ধৈর্য সফলতা ও মুক্তির সোপান

শাহ মাহমুদ হাসান

সবর বা ধৈর্যের অর্থ হলো দুঃখ-কষ্ট, রোগ-শোক, বিপদ-আপদ ও বিচ্ছেদের মতো সংকটে বিচলিত ও অস্থির না হয়ে ওই সংকট থেকে উত্তরণের সর্বাত্মক চেষ্টা করা এবং আল্লাহর সাহায্যের প্রতীক্ষায় থাকা। রাসুলে আকরাম (সা.) বলেছেন, ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা হচ্ছে তিন ভাগে বিভক্ত। এক. বিপদের সময় ধৈর্য। দুই. আল্লাহর নির্দেশ পালনের ক্ষেত্রে ধৈর্য। তিন. পাপ কার্য থেকে বিরত থাকার ক্ষেত্রে ধৈর্য। একবার রাসুল (সা.) এক মহিলার পাশ দিয়ে অতিক্রম করে যাচ্ছিলেন। সে একটি কবরের পাশে বসে কাঁদছিল। তিনি তাকে বলেন, ‘আল্লাহকে ভয় করো এবং ধৈর্যধারণ করো।’ সে বলল, নিজের পথে কেটে পড়। তুমি তো আর আমার মতো বিপদে পড়নি। সে নবী করিম (সা.) কে চিনতে পারেনি। তাকে বলা হলো, তিনি নবী রাসুলুল্লাহ (সা.)। ফলে সে (ভীত-শঙ্কিত হয়ে) নবী করিম (সা.) এর বাড়ির দরজায় হাজির হলো। সেখানে সে কোনো দ্বাররক্ষী দেখতে পেল না। সে বলল, আমি আপনাকে চিনতে পারিনি। নবী করিম (সা.) বলেন, ‘বিপদের প্রথম আঘাতে ধৈর্যধারণই হচ্ছে প্রকৃত ধৈর্য।’ (বোখারি : ৬৭৩৫)। এখানে রাসুল (সা.) প্রকৃত ধৈর্যের স্বরূপ উদ্ঘাটন করেছেন। অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈমানকেই ধৈর্য বলে আখ্যায়িত করেছেন। ঈমান সম্পর্কে রাসুল (সা.) কে প্রশ্ন করা হলে তিনি এককথায় বলেছিলেন, ‘ঈমান হচ্ছে ধৈর্যধারণ।’ কারণ ধৈর্যশীল ব্যক্তিরা চরম সংকট ও বিপদের সময়ও ঈমানের ওপর অটল-অবিচল থেকে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারে। ধৈর্যশীলতা মোমিনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য, যা তাকে অন্যদের থেকে মহিমান্বিত ও মর্যাদাবান করেছে। রাসুলে আকরাম (সা.) বলেছেন, ‘মোমিন ব্যক্তির ব্যাপারটাই আশ্চর্যজনক। তার প্রতিটি কাজই তার জন্য কল্যাণকর। এটা (সৌভাগ্য) মোমিন ছাড়া আর কারও হয় না। সে দুর্দশাগ্রস্ত হলে ধৈর্যধারণ করে, তা তার জন্য কল্যাণকর। সুদিন দেখা দিলে সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, তা-ও তার জন্য কল্যাণকর।’ (মুসলিম : ৭৬৯২)। ধৈর্য হচ্ছে আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার জন্য এক বড় পুরস্কার। এ পুরস্কার থেকে যে বঞ্চিত, সে অনেক বড় কল্যাণ থেকে বঞ্চিত। তাই আমাদের ধৈর্যশীল হওয়ার অনুশীলন করতে হবে। ধৈর্যশীল হওয়ার সদিচ্ছা থাকলে আল্লাহর সাহায্য আসবে। রাসুলে আকরাম (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ধৈর্যধারণ করতে চায় আল্লাহ তাকে ধৈর্যশীল করে দেন। ধৈর্যের চেয়ে উত্তম ও সুপ্রশস্ত অন্য কোনো দান আল্লাহ কাউকে প্রদান করেননি।’ (বোখারি : ১৪০০)। ধৈর্যশীলদের আল্লাহ তায়ালা পছন্দ করেন। আল্লাহ তায়ালা ধৈর্যশীলদের সঙ্গেই থাকেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, হে মোমিনরা! তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য কামনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে রয়েছেন।’ (সূরা বাকারা : ১৫৩)। ওই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা নামাজের আগে ধৈর্যের কথা বলেছেন এবং আল্লাহর সাহায্য লাভের উপায় হিসেবে নামাজের পাশাপাশি ধৈর্যশীলতাকে গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন। এজন্য সমস্যায় পড়লেই ধৈর্যহারা হওয়া যাবে না; বরং আল্লাহ তায়ালার সাহায্য কামনা করে বিপদ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। জীবনে সমস্যা-সংকট ও বাধা-বিপত্তি আসবেই। ধৈর্য ও সহনশীলতার মাধ্যমে এসব সমস্যা-সংকট থেকে মুক্তির পথ বের করে জীবনে লক্ষ্যপানে এগিয়ে যেতে হবে। আর ধৈর্যধারণ করলে সুখ-শান্তি আসবেই। এ ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালার প্রতিশ্রুতি হচ্ছেÑ ‘আল্লাহ অতিসত্বর কষ্টের পর সুখ দেবেন।’ (সূরা তালাক : ৭)। এ আয়াতের শিক্ষা হচ্ছে কষ্ট ও বিপদের মুহূর্তটুকু ধৈর্যধারণ করতে হবে; তাহলে জীবনের কাক্সিক্ষত সুখ-শান্তি আসবেই। 
তবে ধৈর্যধারণের কাজটি যে অত সহজ নয়, সে ব্যাপারটিও কোরআনে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘তোমার ওপর যে বিপদ আসে তাতে ধৈর্যধারণ করো। নিশ্চয়ই এগুলো অন্যতম দৃঢ় সংকল্পের কাজ।’ (সূরা লোকমান : ১৭)। ধৈর্যধারণের মতো কঠিন কাজের পুরস্কারও অপরিসীম। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদের অগণিত পুরস্কার দেওয়া হবে।’ (সূরা জুমার : ১০)। 
ধৈর্যধারণের মাধ্যমে বিপদ-আপদ মোকাবিলার মাঝে রয়েছে আল্লাহর অপার সন্তুষ্টি ও পুরস্কার। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘পূর্ব ও পশ্চিম দিকে তোমাদের মুখ ফেরানোতে কোনো পুণ্য নেই; কিন্তু পুণ্য আছে অর্থ সংকটে, দুঃখ-ক্লেশে ও সংগ্রামে-সংকটে ধৈর্যধারণ করলে।’ (সূরা বাকারা : ১৭৭)। 
ধৈর্য হলো সফলতার সোপান। সূরা আসরে সফলতা ও মুক্তি লাভের যে চারটি কাজের কথা বলা হয়েছে তার মধ্যে ধৈর্য অন্যতম। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘হে ঈমানদাররা ধৈর্যধারণ করো এবং মোকাবিলায় দৃঢ়তা অবলম্বন করো, আর আল্লাহকে ভয় করতে থাক, যাতে তোমরা সফলতা লাভে সমর্থ হতে পার।’ (সূরা আলে ইমরান : ২০০)। সুতরাং জীবনের উন্নতি, সফলতা এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের একটি বড় মাধ্যম হচ্ছে ধৈর্য। এজন্য আমাদের উচিত বিপদে ভেঙে না পড়ে সবর ও ধৈর্যের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য প্রত্যাশী হওয়া।

শেয়ার করুন

Leave a Comment