেন পরাজিত।’ (বোখারি : ১৭০৩)। 
এখানে নিজেদের পরিকল্পনা ও বাহিনীকে কৃতিত্ব না দিয়ে বিজয়ের পুরো কৃতিত্ব দেওয়া হয়েছে আল্লাহ তায়ালাকে। তাই মহানবী (সা.) মক্কা বিজয়ের শুকরিয়া আদায় করেছেন শোকরানা নামাজ আদায়ের মাধ্যমে।
একটি বিজয়ী ও স্বাধীন জাতির দায়িত্ব কী হবে, সে সম্পর্কে কোরআনে রয়েছে স্পষ্ট নির্দেশনা। আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেনÑ ‘তারা এমন লোক, যাদের আমি পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত করলে তারা নামাজ কায়েম করবে, জাকাত প্রদান করবে এবং সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করবে।’ (সূরা হজ : ৪১)। 
এখানে আল্লাহ তায়ালা স্বাধীনতা অর্জনকারী একটি বিজয়ী মুসলিম জনগোষ্ঠীর নেতাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা তুলে ধরেছেন। মুসলমানদের স্বাধীনতা ও বিজয় অর্জিত হলে তারা সামাজিক জীবনে দুর্নীতি-দুষ্কৃৃতি, নাশকতা ও অরাজকতা সৃষ্টির পরিবর্তে নামাজ কায়েম করবে। তারা ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠায় জাকাত প্রদান করবে। প্রশাসনিক ক্ষমতার মাধ্যমে সমাজে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার স্বার্থে সৎকাজের নির্দেশ প্রদান করার পাশাপাশি অসৎকাজের মূলোৎপাটন করবে। 
স্বাধীনতা ও বিজয়ের জন্য বেশি বেশি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা সব মোমিনের ঈমানি দায়িত্ব। কোরআনের সর্বশেষ অবতীর্ণ সূরাটি বিজয় লাভের পর করণীয় ও বিজয় উদযাপনের পন্থা এবং পদ্ধতি সম্পর্কে নাজিল হয়েছে। এরশাদ হচ্ছেÑ ‘যখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় আসবে এবং আপনি মানুষকে দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করতে দেখবেন, তখন আপনার পালনকর্তার পবিত্রতা বর্ণনা করুন এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাকারী।’ (সূরা নাসর : ১-৩)। 
সুতরাং বিজয় লাভের পর বেশি করে আল্লাহর শুকরিয়া এবং ক্ষমা প্রার্থনা করা কোরআনের বিধান। বিজয়ের দিনে ইসলামের শিক্ষা হলো বিনীত হওয়া, উদ্ধত না হওয়া, অহংকারী না হওয়া, জালেম না হওয়া এবং আচরণে সীমালঙ্ঘনকারী না হওয়া। বিজয়ের দিনে ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও প্রতিশোধ না নেওয়া এবং সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা। মক্কা বিজয়ের পর রাসুল (সা.) তাই করেছিলেন। মক্কা বিজয়ের দিন রাসুল (সা.) এর সামনে অবনত মস্তকে দাঁড়িয়ে ছিল মক্কার অপরাধীরা। আর রাসুল (সা.) এর যে-কোনো নির্দেশ পালনের অপেক্ষায় ছিল ১০ হাজার সশস্ত্র মুসলিম যোদ্ধা। 
যদি রাসুল (সা.) বলতেন, ‘যে হাত মুসলমানদের ওপর নিষ্ঠুরতা চালিয়েছে, সে হাতগুলো কেটে ফেল! যারা মুসলমানদের হত্যা করেছে তাদের মস্তক উড়িয়ে দাও!’ তাহলে মক্কাবাসী অবাক হতো না। কিন্তু রাসুল (সা.) এমন কোনো কিছুই বললেন না। তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘হে কোরাইশরা! তোমরা আমার কাছ থেকে আজ কেমন ব্যবহার আশা করো?’ তারা বলল, সম্মানিত ভাই ও ভ্রাতুষ্পুত্রের মতো! তিনি বললেন, ‘আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই, তোমরা সবাই মুক্ত!’ এভাবে বিজয়ের দিন অপরাধীদের জন্য সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা দিয়ে তিনি ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন।

শেয়ার করুন

Leave a Comment