খতমে নবুয়ত ইসলামের মৌলিক আকিদা

শাহ মাহমুদ হাসান

 

তাওহিদ, রিসালাত, আখেরাত, নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত, কোরআন, কেবলা ইত্যাদি বিষয় যে পর্যায়ের অকাট্য ও সন্দেহাতীত দলিল দ্বারা সুপ্রতিষ্ঠিত, খতমে নবুয়ত তথা মুহাম্মদ (সা.) এর শেষ নবী হওয়ার আকিদাও অনুরূপ দলিল দ্বারা দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণিত। এজন্যই তাওহিদ, রিসালাত, আখেরাত, নামাজ, হজ, জাকাত, কোরআন ইত্যাদির অস্বীকারকারী যেমন স্পষ্ট কাফের, তেমনি খতমে নবুয়ত অস্বীকারকারী এবং অবিশ্বাসীরাও কাফের। হজরত মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসুলÑ এ বিশ্বাস যেমন অকাট্য, তেমনি তিনি শেষ নবী, তাঁর পরে কেয়ামত পর্যন্ত আর কোনো নবী নেইÑ এ বিশ্বাসও অকাট্য। খতমে নবুয়ত সরাসরি অস্বীকার করা হোক কিংবা অপব্যাখ্যার অন্তরালে করা হোকÑ সর্বাবস্থায় তা কুফর বলে গণ্য। এজন্য ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর (রা.) নবুয়তের দাবিদার মুসাইলামা ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। যদিও তারা মৌলিকভাবে তাওহিদ ও রিসালাতে বিশ্বাসী ছিল। শুধু নবুয়তের দাবি তোলার কারণেই সাহাবায়ে কেরাম তাদের বিরুদ্ধে জিহাদে অবতীর্ণ হয়েছেন এবং তাদের কঠোর হস্তে দমন করেছেন। 

খতমে নবুয়তের দলিল
আল্লাহ তায়ালা মানবজাতির প্রয়োজনানুপাতে কালক্রমে তাদের বিভিন্ন শরিয়ত দিয়েছেন। আর এর পূর্ণতা ও শুভ পরিসমাপ্তি করেছেন মুহাম্মদ (সা.) এর মাধ্যমে। দ্বীনের পূর্ণাঙ্গতা লাভের পর যেহেতু এতে কোনোরূপ সংযোজন ও বিয়োজনের প্রয়োজন নেই; তাই মানবজাতির জন্য নতুন শরিয়তেরও প্রয়োজন নেই। তাই আল্লাহ তায়ালা নবী-রাসুল প্রেরণের ধারা চিরতরে বন্ধ করে দিয়েছেন। এটা ইসলামের অন্যতম মৌলিক বিশ্বাস। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেছেনÑ ‘আজ আমি তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণতা দান করেছি, আর আমি তোমাদের জন্য আমার নেয়ামতকে পরিপূর্ণ করে দিয়েছি এবং দ্বীন হিসেবে ইসলামকে তোমাদের জন্য মনোনীত করেছি।’ (সূরা মায়িদা : ৩)। পবিত্র কোরআনের অন্যত্র বলা হয়েছেÑ ‘মুহাম্মদ তোমাদের মধ্যকার কোনো পুরুষের বাবা নন; তবে তিনি আল্লাহর রাসুল এবং সর্বশেষ নবী।’ (সূরা আহজাব : ৪০)। 
খতমে নবুয়তের ব্যাপারে রাসুল (সা.) থেকে বহু হাদিস বর্ণিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেনÑ ‘আমি এবং পূর্ববর্তী অন্য নবীদের উদাহরণ হলো, এক লোক একটি ঘর অত্যন্ত সুন্দর করে তৈরি করল। কিন্তু ঘরের এক কোনে একটা ইট ফাঁকা রেখে দিল। লোকজন চর্তুদিকে ঘুরে ঘরে তার সৌন্দর্য দেখে বিমোহিত হচ্ছে; কিন্তু বলছে, এ ফাঁকা জায়গায় একটি ইট বসালে কতইনা সুন্দর হতো! আমি হলাম সেই ইট এবং আমি হলাম সর্বশেষ নবী।’ (বোখারি : ৩২৭১; মুসলিম : ৪২৩৯)। রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেনÑ ‘অন্যসব নবীর মোকাবিলায় আমাকে ছয়টি বিষয় দ্বারা বৈশিষ্ট্যম-িত করা হয়েছে, তার মধ্যে দুটি বিষয় হলোÑ আমাকে সমগ্র সৃষ্টি জগতের রাসুলরূপে প্রেরণ করা হয়েছে এবং আমার দ্বারা নবীদের সিলসিলার পরিসমাপ্তি ঘটানো হয়েছে।’ (মুসলিম : ৫২৩)। 
এরূপ বহু কোরআনের আয়াত ও হাদিস দ্বারা প্রমাণিত ইসলামের অন্যতম মৌলিক আকিদা এই যে, হজরত মুহাম্মদ (সা.) মানবজাতির হেদায়েতের জন্য প্রেরিত সর্বশেষ নবী। তাঁর পর আর কোনো নবী প্রেরিত হবেন না।

কাদিয়ানিদের আকিদা
কাদিয়ানিদের বইপত্রের মাঝে কাদিয়ানিকে যারা নবী হিসেবে স্বীকার করে না তাদের কাফের আখ্যা দেওয়া হয়েছে। তাদের একটি প্রসিদ্ধ গ্রন্থ ‘হাকীকাতুন নুবুওয়াহ’ গ্রন্থে বলা হয়েছে, ‘মির্জা গোলাম আহমদ ঐ অর্থে নবী, যে অর্থে পূর্ববর্তী হজরত মুসা ও ঈসা আলাইহিমুস সালাম নবী ছিলেন। যেমনিভাবে কোনো একজন নবীকে অস্বীকারকারী কাফের, তেমনিভাবে মির্জা গোলাম আহমদের নবুওত অস্বীকারকারীও কাফের।’ এভাবে কাদিয়ানি সম্প্রদায় নিজেদের মুসলিম পরিচয় দিয়ে ধোঁকা ও মিথ্যাচারের মাধ্যমে ইসলামের নামে একটি নতুন ধর্মমতের প্রচারণা চালিয়ে সমাজে অশান্তি ও বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দিচ্ছে। 

কাদিয়ানিদের ব্যাপারে মুসলিম বিশ্বের অবস্থান
প্রায় সবকটি মুসলিম দেশে কাদিয়ানিদের সরকারিভাবে অমুসলিম ঘোষণা করে তাদের যাবতীয় বই-পুস্তক, ও কার্যক্রমকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যেমন ১৯৫৭ সালে সিরিয়া সরকার কাদিয়ানিদের সরকারিভাবে অমুসলিম ঘোষণা করেছে। কাদিয়ানিদের সংগঠনকে অবৈধ ও বেআইনি বলে ঘোষণা দিয়েছে। ১৯৫৮ সালে মিশর সরকার কাদিয়ানিদের সরকারিভাবে কাফের এবং তাদের সংগঠনকে বেআইনি সংগঠন বলে ঘোষণা দিয়েছে। ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দ মোতাবেক ১৩৯৪ হিজরি ১৪ রবিউল আউয়াল থেকে ১৮ রবিউল আউয়াল পর্যন্ত পাঁচ দিনব্যাপী ১০৪টি দেশের সম্মিলিত সংগঠন ‘রাবেতা আলমে ইসলামি’ এর অধিবেশনে কাদিয়ানিদের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে যে, এ দল কাফের ও ইসলাম বহির্ভূত। তাদের সঙ্গে বিয়েশাদি হারাম এবং মুসলমানদের কবরস্থানে তাদের দাফন করা নাজায়েজ। ওই প্রস্তাবগুলো ১০৪টি দেশের প্রতিনিধিরা সম্মিলিতভাবে পাস করেছেন। তাদের মধ্যে সৌদি আরব, দুবাই, আবুধাবি, কাতার ইত্যাদি দেশ অন্তর্ভুক্ত। ৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৪ সালে পাকিস্তানের পার্লামেন্টও কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণা দিয়েছে। 
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ বাংলাদেশে তাদের আজও অমুসলিম ঘোষণা করা হয়নি। যে কারণে বর্তমানে তারা এ দেশে প্রকাশ্যে উসকানিমূলক অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি পঞ্চগড়ে তারা ইজতেমা আয়োজন করছে। এ নিয়ে সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। অতএব বাংলাদেশ সরকারের উচিত অনতিবিলম্বে কাদিয়ানিদের সরকারিভাবে অমুসলিম ঘোষণা করে কাদিয়ানি অপতৎপরতা বন্ধ করা। কাদিয়ানিরা অমুসলিম নাগরিক হিসেবে এ দেশের সব সুযোগসুবিধা ভোগ করতে পারে; তবে মুসলিম হিসেবে অবশ্যই নয়।

শেয়ার করুন

Leave a Comment