ইসলামে ধর্ষণের শাস্তি

শাহ মাহমুদ হাসান

 

 

ধর্ষণের ব্যাপকতা ও ভয়াবহতার মাত্রা সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে। প্রায়ই পত্রিকায় প্রধান শিরোনাম হিসেবে উঠে আসে ধর্ষণের পাশবিক ও নিষ্ঠুর খবর। ধর্ষণের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না কোমলমতি শিশুরাও। ধর্ষণের এ ভয়াবহ চিত্র আঁতকে ওঠার মতো। বিচারহীনতা ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাবে ধর্ষণের ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলেছে। কাজেই ধর্ষকদের অতি দ্রুত বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। ধর্ষণ বন্ধে এর কোনো বিকল্প নেই। আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে থেকে ইসলাম সে কাজটিই করেছে। ধর্ষকদের কোনোভাবেই আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া চলবে না। ক্ষমতাবান বা প্রভাবশালী বলে কোনো ধর্ষক যেন পার পাওয়ার সুযোগ না পায়, তা সুনিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

ধর্ষণের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ধারা ৯-তে বলা হয়েছে : ‘যদি কোনো পুরুষ কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করেন, তাহলে তিনি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদ-ে দ-িত হবেন এবং অতিরিক্ত অর্থদ-েও দ-িত হবেন।’ আর ধর্ষণের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ‘যদি কোনো পুরুষ বিবাহবন্ধন ব্যতীত ষোল বৎসরের অধিক বয়সের কোন নারীর সহিত তাহার সম্মতি ব্যতিরেকে বা ভীতি প্রদর্শন বা প্রতারণামূলকভাবে তাহার সম্মতি আদায় করিয়া, অথবা ষোল বৎসরের কম বয়সের কোনো নারীর সহিত তাহার সম্মতিসহ বা সম্মতি ব্যতিরেকে যৌনসঙ্গম করেন, তাহা হইলে তিনি উক্ত নারীকে ধর্ষণ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবেন।’ ইসলামের সঙ্গে এ সংজ্ঞার তেমন কোনো বিরোধ না থাকলেও কিছুটা অসামঞ্জস্যতা রয়েছে। ইসলাম সম্মতি-অসম্মতি উভয় ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের বিবাহবহির্ভূত দৈহিক সম্পর্ককে দ-নীয় অপরাধ সাব্যস্ত করেছে। কিন্তু আমাদের দেশীয় এ আইনে শুধু অসম্মতির ক্ষেত্রে অপরাধ বলা হয়েছে। দেশীয় আইনে ধর্ষণের কারণে মৃত্যু না হলে তার মৃত্যুদ- নেই। শুধু যাবজ্জীবন কারাদ- ও অর্থদ- রয়েছে। পক্ষান্তরে ইসলামে ব্যভিচারের শাস্তি ১০০টি বেত্রাঘাত ও মৃত্যুদ-। আর ধর্ষণের কারণে মৃত্যু হলে, প্রথমে ধর্ষক ব্যভিচারের শাস্তি পেয়ে পরে হত্যার শাস্তি পাবে। 

দরকার ব্যভিচারে ঘৃণাবোধ তৈরি
জেনা-ব্যভিচার, কদর্য ও নিকৃষ্ট অনাচার। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমরা জেনা-ব্যভিচারের কাছেও যেও না, নিশ্চয়ই এটি অশ্লীল ও মন্দ পথ।’ (সূরা বনি ইসরাইল : ৩২)।  প্রচলিত আইনে ব্যভিচারের প্রতি ঘৃণাবোধ সৃষ্টি করা গেলে ধর্ষণও বন্ধ হবে। ব্যভিচার চালু রেখে ধর্ষণ বন্ধ করা যাবে না। প্রখ্যাত তাফসিরবিদ ইমাম কুরতুবি (রহ.) বলেন, ‘ব্যভিচার করো না’ এর চেয়ে ‘ব্যভিচারের কাছেও যেও না’ এটি অনেক বেশি কঠোর ও প্রতিরোধমূলক বাক্য। এর অর্থ হলো, যেসব বিষয় ব্যভিচার উসকে দেয় ও ব্যভিচারের দিকে ধাবিত করে সেগুলোও হারাম। ইসলামের নির্দেশনা মতে, কোনো ব্যক্তি শুধু ব্যভিচার থেকে দূরে থেকেই ক্ষান্ত হবে না, বরং এ পথে ধাবিতকারী বিষয় থেকেও দূরে থাকবে। 
ইসলামে ধর্ষিতা দায়মুক্ত
ধর্ষণ ব্যভিচার থেকেও এক ভয়াবহ পাপ। ধর্ষণের ক্ষেত্রে একপক্ষে  জেনা সংঘটিত হয়। আর অন্যপক্ষ হয় মজলুম বা নির্যাতিতা। তাই শুধু জালেম বা ধর্ষকের শাস্তি হবে। রাসুল (সা.) এর যুগে এক মহিলাকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করা হলে রাসুলুল্লাহ (সা.) মহিলাকে কোনোরূপ শাস্তি দেননি, তবে ধর্ষককে হদ বা শরিয়ত নির্ধারিত শাস্তি প্রদান করেন।’ (ইবনে মাজাহ : ২৫৯৮)।

ইসলামে ধর্ষণের শাস্তি 
ধর্ষণের ক্ষেত্রে তিনটি অপরাধ সংঘটিত হয়। এক. ব্যভিচার। দুই. বল প্রয়োগ। তিন. সম্ভ্রম লুণ্ঠন। ইসলামে ব্যভিচারের শাস্তি ব্যক্তিভেদে একটু ভিন্ন। এ ব্যাপারে আল্লাহ বলেন, ‘ব্যভিচারিণী নারী ব্যভিচারী পুরুষ; তাদের প্রত্যেককে ১০০ করে বেত্রাঘাত কর। আল্লাহর বিধান কার্যকরকরণে তাদের প্রতি যেন তোমাদের মনে দয়ার উদ্রেক না হয়, যদি তোমরা আল্লাহর প্রতি ও পরকালের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে থাক। মুসলমানদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে।’ (সূরা নূর : ২)। হাদিসে এসেছে, ‘অবিবাহিতের ক্ষেত্রে শাস্তি ১০০ বেত্রাঘাত এবং এক বছরের জন্য দেশান্তর। আর বিবাহিত পুরুষ-নারীর ক্ষেত্রে ১০০ বেত্রাঘাত ও রজম বা পাথর মেরে মৃত্যুদ-।’ (মুসলিম : ৪৫১১)। এ হাদিস থেকে জানা গেল ব্যভিচারী যদি বিবাহিত হয়, তাহলে তাকে পাথর মেরে মৃত্যুদ- দেওয়া হবে। কিন্তু সে বিবাহিত না হলে তাকে ১০০ বেত্রাঘাতের পাশাপাশি বিচারক চাইলে দেশান্তর করতে পারেন। 
ধর্ষণের অপরাধে ব্যভিচারের শাস্তির পাশাপাশি মুহারাবার শাস্তি প্রয়োগ করা হবে। মুহারাবা হলো পৃথিবীতে গোলযোগ ও অশান্তি সৃষ্টি, ডাকাতি-লুণ্ঠন, নিরাপত্তা বিঘিœতকরণ, ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা ইত্যাদি। এতে শুধু সম্পদ ছিনিয়ে নেওয়া হতে পারে, আবার হত্যা করা হতে পারে। আবার দুটিই হতে পারে। মুহারাবার শাস্তি ঘোষণা করতে গিয়ে আল্লাহ বলেন, ‘যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং দেশে হাঙ্গামা সৃষ্টি করতে সচেষ্ট হয়, তাদের শাস্তি হচ্ছে, তাদের হত্যা করা হবে অথবা শূলে চড়ানো হবে অথবা তাদের হাত-পা বিপরীত দিক থেকে কেটে দেওয়া হবে অথবা দেশ থেকে বহিষ্কার করা হবে। এটি হলো তাদের জন্য পার্থিব লাঞ্ছনা আর পরকালে তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি।’ (সূরা মায়িদা : ৩৩)। এ আয়াত থেকে বিখ্যাত মালেকি ফকিহ ইবনুল আরাবি ধর্ষণের শাস্তিতে মুহারাবার শাস্তি প্রয়োগের মত ব্যক্ত করেছেন। ধর্ষণ একটি পাশবিকতার নামান্তর। তাই ধর্ষণকে ব্যভিচারের সঙ্গে সম্পৃক্ত না করে সন্ত্রাস বা বিপর্যয় সৃষ্টিকারী কারণগুলোর সঙ্গে বিবেচনা করার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। ডাকাতি বা ছিনতাই করার সময় যেমন নিরীহ মানুষের সম্পদ লুণ্ঠন করা হয়; তেমনি জোরপূর্বক নারীর সতীত্ব হরণ বা লুণ্ঠন করা হলো ধর্ষণ। সমাজে এখন ধর্ষণ মহামারির আকার ধারণ করেছে। তাই সমাজ থেকে ধর্ষণ সমূলে নির্মূল করার লক্ষ্যে ইসলাম কর্তৃক নির্ধারিত শাস্তি প্রয়োগ করা জরুরি। কারণ ধর্ষণের বিরুদ্ধে আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত শাস্তি যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত শাস্তি। এজন্য যেসব দেশে ব্যভিচারের অপরাধে ইসলামি আইন প্রয়োগ হয় সেখানে ধর্ষণপ্রবণতা অনেক কম। পরিসংখ্যান তাই বলে।

বিভিন্ন দেশে ধর্ষণের শাস্তি
ইরানে ধর্ষণের শাস্তি হয় ফাঁসি, না হয় গুলি করে মারা হয়। আফগানিস্তানে ধর্ষণ করে কেউ ধরা পড়লে সোজা মাথায় গুলি করে মারা হয়। সৌদি আরবেও ধর্ষণের সাজা জনসম্মুখে শিরñেদ করে মৃত্যুদ-। মধ্যপ্রাচ্য ও আরব দুনিয়ায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা পর্যন্ত পাথর ছুড়ে ও ফাঁসি কার্যকর করে মৃত্যুদ- দেওয়া হয়। আর তাই এসব দেশে ধর্ষণের সংখ্যা অনেকটাই কম। ধর্ষণ প্রতিরোধে অনেক অমুসলিম দেশেও ইসলামি আইনের মতো কঠোর শাস্তির বিধান চালু করেছে। যেমনÑ চীন ও উত্তর কোরিয়াÑ এ দেশ দুটিতেও ধর্ষণের সাজা এখন মৃত্যুদ-। পোল্যান্ডে হিংস্র বুনো শূয়োরের খাঁচায় ফেলে মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয় এবং আমেরিকা ও ফ্রান্সে ধর্ষিতার বয়স ও ধর্ষণের মাত্রা দেখে ৩০ বছর পর্যন্ত কারাদ-ের শাস্তি দেওয়া হয়।

ইসলামের শাস্তি অমানবিক নয়
ইসলামে ব্যভিচারের শাস্তি বা রজমের বিধানকে অনেকে বাড়াবাড়ি মনে করেন। আসলে ব্যভিচার ও ধর্ষণ ক্যান্সারের মতো একটি সংক্রামক ব্যাধি। কোনো অঙ্গে ক্যান্সার হলে অন্য অঙ্গ সংক্রমিত হওয়ার ভয়ে সে আক্রান্ত অঙ্গ যেমন অপসারণ করা হয়, ঠিক ব্যভিচারী ও ধর্ষককে কঠিন শাস্তি দিয়ে সমাজ নামক দেহটিকে সুস্থ রাখার জন্য আল্লাহ তায়ালা ব্যভিচারের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা রেখেছেন। এখানে অপরাধীর প্রতি কোনো দয়া ও অনুকম্পা দেখাতে নিষেধ করা হয়েছে, কারণ তাতে অনেকের নিরাপত্তা হুমকির সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

শেয়ার করুন

Leave a Comment