ক্যাসিনো তথা মদ-জুয়া সমাজ ধ্বংসকারী

শাহ মাহমুদ হাসান।।

 


ক্যাসিনো সংস্কৃতি :

ইসলাম সব ধরনের মাদ, জুয়া, যৌনতাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। অথচ আমাদের দেশের রাজধানি ঢাকার বুকে দীর্ঘ দিন ধরে সমাজের প্রভাবশালী এক শ্রেনির লোকেরা ক্যাসিনোর আড়ালে মদ, জুয়া ও যৌনতার মাধ্যমে যুব সমাজকে ধ্বংস করছে। ক্যাসিনো মূলত পশ্চিমা সংস্কৃতি, ইসলামি সংস্কৃতি এমনকি আমাদের দেশীয় সংস্কৃতি পরিপন্থী। ক্যাসিনো ইতালিয়ান শব্দ। ১৬৩৮ সালে ইতালির ভেনিসে সর্বপ্রথম জুয়ার মাধ্যমে ক্যাসিনো ব্যবসা শুরু হয়। ক্যাসিনো বলতে এমন স্থানকে বোঝায় যেখানে মদ, জুয়া, নাচ, গান ও যৌনতার সংমিশ্রণে বিভিন্ন খেলাধুলার ব্যাবস্থা থাকে। আমেরিকা, রাশিয়া, বৃটেন, ফ্রান্স, কানাডা, জার্মানি, ইসরাইল সহ অন্যান্য ধনী পশ্চিমা দেশগুলোতে ক্যাসিনোর ব্যবসা বেশ জমজমাট। ক্যাসিনো ব্যবসায় বাংলাদেশ ও পিছিয়ে নেই। র‌্যাবের ভাষ্যমতে অন্তত ১০০ টি ক্যাসিনো রয়েছে শুধু ঢাকা শহরে। এখানে প্রতিদিন প্রায় ১৫০ কোটি টাকার জুয়া খেলা হয়।
মানব জাতিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষায় আল্লাহ তায়ালা মদ ও জুয়াকে হারাম বলে ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে মুমিনরা, মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্য নির্ধারক শরগুলো শয়তানের কার্য বৈ কিছু নয়। অতএব, এগুলো থেকে বেঁচে থাক, যাতে তোমরা কল্যাণপ্রাপ্ত হও। শয়তান তো চায়, মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের পর¯পরের মাঝে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সঞ্চারিত করে দিতে এবং আল্লাহর স্মরণ ও নামাজ থেকে তোমাদের বিরত রাখতে। অতএব, তোমরা এখন কি নিবৃত্ত হবে?’ (সূরা মায়েদাহ ৯০-৯১)। কোরআনে মদ ও জুয়াকে ঘৃণ্য বস্তু এবং শয়তানের কাজ বলা হয়েছে। একটি সমাজে যখন মদ ও জুয়ার প্রভাব বেড়ে যায় তখন সেই সমাজের মধ্যে পার®পারিক শত্রুতা, হিংসা, বিদ্বেষ ও অস্থিরতা বেড়ে যায়।
মাদকতার পরিনাম :
যে কোনো ধরনের মাদকদ্রব্য যা নেশা সৃষ্টি করে, মস্তিস্কের বিকৃতি ঘটায় এবং জ্ঞান ও স্মৃতিশক্তি বিলুপ্ত করে, ইসলামে তা নিষিদ্ধ। চাই তা প্রাকৃতিক হোক; যেমন- মদ, তাড়ি, আফিম, গাঁজা, ইত্যাদি অথবা রাসায়নিক হোক; যেমন- হেরোইন, কোকেন, প্যাথেডিন, ইয়াবা ইত্যাদি।
মাদকাসক্তির ভয়াবহতা থেকে মানব জাতিকে কে মুক্ত রাখার জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করেছেন, ‘প্রত্যেক নেশা জাতীয় দ্রব্যই মদ আর যাবতীয় মদই হারাম।’ (মুসলিম :৩৭৩৩)। মাদকসেবীরা শারীরিক এবং মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে সর্বপ্রকার অপকর্মে জড়িয়ে পরে। এ জন্য মাদকের নাম রাখা হয়েছে উম্মুল খাবায়েস তথা সকল নিকৃষ্টতার মূল। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা মাদক থেকে বিরত থাক কেননা মাদক সকল নিকৃষ্টতার মূল।’ (শুয়াবুল ইমান : ৫৫৮৭)।
মাদকাসক্তি নিয়ে গোটা পৃথিবীবাসী রয়েছে চরম উদ্বেগ ও উৎকন্ঠায়। নেশাজাত দ্রব্যের সর্বনাশা মরণ ছোবলে মানবজাতি অকালেই ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিঘিœত হচ্ছে। বৃদ্ধি পাচ্ছে মানবপাচার, চোরাচালানসহ মানবতা বিধ্বংসী অসংখ্য অপরাধ। মাদকাসক্তির কারণে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস বেড়ে গিয়ে মানুষের জানমালের নিরাপত্তা হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। সমাজের অধিকাংশ অপরাধের জন্যই মুখ্যভাবে দায়ী এই মাদকতা। এ জন্য রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মদপান করো না। কেননা তা সব অপকর্মের চাবিকাঠি।’ (ইবনে মাজাহ : ৩৩৭১)। মাদকাসক্ত ব্যক্তি তার ব্যয় নির্বাহের জন্য নানা ধরণের অপকর্মের আশ্রয় নিয়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়ে। আর অসামাজিক সকল কার্জকালাপ যেমন ধর্ষণ, ব্যভিচার ও হত্যার মতো অপরাধ সংগঠিত করে থাকে। বাস, ট্রাক ও বিভিন্ন যানবাহনে মাদকাসক্ত চালকের কারণেই বেশিরভাগ সড়ক দুর্ঘটনা হয়ে থাকে।
মদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এমন দশ শ্রেণির ব্যক্তিদের প্রতি রসুল (সা.) অভিশাপ দিয়েছেন। ১. মদের নির্যাস তৈরীকারী; ২. প্রস্তুতকারক; ৩. মদপানকারী; ৪. যে পান করায়; ৫. মদের আমদানিকারক; ৬. যার জন্য আমদানি করা হয়; ৭ বিক্রেতা; ৮. ক্রেতা; ৯. সরবরাহকারী এবং ১০. এর লভ্যাংশ ভোগকারী।’ (তিরমিজি : ১২৯৫)। মদ্যপ ব্যক্তির জন্য জান্নাত হারাম করা হয়েছে। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মদ্যপায়ী ব্যক্তি মৃত্যুর পর জান্নাতে যাবে না।’ (ইবনু মাজাহ : ৩৩৭৬)।
জুয়ার পরিনাম :
আরবী ভাষায় জুয়াকে বলে মাইসির। বাংলায় এর প্রতিশব্দ হচ্ছে জুয়া। ইসলামি পরিভাষায় জুয়া হচ্ছে, ‘উভয় পক্ষের স¤পদের মালিকানাকে ঝুলিয়ে রাখা’ যে মালিক হবে সে পূর্ণ মালিক হবে, আর যে বঞ্চিত হবে সে পুরোপুরি বঞ্চিত হবে। বর্তমানে জুয়ার নিত্য নতুন পদ্ধতি আবিস্কার হয়েছে। যেমন- হাউজি, বাজিতে ফ্লাস, পাশা, তাস খেলা, চাক্কি ঘোরানো ও রিং নিক্ষেপ ইত্যাদি। ক্রিকেট, ফুটবল ও অন্যান্য খেলাধূলার প্রতিযোগিতায় যে বাজী ধরা হয় তাও জুয়ার অন্তর্গত।
এছাড়াও বর্তমান সময়ের প্রসিদ্ধ একটি জুয়া হচ্ছে লটারী। নির্দিষ্ট অংকের টাকা কিংবা দ্রব্যের বিনিময়ে নির্দিষ্ট নম্বরের কুপন ক্রয়-বিক্রয় হয়। নির্দিষ্ট তারিখে বিক্রিত কুপনগুলির ড্র অনুষ্ঠিত হয়। এবং উদ্দিষ্ট সংখ্যক পুরস্কার দেয়া হয়। এই লটারীও ইসলামে হারাম, কারণ এতেও এক পক্ষ পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।
জুয়া খেলা, বাজী বা লটারী ধরার প্রবনতা আমাদের দেশে মহামরীতে রুপ নিয়েছে। জুয়া সামাজিক, পারিবারিক, আর্থিক ও নৈতিক সঙ্কট তৈরি করে এবং মানুষকে বহুবিধ ক্ষতির সম্মুখীন করে। জুয়া মানুষের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে দুর্ভোগ সৃষ্টি করে। জুয়াড়িরা অনেক সময় নিজের স্ত্রী ও সন্তানদের বাজি ধরে জুয়াখেলে। তাই ইসলাম সব ধরণের জুয়াকে নিষিদ্ধ করেছে। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা মদ, জুয়া ও বাদ্যযন্ত্র হারাম করেছেন।’ (বায়হাকি : ৪৫০৩)। জুয়ায় অংশগ্রহণকারীদের জন্য জাহান্নাম অবধারিত। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান, জুয়াড়ি, খোঁটাদাতা ও মদ্যপায়ী জান্নাতে যাবে না। (দারেমি : ৩৬৫৩)।
মুসলিম শরীফের এক হাদিসে শর নিক্ষেপ বা পাশাজাতীয় জুয়াখেলার ব্যাপারে রসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে লোক শর নিক্ষেপ করল (বা পাশা খেলল) সে যেন নিজের হাতকে শূকরের গোশত ও রক্তে রঞ্জিত করল। হাউজি, দাবা, তাস, পাশা অথবা অন্য যে কোনো উপায়ে জুয়াখেলে যে অর্থ উপার্যন করা হয় তা সবই অবৈধ। কারণ সেখানে অন্যায়ভাবে অন্যের অর্থ আত্মসাৎ করা হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা অন্যায়ভাবে একে অপরের স¤পদ ভোগ কর না।’ (সূরা বাকারা : ১৮৮)।

 

শেয়ার করুন

2 thoughts on “ক্যাসিনো তথা মদ-জুয়া সমাজ ধ্বংসকারী”

Leave a Comment