গোটা মুসলিম জাতি এক দেহের মত

শাহ মাহমুদ হাসান

 

এক. ইসলামে ঐক্যবদ্ধ জীবনের গুরুত্ব
ইসলামে ঐক্যবদ্ধ ও সংঘবদ্ধ জীবনের গুরুত্ব অপরিসীম। সংঘবদ্ধভাবে জীবন যাপনের নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমারা আল্লাহর রজ্জুকে (ইসলাম) আঁকড়ে ধর (ঐক্যবদ্ধ হও) এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।’ (সূরা আলে ইমরান: ১০৩)। এ প্রসঙ্গে রসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, আমি তোমাদের পাঁচটি বিষয়ের নির্দেশ দিচ্ছি, সংঘবদ্ধ জীবন যাপন, আমিরের নির্দেশ শ্রবণ, নির্দেশ পালন, হিজরত এবং আল্লাহর পথে জিহাদ। যে ব্যক্তি সংঘবদ্ধতা ত্যাগ করে এক বিঘত পরিমাণ দূরে সরে গেছে সে নিজের গর্দান থেকে ইসলামের রজ্জু খুলে ফেলেছে। যদিও সে নামাজ কায়েম করে এবং রোজা পালন করে এবং মুসলমান বলে দাবি করে (তবুও সে ইসলাম থেকে বের হয়ে গেছে)।’ (তিরমিজি : ২৭৯০)। বর্তমানে মুসলমানদের লাঞ্ছনা, পরাজয় ও পরাধিনতার জন্য তাদের অনৈক্য অনেকাংশে দায়ি। নিজেদের পার¯পরিক হানাহানিতেই তাদের শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেছে। মুসলমানরা যদি ঐক্যবদ্ধ ও সুসংগঠিত না হয়, তবে এই দমন-পিড়ন ও নির্যাতন তাদের উপর চলতেই থাকবে। পৃথিবীর কোথাও থাকবেনা তাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক আধিপত্য। এ কথারই যেন প্রতিধ্বনি হচ্ছে নি¤েœাক্ত আয়াতে, ‘আর আনুগত্য করো আল্লাহও তাঁর রসুলের এবং কোনো বিবাদে লিপ্ত হয়ো না, পাছে তোমরা কাপুরুষ হয়ে পড়বে এবং তোমাদের প্রভাব চলে যাবে।’ (সূরা আনফাল : ৪৬)। মুসলমান ভীরু বা কাপুরুষ কোন জাতি নয়। তারা হচ্ছে বীরের জাতি। আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদের এই পৃথিবীতে পরাজিত শক্তি হিসেবে নয় বরং বিজয়ী শক্তি হিসেবে প্রেরণ করেছেন। ইরশাদ হচ্ছে, ‘তিনিই প্রেরণ করেছেন আপন রসুলকে হেদায়েত ও সত্য দ্বীন সহকারে, যেন এ দ্বীনকে অপরাপর দ্বীনের উপর জয়যুক্ত করেন, যদিও মুশরিকরা তা অপ্রীতিকর মনে করে।’ (সূরা তাওবা : ৩৩)। লড়াকু ও সংঘবদ্ধ জীবন আল্লাহ তায়ালার কাছে অত্যন্ত প্রিয়। তিনি ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ঐসব লোকদের ভালোবাসেন, যারা তাঁর পথে লড়াই করে সীসা ঢালা প্রাচীরের ন্যায় সংঘবদ্ধ হয়ে।’ (সূরা সাফ : ৪)।
মুসলিম উম্মাহর বিচ্ছিন্নতা ও বিভক্তির সুযোগে ইসলামের দুশমনরা মুসলমানদের ধ্বংস করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন জনপদের মুসলামনরা আজ চরম নিষ্ঠুরাতা ও নিপিড়নের শিকার। ফিলিস্তিন, মায়ানমার ও কাশ্মীরের নিপিড়িত মুসলমানদের আর্তনাদে আকাশ বাতাস ভারি হয়ে উঠছে। ভারতে মুসলমানদের জীবন গরুর জীবনের থেকেও মূল্যহীন। গরু গেশত পাওয়া গেছে অজুহাতে মুসলমানকে হত্যা করা হচ্ছে। জয় শ্রীরাম না বলার কারণে পিটিয়ে মারা হচ্ছে। এখন কাশ্মীরের নিরপরাধ জনগণকে অবরুদ্ধ করে গণহত্যার সব আয়োজন সম্পন্ন করে ফেলেছে ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদিরা। এসব কিছুর পরেও মুসলিম জাতির শাসকগোষ্ঠী কাপুরুষের মত নিরব ভূমিকা পালন করছে। এই নাজুক পরিস্থিতিতে সমগ্র মুসলিম উম্মাহর উচিত তাদের শাসকবর্গের ওপর চাপ প্রয়োগ করা, যাতে শাসকরা জালিমদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়। আর মুসলিম শাসকদের উচিত ওআইসিকে সক্রিয় ও শক্তিশালী করা। প্রয়োজনে ন্যাটোর আদলে মুসলিম আর্মি গঠন করা যারা নিপিড়িত মুসলমানদের সাহায্যে এগিয়ে যাবে। জাতিসংঘের দিকে তাকিয়ে থেকে লাভ নাই। কারণ জাতিসংঘ গঠিত হয়েছে ইয়াহুদি-খ্রীষ্টান স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য। মুসলমাদের পক্ষে জাতিসংঘ কখনো কাজ করে নি করবেও না। মুসলমানদেরকেই মুসলমানের কথা ভাবতে হবে। মজলুমের পক্ষে এগিয়ে যেতে হবে। আল্লাহ তায়ালা জালিমের বিরুদ্ধে বিশ^ মুসলিম উম্মাহকে সম্বোধন করে বলেন, ‘তোমাদের কি হল যে, তেমারা আল্লাহর রাহে লড়াই করছ না দুর্বল সেই পুরুষ, নারী ও শিশুদের পক্ষে, যারা বলে, হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদিগকে এই জনপদ থেকে নিষ্কৃতি দান কর; এখানকার অধিবাসীরা যে, অত্যাচারী! আর তোমার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য পক্ষালম্বনকারী নির্ধারণ করে দাও এবং তোমার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য সাহায্যকারী নির্ধারণ করে দাও।’ (সূরা নিসা : ৭৫)।
দুই. মুসলিম ভ্রাতৃত্ব
পৃথিবীর কোথাও কোন মুসলমান কষ্টের সম্মুখীন হলে বা বিপদগ্রস্থ হলে মুসলমান হিসেবে তার বিপদে এগিয়ে যাওয়া আমাদের ঈমানি দায়িত্ব। কোন মুসলমানের কষ্ট, বেদনা ও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় সত্যিকার মোমিন কখনো নির্বিকার থাকতে পারে না। ইমানেরও দাবী হচ্ছে, সুখে-দু:খে এক মোমিন অপর মোমিনের পাশে থাকবে। তাদের কষ্ট লাঘবে সদা তৎপর থাকবে। রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল মুসলমানকে একটা দেহের সাথে তুলনা করে বলেছেন, ‘পারস্পারিক ভালোবাসা, দয়া-মায়া ও স্নেহ-মমতার দিক থেকে গোটা মুসলিম সমাজ একটি দেহের সমতুল্য। যদি দেহের কোন বিশেষ অঙ্গ অসুস্থ হয়ে পড়ে, তাহলে অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গেও তা অনুভূত হয়; সেটা জাগ্রত অবস্থায় হোক কিংবা জ্বরাক্রান্ত অবস্থায়।’ (মুসলিম : ৬৭৫১ )। তিনি আরো বলেছেন, ‘একজন মোমিন অপর মোমিনের জন্য একটি ইমারত সদৃশ, যার এক অংশ আরেক অংশকে মজবুত করে।’ (মুসলিম : ৬৩৪৯)। অর্থাৎ সবল মোমিনদের সাহায্য-সহযোগিতায় অসহায় ও দূর্বলরা সবল হয়ে উঠবে, তাদের দুর্দশা কেটে যাবে। এটিই সত্য ধর্ম ইসলামের শিক্ষা ও প্রত্যাশা। ঈমানদারগণ নৈতিক ও আধ্যাত্মিকভাবে ভ্রতৃত্বের বন্ধনে ঐক্যবদ্ধ থাকার প্রেরণা পেয়ে থাকে। তাদের মধ্যে ঈমানের পরিমান যত বেশি থাকবে, তারা তত বেশি ঐক্যবদ্ধ হতে অনুপ্রাণিত হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, প্রকৃতপক্ষেই ঈমানদাররা পর¯পরের ভাই (সূরা হুজুরাত : ১০)। ‘মুসলমান মুসলমানের ভাই। সে তার ওপর না জুলুম করতে পারে, না তাকে অসহায় অবস্থায় পরিত্যাগ করতে পারে আর না তাকে হেয়প্রতিপন্ন করতে পারে। তিনি নিজের বুকের দিকে ইশারা করে বলেন, তাকওয়া এখানে, তাকওয়া এখানে, তাকওয়া এখানে। কেউ নিকৃষ্ট হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে সে তার মুসলিম ভাইকে তুচ্ছজ্ঞান করবে। প্রত্যেক মুসলমানের জীবন, ধনস¤পদ ও মানসম্মান প্রত্যেকের সম্মানের বস্তু। এর ওপর হস্তক্ষেপ করা হারাম। (মুসলিম : ৬৭০৬)।
রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মোনিনকে ভালবাসা ঈমানের মাপকাঠি হিসেবে সাব্যস্ত করে বলেছেন, ‘ঈমান ছাড়া তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবেনা, পর¯পরকে ভালবাসা ছাড়া তোমরা মোমেন হতে পারবে না। আমি কি তোমাদেরকে এমন বিষয়ের কথা বলে দিব না, যাতে তোমাদের মধ্যে ভালবাসা সৃষ্টি হবে? পর¯পরকে সালাম দিবে। (মুসলিম : ২০৩)।

শেয়ার করুন

Leave a Comment