নৈতিক অবক্ষয় রোধে ইসলামের শিক্ষা

শাহ মাহমুদ হাসান

 

নৈতিক অবক্ষয় সামাজিক অশান্তির মূল কারণ। আমাদের সমাজে নৈতিক অবক্ষয়ের যে মহামারি চলেছে, তা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার একমাত্র উপায় হলো ইসলাম। ইসলামের নীতি-আদর্শের মাঝেই রয়েছে নৈতিক মূল্যবোধের সমাহার। নৈতিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার জন্য ইসলামের আলোকে যে পদক্ষেদগুলো নেয়া জরুরী তা তুলে ধরা হলো।
এক. ইসলামি মূল্যবোধের শিক্ষা
ইসলামের আদর্শ ও মূল্যবোধ থেকে বিচ্যুতির কারণেই তরুণ ও যুব সমাজ নৈতিক অবক্ষয়ের চোরাবলিতে হাড়িয়ে যাচ্ছে। মানুষের জীবনকে সার্থক ও সৌন্দর্যময় করে নৈতিক মূল্যবোধ। উন্নত মানুষ ও সুস্থ্য সমাজ গঠনে নৈতিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই। নৈতিক মূল্যবোধ বলতে সততা, বিশ^স্ততা, ন্যায়নীতি, ধৈর্য-সহিষ্ণুতা, মায়া-মমতা, ক্ষমা, উদারতা, সহনশীলতা, সহমর্মিতা, সদাচরণ প্রভৃতি মানবীয় গুণাবলির সমষ্টিকে বুঝানো হয়। ইসলাম মানবজাতিকে এসব মহৎ গুণ অর্জনের জন্য উৎসাহিত করে থাকে। তবে ইসলামে নৈতিকতার মূল ভিত্তি হলো তাকওয়া বা খোদাভীতি। ইসলাম আল্লাহভীতি ও পরকালের চেতনা উপস্থাপন করে মানুষের ধ্যানধারণাকে এমন এক জগতের দিকে ঘুরিয়ে দেয়, যার কল্পনা মানুষকে যাবতীয় অপরাধ ও গোনাহ থেকে বিরত রাখে। জনমনে আল্লাহ তায়ালা ও পরকালের ভয় সৃষ্টি করা ছাড়া অপরাধ দমন করা সম্ভব নয়। তাই তরুণ প্রজন্মকে তাকওয়ার প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধকে জাগ্রত করতে হবে।
দুই. নামাজের প্রশিক্ষণ
পরিবারের সকলকে নামাজি হিসেবে অভ্যস্ত করে তোলা অবিভাবকদের দায়িত্ব। কারণ নামাজ সকল অনাচার ও অশ্লীলতা থেকে বাঁচাতে পারে। ইরশাদ হচ্ছে, তুমি তোমার পরিবারের লোকদেরকে নামাজের আদেশ দাও এবং নিজেও এর ওপর অবিচল থকো। সূরা ত্বাহা, আয়াত ১৩২। অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছে, ‘নামাজ কায়েম করো। অবশ্যই নামাজ অশ্লীল ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখে। সূরা আনকাবুত, আয়াত ৪৫।
তিন. অশ্লীলতা থেকে দূরে থাকা
পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, ইন্টারনেট ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে ভিনদেশীদের সিনেমা-নাটকের কুপ্রভাব তরুণ-তরুণীদের মনে গভীরভাবে রেখাপাত করে। অশ্লীলতা সামাজিক অনাচার সৃষ্টি করে। এজন্য অশালীন বেশ-ভূষা, অশ্লীল পোশাক ও জিনা-ব্যভিচার ইসলাম কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেও না। এটা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট আচরণ।’ সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত ৩২।
চার. ভালো বন্ধু নির্বাচন
সন্তানদের সাথে অবিভাবকদের ঘনিষ্ঠতা বাড়তে হবে। সন্তানরা কাদের সাথে ওঠাবসা ও মেলামেশা করছে, অবিভাবকদের সেদিকেও সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। প্রয়োজনে ভালো বন্ধু নির্বাচনে সহায়তা করতে হবে। ‘সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ’ এটি শুধু প্রবাদ নয় বরং বাস্তবতাও। ভাল বন্ধু নির্বাচন করা ইসলামের অন্যতম শিক্ষা। সৎ ও বিশ্বস্ত মানুষকে বন্ধু নির্বাচনের আহ্বান জানিয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে ইমানদাররা! আল্লাহকে ভয় কর এবং সত-সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের সঙ্গী হও।’ সূরা তওবা, আয়াত ১১৯।
পাঁচ. নায় বিচার প্রতিষ্ঠা
বিচার কাজে পক্ষপাতিত্ব ও বিচারহীনতার অপসংস্কৃৃতি ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাবে খুন ও ধর্ষণের ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলছে। কাজেই অপরাধিদের অতি দ্রুত বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। অপরাধ বন্ধে এর কোনো বিকল্প নেই। অপরাধিদের কোনাভাবেই আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া চলবে না। ক্ষমতাবান বা প্রভাবশালী বলে কোনো অপরাধী যেন পার পাওয়ার সুযোগ না পায়, তা সুনিশ্চিত করতে হবে। ইসলামে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। শত্রুতা বা স্বজনপ্রীতির কারণে বিচারে পক্ষপাত করার সুযোগ ইসলামে নেই। আল্লাহ তায়ালার ইরশাদ, ‘কোন সম্প্রদায়ের শত্রুতার কারণে কখনও ন্যায়বিচার পরিত্যাগ করো না।’ সূরা মায়েদা, আয়াত ৮। ‘সুবিচার কর, যদিও সে আতœীয়ও হয়।’ সূরা আনআম, আয়াত ১৫২। ন্যায় বিচারের ব্যাপরে মহানবী দ্ব্যর্থহীন উক্তি ছিল, ‘আজ আমার মেয়ে ফাতেমাও যদি চুরির অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে যায় তবে আমি প্রথমে আমার মেয়ের হাত কেটে দেব।’ ‘অন্যায়কারী দলের লোক হোক বা যত বড় ক্ষমতাধর হোক ছাড়া পাবে না’ এটা ন্যায় বিচারের মূলনীতি হওয়া উচিত।
ছয়. অপরাধের প্রতি ঘৃণাবোধ
আমাদের সমাজে সততা, ও নৈতিকতার দুর্ভিক্ষ চলছে। অপরাধকে অন্যায় বলে বিবেচনা করা হয় না। নীতিভ্রষ্ট ও দুষ্ট মানুষদের অপরাধী বলে গণ্য করা হয় না। জীবনের লক্ষ্য ও উন্নতি বলতে বোঝান হয় কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ও স¤পদ অর্জন। কিন্তু সে টাকা ও স¤পদ কোন পথে এলো-তা নিয়ে কারো ভাবার সময় নেই। যে সন্তান তার বাবাকে অহরহ মিথ্যা বলতে দেখে, কাজে ফাঁকি দিতে দেখে, ঘুষ খেতে দেখে, অন্যের স¤পদ অবৈধভাবে গ্রাস করতে দেখে- তার নৈতিক ভিত তো দুর্বল হবেই। তরুণরা দেখতে পায় যে, বড়রা বা ক্ষমতধরেরাই নিজেদের স্বার্থে সন্ত্রাসীদের লালন করছে। সন্ত্রাসীরা সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা ভোগ করছে। তাই তারাও এই পথে অগ্রসর হতে উৎসাহবোধ করে। সভ্যতা ও নৈতিকতা বিধ্বংসি যাবতীয় অনাচার মূলোৎপাটনে ইসলাম কঠোর হতে বলেছে। অনুরূপভাবে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, সুদ, ঘুষ, প্রতারণা, শোষণ প্রতিরোধ ছাড়া সামাজিক নিরাপত্তা আসবে না। রসুলুল্লাহ (সা.) সব ধরণের অন্যায় প্রতিরোধের নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে কেউ যদি কাউকে অন্যায় কাজ করতে দেখে তাহলে সে যেন তার শক্তি দ্বারা তা প্রতিহত করে। যদি সে এতে অক্ষম হয়, তবে মুখ দ্বারা নিষেধ করবে। যদি সে এতেও অপারগ হয় তবে সে অন্তর দ্বারা ঘৃণা পোষণ করবে। মুসলিম, হা/১৮৬।

শেয়ার করুন

Leave a Comment