গুজব প্রতিরোধে ইসলামের বিধান

শাহ মাহমুদ হাসান

গুজব মানেই ভিত্তিহীন সংবাদ প্রচার। গুজব ছড়ানোর প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষকে বিভ্রান্ত করা ও জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করা। জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট সংবাদের ব্যাপারে ইসলামের নির্দেশনা হলো, এ ধরনের সংবাদ পরিবেশন ও প্রচারের আগে অবশ্যই যাচাই করে নিতে হবে। যেকোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই-বাছাই ছাড়া প্রচার করা আল্লাহর হুকুমের লঙ্ঘন। আল্লাহ তায়ালার ইরশাদÑ ‘মুমিনগণ! যদি কোনো পাপাচারী ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ আনয়ন করে, তবে তোমরা পরীক্ষা করে দেখবে, যাতে অজ্ঞতাবশত তোমরা কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতিসাধনে প্রবৃত্ত না হও এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত না হও।’ (সুরা হুজরাত : ৬)


পবিত্র কোরআনে যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো তথ্য বিশ^াস করতেও নিষেধ করা হয়েছে এবং যাচাই-বাছাই না করার জন্য আল্লাহর আদালতে কৈফিয়ত দিতে হবে। ইরশাদ হয়েছেÑ ‘যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ কোরো না। নিশ্চয়ই কান, চোখ, অন্তর এগুলোর প্রতিটি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে।’ (সুরা বনি ইসরাঈল : ৩৬)


যারা কোনো কথা শোনামাত্র তার সত্যতা যাচাই না করেই মানুষের কাছে প্রচার করে বেড়ায়, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদেরকে মিথ্যাবাদী হিসেবে গণ্য করে বলেছেন, ‘শোনা কথা প্রচার ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য যথেষ্ট।’ (আবু দাউদ : ৪৯৯২)


আর যাচাই-বাছাই না করে কোনো খবর প্রচারের কারণে যদি কোনো নিরপরাধ ব্যক্তির সম্মানের হানি হয়, জীবন নষ্ট হয়, তাহলে তার দায়ভার সংশ্লিষ্ট সবাইকেই নিতে হবে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো অপরাধ বা পাপ অর্জন করে, অতঃপর কোনো নির্দোষ ব্যক্তির ওপর তা আরোপ করে, তাহলে সে মিথ্যা অপবাদ ও প্রকাশ্য গুনাহের বোঝা বহন করল।’ (সুরা নিসা : ১১২)


ইসলামে গুজব ছড়ানো শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘মুনাফিকরা এবং যাদের অন্তরে রোগ আছে এবং মদিনায় গুজব রটনাকারীরা যদি বিরত না হয়, তবে আমি অবশ্যই তাদেরকে শাস্তি দিতে আপনাকে উত্তেজিত করব।’ (সুরা আহযাব : ৬০)


গুজব ছড়িয়ে যারা মানুষের নিরাপত্তা বিঘিœত করে এবং সম্মানহানি করে তাদের জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ঘোষণা করে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যারা সতী সাধ্বী নারীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করে অতঃপর এর স্বপক্ষে চারজন সাক্ষী উপস্থিত করতে পারে না তাদেরকে আশিটি বেত্রাঘাত কর এবং কখনও তাদের সাক্ষ্য কবুল কর না। কেননা তারা নাফরমান।’ (সুরা নুর : ৪)


সমাজে কোনো গুজব বা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে মুসলমানদের উচিত তাতে প্রভাবিত না হয়ে বাস্তবতা অনুসন্ধান করে নিজে সতর্ক হওয়া এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষকে তা অবগত করা। এ ব্যাপারে আল্লাহ তায়াল বলেন, ‘যখন তাদের কাছে নিরাপত্তা বা ভয়ের কোনো সংবাদ পৌঁছে, তখন তারা সেগুলোকে রটিয়ে দেয়। যদি তারা সংবাদটি রাসুল বা তাদের শাসকদের দৃষ্টিগোচর করত, তখন অনুসন্ধান করে দেখা যেত সেসব বিষয়, যা তাতে রয়েছে অনুসন্ধান করার মতো। তোমাদের প্রতি যদি আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমত না থাকত, তবে সামান্য সংখ্যক ব্যতীত সবাই শয়তানের অনুসরণ শুরু করত।’ (সুরা নিসা : ৮৩)। উক্ত আয়াতে গুজব রটানাকে শয়তানের ঘৃণ্য কাজ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। কারণ গুজবের কারণে মানুষের জানমালের ক্ষতি এমনকি প্রাণহানিরও আশঙ্কা থাকে।


গুজব ছড়িয়ে কাউকে ডাকাত সাব্যস্ত করে বা ছেলেধরা বলে গণপিটুনি দেওয়া শুরু হলে বহু নিরপরাধ মানুষও জুলুমের বা খুনের শিকার হবে। অনিরাপদ হয়ে উঠবে আরও বহু মানুষের জীবন। তাই গুজবে কান দিয়ে গণপিটুনি বা গণধোলাইয়ের মাধ্যমে মানুষ হত্যা থেকে আমাদের অবশ্যই বিরত থাকতে হবে এবং এ ধরনের পরিস্থিতির উদ্ভব হলে গণপিটুনি থেকে মানুষকে নিবৃত্ত করতে হবে। কেননা কোনো সভ্য সমাজ পিটিয়ে মানুষ মারার পৈশাচিকতা মেনে নিতে পারে না। গুজব ছড়িয়ে নিরপরাধ ব্যক্তিকে গণপিটুনি দিয়ে বা কুপিয়ে হত্যা করা সমগ্র পৃথিবীর ধ্বংস করার চেয়েও বড় অপরাধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে কোনো মুসলমানের হত্যাকাÐ সমগ্র পৃথিবীর ধ্বংস হয়ে যাওয়ার চেয়েও মারাত্মক ঘটনা।’ (তিরমিজি : ১৩৯৫)। আর গণপিটুনি দিয়ে মানুষ মারা কেয়ামত বা পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার পূর্বাভাস। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘ওই সত্ত¡ার কসম যার হাতে আমার জীবন, মানুষের নিকট এমন এক সময় আসবে যখন হত্যাকারী জানবে না যে, কি অপরাধে সে হত্যা করেছে এবং নিহত ব্যক্তিও জানবে না যে, কি অপরাধে সে নিহত হয়েছে।’ (মুসলিম : ৭৪৮৭)


সর্বোপরি গণপিটুনি দিয়ে মানুষ হত্যা ফৌজদারী অপরাধ। এই নিষ্ঠুর ও বর্বর কাজে যারা সম্পৃক্ত তাদেরকে শনাক্ত করে বিচারের মুখোমুখি এনে দৃৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। যাতে ভবিষ্যতে আর কেউ গণপিটুনির নামে মানুষ হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠার ধৃষ্টতা দেখাতে না পারে।
লেখক : আলেম ও প্রাবন্ধিক

শেয়ার করুন

Leave a Comment