কেয়ামতে সাত শ্রেণির মানুষ আরশের ছায়ায় আশ্রয় পাবে

মুফতি মাহবুব হাসান কাসেমী



মৃত্যুর পরে সবাইকে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হতে হবে। সেই উপস্থিতির দিনকেই বলা হয় বিচার দিবস বা কেয়ামত দিবস । কেয়ামতের ময়দানে সব মানুষের বিচার হবে। সেদিন সূর্য থাকবে মানুষের মাথার উপরে। সূযের তাপে অনেক পাপাচারীর মাথার মগজ টগবগ করে ফুটতে থাকবে। আর পায়ের নিচের মাটি হবে জ্বলন্ত তামার। মানুষ তার আমল অনুযায়ী ঘামের মধ্যে হাবুডুবু খাবে। কারো ঘাম হবে টাখনুসমান, কারো হাঁটুসমান, কারো কোমরসমান, কারো মুখসমান। এই কঠিন এবং ভয়াবহ অবস্থায়ও মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় সাত শ্রেনির বান্দাকে নিজের আরশের ছায়ায় আশ্রয় দেবেন। সেদিন তারাই হবে সম্মানিত ।
সেই বিভীষিকাময় মুহূর্তে মহান আল্লাহ কিছু মানুষকে তাঁর রহমতের ছায়াতলে আশ্রয় দেবেন। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, যেদিন আল্লাহর (রহমতের) ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না, সেদিন সাত ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা তাঁর নিজের (আরশের) ছায়ায় আশ্রয় দেবেন। (বুখারি : ৬৬, মুসলিম : ১০৩১)
আর তাঁরা হলেন
১. ন্যায়পরায়ণ শাসক : শাসকগণ যদি ন্যায় বিচার করেন তাহলে ওই শাসক আরশের ছায়া পাবেন। আল্লাহ তায়ালা এই শ্রেণির লোকদের ভীষণ ভালোবাসেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচারকারীদের ভালোবাসেন। (সুরা হুজরাত : ৯)।
২. ওই যুবক/যুবতী যে তাঁর যৌবনকে আল্লাহর ইবাদতে কাটিয়েছে: যৌবন মহান আল্লাহর অনেক বড় নিয়ামত। যৌবনে নিজেবে নিয়ন্ত্রন রাখা খুব কঠিন। যৌবনের তাড়নায় অনেকে পাপের সাগরে গা ভাসিয়ে দেয়। এই যৌবনকে যারা নিয়ন্ত্রন করে আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকতে পারবে কিয়ামতের দিন তারা আল্লাহর আরশের ছায়াতলে আশ্রয় পাবে।
৩. এমন নামাজি যার অন্তর মসজিদের সঙ্গে লেগে থাকে: অর্থাৎ মসজিদের প্রতি যাদের অগাধ ভালোবাসা রয়েছে। যারা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মসজিদে জামাতের সাথে আদায় করে। এবং এক ওয়াক্ত জামাতে নামাজ পড়ে; অন্য ওয়াক্ত মসজিদে জামাতে নামাজের অপেক্ষায় থাকে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, ‘নিঃসন্দেহে তারাই আল্লাহর মসজিদ আবাদ করবে যারা ঈমান এনেছে আল্লাহর প্রতি ও শেষ দিনের প্রতি এবং কায়েম করেছে নামায ও আদায় করে যাকাত; আল্লাহ ব্যতীত আর কাউকে ভয় করে না। অতএব, আশা করা যায়, তারা হেদায়েত প্রাপ্তদের অন্তর্ভূক্ত হবে।’ (সূরা তওবা : ১৮)।
৪. এমন দুই ব্যক্তি, যারা পরস্পরকে ভালোবাসবে আল্লাহর জন্য: যারা পরস্পর পরস্পরকে ভালোবাসে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এবং পরস্পর পরস্পর পৃথকও হয় একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। এদের প্রতি সুসংবাদ দিয়ে রসুল (সা.) ইরশাদ করেন, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা বলবেন, যারা আমার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পরস্পর পরস্পরকে ভালোবাসত তারা কোথায়, আজ আমি তাদের আমার আরশের ছায়াতলে আশ্রয় দান করব। আজ এমন দিন, যে দিন আমার ছায়া ব্যতীত কোথাও কোনো ছায়া নেই। (মুআত্তা মালিক : ১৭১৮)।
৫. ওই ব্যক্তি, যাকে কোনো সম্ভ্রান্ত বংশের রূপসী নারী কাম চরিতার্থে আহ্বান জানায়, কিন্তু সে এ বলে প্রত্যাখ্যান করে যে ‘আমি আল্লাহকে ভয় করি’: তাকে মহান আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাঁর আরশের ছায়াতলে আশ্রয় দেবেন। যারা তাদের যৌবনের হেফাজত করবে, এরকম চরিত্রবানদের জান্নাতের নিশ্চয়তা দিতে গিয়ে স্বয়ং রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমাতে তার মুখ ও যৌনোঙ্গের হেফাজতের নিশ্চয়তা দিকে আমি তাকে বেহেশতের নিশ্চয়তা দিব।’ (বুখারি : ৬১০৯)।
৬. ওই ব্যক্তি, যে এমন গোপনে দান করে যে তার ডান হাত যা খরচ করে বাম হাতও তা টের পায় না: যারা এমন গোপন দান একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করবে আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন তাদেরকে আরশের ছায়াতলে আশ্রয় দেবেন। গোপন দানকারীদের ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যদি তোমরা দান-খয়রাত কর, তবে তা কতই না উত্তম। আর যদি গোপনে দান করে দাও, তবে আরও বেশি উত্তম। দানের জন্য তিনি তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দেবেন।’ (সূরা বাকারা : ২৭১)।
৭. ওই ব্যক্তি, যে নির্জনে আল্লাহর জিকির করে, আর চোখের অশ্রু বিসর্জন করে: সাহাবিদের উদ্দেশ্যে রসুল (সা.) বলেছেন, ‘আমি কি তোমাদের এমন উত্তম আমলের কথা বলে দিব না? যা তোমাদের প্রভুর নিকট অত্যন্ত পবিত্র, যা সর্বাধিক মর্যাদাসম্পন্ন, এবং স্বর্ণ-রূপা দান করা ও দুশমনের মোকাবিলায় যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে তোমরা তাদের ঘাড়ে বা তারা তোমাদের ঘাড়েআঘাত করার চেয়ে উত্তম? সাহাবাগণ বললেন, হ্যাঁ, অবশ্যই বলুন। তিনি বললেন, তা হলো আল্লাহ তায়ালার জিকির।’ (ইবনে মাজাহ : ৩৭৯০)।
মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে উপরোক্ত গুণগুলো অর্জনের মাধ্যমে আরশের ছায়তলে আশ্রয় লাভ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

মোহাদ্দিস, জামেয়া ইসলামিয়া কুরপালা, কোটালীপাড়া, গোপালগঞ্জ, বাংলাদেশ।

শেয়ার করুন

Leave a Comment